বিদ্যাসাগরের মূর্তি হল টুকরো: এ যেন সিন্নি নিয়ে মারামারি করতে গিয়ে নারায়ণশিলাকেই লাথি মেরে বসা!
এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিজেপির মুখ্য সেনাপতি অমিত শাহের মেগা প্রচারসভার শেষে একরাশ লজ্জার সাক্ষী হয়ে রইল বাংলা। নবযুগের অন্যতম পথপ্রদর্শক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তির উপরেও হল প্রহার; ভেঙে টুকরো করে দেওয়া হল তা। পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অকুস্থলে অর্থাৎ বিদ্যাসাগর কলেজে গিয়ে "আমরা লজ্জিত" বলে দুঃখপ্রকাশ করলেন। পরে একটি জনসভায় রীতিমতো হুমকি দিয়ে বললেন যে এর বদলা তিনি নেবেন সুদে আসলে। বাংলার মনীষীর "গায়ে হাত" দেওয়া তিনি মেনে নেবেন না। তিনি এও বলেন যে নকশাল আমলেও নাকি তিনি এমন কাণ্ড হতে দেখেননি।

মন্তব্যটি অতি-প্রতিক্রিয়া নিঃসন্দেহে।
গতবছর মার্চ মাসে ত্রিপুরায় হওয়া বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জেতার পরে সেখানে ভ্লাদিমির লেনিনের মূর্তি উপড়ে যাওয়ার ঘটনার পরে কলকাতার বুকে ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির মূর্তিকে কালিমালিপ্ত করা হয়। অভিযোগ ওঠে অতি-বামপন্থী সমর্থকদের দিকে। রাজ্যের তৃণমূল কংগ্রেস ঘটনার নিন্দা করলেও পরে শ্যামাপ্রসাদের নতুন মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু সেবারে প্রতিক্রিয়ার মাত্রা এতটা বেশি হয়নি। নকশাল আমলেও বিদ্যাসাগরের মূর্তির ধড়ের উপর থেকে মুন্ডু উড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তাই "এমন কাণ্ড কলকাতায় আগে দেখিনি" গোছের উক্তি অগভীর।
মমতার সামনে এই ঘটনা এনে দিল এক বিরাট সুযোগ
আসলে বিদ্যাসাগর এই রাজনৈতিক জমিদখলের লড়াইয়ে নিমিত্তমাত্র। তাঁর দ্বিশতবার্ষিকী নিয়ে এমনি যে বিশেষ কিছু চোখে পড়ছে তা নয়, কিন্তু নির্বাচনের মধ্যে বাংলার নবযুগের অন্যতম পথপ্রদর্শক এই বাঙালি ব্রাহ্মণের "গায়ে হাত" দেওয়ার ঘটনায় যে বিরাট মাইলেজের সুযোগ এসেছে তাঁর সামনে, তা মমতা বিলক্ষণ জানেন। তৃণমূল নেত্রী এবারের নির্বাচনটিকে এমনিই একটি নৈতিকতার লড়াইয়ের মাত্রা দিয়েছেন যেখানে বিজেপি "অশুভ" এবং তিনি "শুভ" শক্তি। আর তার উপরে এখন মনীষীকে অপমান করার ঘটনা তাঁর তূণীরে আরও অস্ত্রের জোগান দেবে নিঃসন্দেহে। আগামী ১৯ মে কলকাতা সহ দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্বাচন এবং এর অনেক অংশই শহরাঞ্চল হওয়ার ফলে বিজেপির যে সুবিধা ছিল, তা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা পড়ার পরে অনেকটাই কমে আসবে বলে রাজ্যের শাসকদল। কারণ সাধারণ ভাবে মমতার রাজত্বে অনেক শহুরে-নৈতিক মধ্যবিত্ত বিরক্ত হলেও ঠিক নির্বাচনের মুখে এমন ন্যাক্কারজনক ঘটনায় যে তারা বিজেপির উপরে চটবে, তাতে সন্দেহ নেই। আর এর ফসলই ঘরে তুলতে চাইবে ঘাসফুল।
উত্তর কলকাতা কেন্দ্রে ২০১৪তে ভালো ফল করেছিল বিজেপি
অপরদিকে, বিজেপিও জানে ১৯ মে মমতার দূর্গে আঘাত হানার একটি বড় সুযোগ রয়েছে। উত্তর কলকাতায় গতবার বিজেপি প্রায় আড়াই লক্ষ এবং প্রায় ২৬ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। যথেষ্ট সংখ্যক অবাঙালি থাকা এই কেন্দ্রটিকে বিজেপি পাখির চোখ করেছে এবারে। তাই মুখে তৃণমূলকে আক্রমণ করলেও অমিত শাহকে এটাও বলতে হচ্ছে যে তিনি "বহিরাগত" নন এবং বাংলায় বিজেপি ক্ষমতায় আসলে একজন বাঙালিই মুখ্যমন্ত্রী হবেন। দিল্লিতে বিক্ষোভ অবস্থান করেও বিজেপিকে বোঝাতে হচ্ছে তাদের বাঙালিয়ানা-প্রেম। কিন্তু সম্ভাবনা তৈরী হলেও মঙ্গলবারের অমঙ্গলজনক ঘটনাটি বিজেপির বিরোধীদের আরও কল্কে জোগাবে, তাতে কোনও দ্বিমত নেই। বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে বিজেপির রাজনীতি বেমানান, সেই দাবি আবারও উঠবে। তবে পাশাপাশি, মমতার প্রশাসনও যে আইনের শাসন বলবৎ করতে ডাহা ব্যর্থ, সেই কথাও উঠতে শুরু করেছে অনেক মহলে।
সব মিলিয়ে, এ যেন সিন্নি নিয়ে টানাটানি-মারামারি করতে গিয়ে খোদ নারায়ণশিলার উপরেই লাথি পড়ে যাওয়া।
সত্যিই, এই লজ্জা রাখার জায়গা নেই।












Click it and Unblock the Notifications