সব্যসাচী দত্তকে নিয়ে তৃণমূলের ছুঁচো গেলা অবস্থা: ফিরহাদ-পার্থদের গর্জনই সার; বসে মজা দেখছে বিজেপি
সব্যসাচী দত্ত তৃণমূল কংগ্রেসের এখন রীতিমতো গলার কাঁটা।
সব্যসাচী দত্ত তৃণমূল কংগ্রেসের এখন রীতিমতো গলার কাঁটা। পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলের নানা নেতা-হোতারা সব্যসাচীর বিরুদ্ধে দলবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ আনছেন ঠিকই, গরম গরম বুলিও আওড়াচ্ছেন তাঁর বিরুদ্ধে, কিন্তু বিধাননগর পুরসভার মেয়র এবং দলের রাজারহাট-নিউটাউনের বিধায়কের উপরে কোথাও পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি এখনও পর্যন্ত।
সোমবার, ৮ জুলাই, কলকাতার মেয়র এবং রাজ্য সরকারের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম তো সব্যসাচীকে রীতিমতো 'মীরজাফর' বলে আক্রমণ করেন। এর আগে রবিবারই দলের পক্ষ থেকে সব্যসাচীর ডানা ছেঁটে তাঁর ডেপুটি তাপস চট্টোপাধ্যায়ের দায়িত্ববৃদ্ধি করা হয়েছে। হাকিম সংবাদমাধ্যমকে বলেন যে সব্যসাচী চাইলে যেখানে ইচ্ছে যেতে পারেন, তাতে দলের কিছু আসে যায় না। দল কোনওরকম অনুশাসনহীনতা বরদাস্ত করবে না বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
তৃণমূলের সূত্রের খবর, নেত্রী তথা মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বেশ কিছুদিন ধরেই সব্যসাচীর উপরে বিরক্ত তাঁর বিরুদ্ধে দলবিরোধী অভিযোগের কারণে। বিজেপির সঙ্গে সব্যসাচীর মাখামাখির খবরেও তিনি ক্ষুব্ধ বলে জানা যায়। কয়েকদিন আগেই সব্যসাচীর সঙ্গে দেখা হলে মমতা তাঁকে কটাক্ষ করতেও ছাড়েননি।

মমতার দলের সদস্য হয়ে মমতার সরকারের সমালোচনায় সব্যসাচী
সব্যসাচী গত শুক্রবার, ৫ জুলাই, সল্টলেকে বেতন বৃদ্ধির ইস্যুতে দলেরই এক শ্রমিক সংগঠনের প্রতিবাদ সভায় যোগ দিয়ে রাজ্য সরকারের সমালোচনা করাতে সব্যসাচীর উপরে আরও খেপেছে দলীয় নেতৃত্ব। এমনকি, তাঁকে দলের পক্ষ থেকে বিধাননগর মেয়রের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হলেও তিনি তাতে কর্ণপাত করেননি এখনও পর্যন্ত; উল্টে বলেছেন শ্রমিকের পাশে দাঁড়ানো যদি অন্যায় হয় তবে তাহলে তিনি সেই অন্যায় আবারও করতে রাজি।

ফিরহাদ, পার্থরা নানা ভাষায় আক্রমণ করছেন সব্যসাচীকে
তৃণমূলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে সব্যসাচী যদি নিজে না পদত্যাগ করেন, তাহলে বিধাননগর পুরসভার কাউন্সিলররা তাঁর বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারেন তাঁর অপসারণের জন্যে। আবার এটাও বলা হচ্ছে যে অনেক কাউন্সিলর সব্যসাচীর উপস্থিতিতে আর কাজ না করতে চাইলেও এ বিষয়ে শেষ সিদ্ধান্ত নেবেন মমতাই। সোমবার দলের মহাসচিব তথা রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও সব্যসাচীকে কটাক্ষ করে বলেন যে সবাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নয়, এমনকি চেষ্টা করলেও তা হওয়া সম্ভব নয়। তিনি এও বলেন যে তিনি লুচি-আলুরদমের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নন, রাস্তার সংগ্রামের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। অদূর অতীতে বিজেপির মুকুল রায়ের সঙ্গে সব্যসাচীর দহরম মহরম এবং রবিবারও তাঁদের একসাথে নৈশভোজে যোগদানের প্রসঙ্গেই পার্থর এই মন্তব্য।

কিন্তু এত কাণ্ডের পরেও সব্যসাচীকে তাড়াতে পারছে না দল?
প্রশ্ন হচ্ছে, সব্যসাচীর বিরুদ্ধে এত অভিযোগ আসার পরেও তাঁকে পত্রপাঠ দল থেকে বিদায় করছে না কেন দল? কাউন্সিলরদের মতামত, না মমতার সিদ্ধান্ত -- কোনটিকে অগ্রাধিকার দিয়ে সব্যসাচীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তাই ঠিক করতে পারছে না নেতৃত্ব?
আসলে অঙ্কটি পরিষ্কার। ২০১১ সাল থেকে রাজারহাট-নিউটাউনে বিধায়ক থাকা সব্যসাচী দত্ত ওই অঞ্চলে প্রভাবশালী নেতা। তাঁর অনুগতের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। যদি আজ তৃণমূল ঢাকঢোল পিটিয়ে ওই নেতাকে দল থেকে তাড়ায়, তাহলে দলের জনভিত্তিতে ফের বড়সড় ভাঙন তৈরী হতে সময় লাগবে না। একেই তৃণমূলের কঠিন সময় চলছে লোকসভা নির্বাচনের ফল বেরোনোর পর থেকে। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে দলের মধ্যে রীতিমতো ধস নেমেছে। উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় তো এমনই সঙ্কটের মধ্যে দল যে খোদ মুখ্যমন্ত্রীকে ছুটতে হচ্ছে ড্যামেজ কন্ট্রোলে। এখন ওই জেলারই আরেক বিধানসভা কেন্দ্র রাজারহাট-নিউটাউনে যদি সব্যসাচীর অপসারণের ফলে আরও বড় সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে তৃণমূলের মাথাব্যথা বাড়বে বই কমবে না। তাই গরম হুঁশিয়ারি দিলেও শেষমেশ তৃণমূলকে বিরত থাকতে হচ্ছে সব্যসাচীকে বিতাড়নের প্রশ্নে। এই পরিস্থিতি মনে করিয়ে দেয় একসময়ের বামফ্রন্টের দাপুটে নেতা সুভাষ চক্রবর্তীর কথা।

বিজেপির মজা দেখার সময়
সব্যসাচী এবং বিজেপিতে তাঁর মিত্র মুকুল রায়ও এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন। তাঁরাও জানেন তৃণমূলের দুর্বলতার কথা আর তাই বুকের উপরে বসে দাড়ি উপড়ে ফেলতে তাঁদেরও বাধছে না। বিজেপি তৃণমূলের এই সব্যসাচী বিড়ম্বনায় রগড় দেখছে কারণ খেলিয়ে মাছ পাড়ে ওঠানোর মজাই আলাদা। সব্যসাচীও জানেন তাঁকে দল থেকে তাড়ানো মানে রাজনৈতিক জয় তাঁরই। আপাতত তা ফিরহাদ-পার্থদের গায়ের ঝাল মেটানোর কথা বলেই ক্ষান্ত থাকতে হচ্ছে। মনস্তাত্বিক এই লড়াইতে তৃণমূল আপাতত বিজেপির কাছে পাঁচ গোল খেয়েছে।












Click it and Unblock the Notifications