বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা ইন্ধন জোগালো মমতার বাঙালি খণ্ড-জাতীয়তাবাদী রাজনীতিকেই
খাস কলকাতার বুকে মঙ্গলবার, ১৪ মে, ঘটল চূড়ান্ত একটি লজ্জাজনক ঘটনা। বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহের একটি মেগা পথসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছিল উত্তর কলকাতা কেন্দ্রে যার শেষে গেরুয়া সমর্থকদের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেস ছাত্র পরিষদের সমর্থকদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষ বাধে। ইট-পাথর ছোঁড়াছুঁড়ি তো বটেই, পাশাপাশি ওই অঞ্চলে স্থিত বিদ্যাসাগর কলেজের প্রবেশদ্বারের সামনে আগুন লাগানো হয়, ভেঙে দেওয়া হয় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আবক্ষমূর্তি। সংঘর্ষে জখম হন বেশ কয়েকজন। ঘটনার পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কলেজে পৌঁছন এবং নিজের হাতে বিদ্যাসাগরের মূর্তির ভেঙে পড়ে থাকা টুকরোগুলোকে একত্রিত করেন। আর তারপরেই তাঁর কণ্ঠে শোনা যায় সিংহনাদ।

বাংলার মনীষীর গায়ে হাত দেওয়ার বিরুদ্ধে তিনি গর্জে উঠে বলেন এর হিসেব সুদে আসলে নেবেন তাঁরা। প্রসঙ্গত, আগামী বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালে বিদ্যাসাগরের জন্মের দু'শো বছর। মমতা সেই প্রসঙ্গও উত্থাপন করে বলেন এ বাংলার এক বিরাট লজ্জা। যারা এই গর্হিত কাজটি করেছে তারা সত্যি কতটা লজ্জিত জানা নেই কিন্তু বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ঘটনাটি যে মমতার বাঙালি খণ্ড জাতীয়তাবাদের রাজনীতিকেই চাঙ্গা করেছে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। টুইটারে নিজের একাউন্টেও মমতা বিদ্যাসাগরের ছবি লাগিয়ে বোঝান যে এই সুযোগ তিনি হাতছাড়া করতে রাজি নন। আর এখানেই সমকালীন বাঙালি রাজনীতির চারিত্রিক বদল।
বিদ্যাসাগরের মূর্তি এই প্রথম ভাঙা পড়ল তা নয়, কিন্তু প্রেক্ষিত এখন আলাদা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা এই প্রথম পড়েনি বাংলার মাটিতে।
নকশাল আমলে মূর্তি ভাঙার রাজনীতি আকছার ঘটে থাকত। যদিও মমতা বলেছেন যে মঙ্গলবারের মতো ঘটনা নকশাল আমলেও দেখা যায়নি, কিন্তু সেটা তাঁর আইডেন্টিটি পলিটিক্স-এর একটি তাস মাত্র। নকশাল আমলে ছিল শ্রেণী আদর্শের লড়াই, এখন চলছে সম্পূর্ণ দলীয় মেরুকরণের সংঘর্ষ আর এই সংঘর্ষে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতিয়ার উগ্র সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের বিরোধিতা এবং বাঙালি খণ্ড-জাতীয়তাবাদের দৃঢ় প্রকাশ। দ্বিতীয়টি মমতা শুরু করেছিলেন ক্ষমতায় আসার পরে পরেই। বাঙালিয়ানার রাজনীতি দিয়ে তিনি গোর্খ্যাল্যান্ড আন্দোলনের কোমর ভেঙে দিয়েছেন অতীতে। বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা জলবন্টনের বিরোধিতা করতে কাজে লাগিয়েছেন। আর এখন তা দিয়ে তিনি চেষ্টা করছেন বঙ্গের মাটিতে বিজেপির উত্থানকে ঠেকিয়ে রাখতে।
কিন্তু মমতা যদি জানেনই যে বাইরের লোক ঢুকেছিল, তাহলে কী করছিল তাঁর প্রশাসন?
কিন্তু মঙ্গলবারের ঘটনার পরে আঙ্গুল উঠবে মমতার নিজের প্রশাসনের দিকেও। তিনি যে দাবি করেছেন যে রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ ও বিহার থেকে লোক ঢুকিয়ে বিজেপি এই হাঙ্গামা বাধিয়েছে, প্রশ্ন উঠবে আগাম জানা স্বত্বেও তাহলে তাঁর পুলিশ-প্রশাসন কিছু পদক্ষেপ নেয়নি কেন? মঙ্গলবারের ঘটনা অতদূর গড়ানোর সময়ে পুলিশের ভূমিকা কী ছিল? নাকি, প্রশাসন শেষ পর্যন্ত অপেক্ষা করছিল যাতে দোষ অমিত শাহের প্রচারের উপরে চাপানো যায় এবং বাঙালি মানুষের সমর্থন আদায় করা যায়? যদি সেরকম কিছু হয়ে থাকে, তবে বলতে হবে প্রশাসনও ডাহা ফেল এই লজ্জা আটকাতে।












Click it and Unblock the Notifications