একই অভিযোগে বাইরে তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা! কিন্তু জেলে প্রতিবাদী মইদুল
বিশেষ সূত্রে পাওয়া খবরে জানা গিয়েছে, ১৫ তারিখে রাতে ক্যানিং থানায় ওসি আশিস দাসের ঘরে এক বিশেষ বৈঠক হয়। আর সেখানেই মোটামুটি অপারেশন মইদুল-এর ছক এঁকে ফেলা হয়েছিল বলেই এই সূত্র দাবি করছে।
ফের পুলিশের বিরুদ্ধে দলদাস হওয়ার অভিযোগ উঠল। ক্যানিং-এর একটি ঘটনায় এই অভিযোগ সামনে এসেছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যানিং-এ মহকুমা শাসকের দফতরের সামনে অবস্থান বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল আক্রান্ত আমরা। সেই দিন অবস্থান বিক্ষোভের এক ঘণ্টা আগেই আক্রান্ত আমরার উপর হামলা হয়। এই ঘটনায় নাম জড়ায় তৃণমূলের স্থানীয় দুই নেতা গোপাল কুণ্ডু ও সুভাষ কুণ্ডুর। অভিযোগ এই দুই স্থানীয় তৃণমূল নেতার নেতৃত্বে অন্তত ২০ থেকে ২২ জনের একটি দল আক্রান্ত আমরার সদস্যদের উপরে হামলা চালায়। এমনকী, অভিযোগ তৃণমূল কংগ্রেসের এই গুন্ডাবাহিনীর হাতে মারাত্মকভাবে জখম হন আক্রান্ত আমরার অন্যতম সদস্য অম্বিকেশ মহাপাত্র, অরুণাভ গঙ্গোপাধ্যায় এবং মইদুল ইসলামরা। অথচ, ঘটনাচক্রে পুলিশ ক্যানিং স্টেশন থেকে আক্রান্ত আমরার সদস্যদেরই গ্রেফতার করে ক্যানিং থানায় নিয়ে যায়।

অভিযোগ, থানায় নিয়ে যাওয়ার পরই পুলিশ আক্রান্ত আমরা-র মইদুল ইসলাম-সহ ৬ সদস্যের নাম খাতায় লিখে নেয়। কিন্তু, আক্রান্ত আমরার দুই সদস্য অম্বিকেশ মহাপাত্র ও অরুণাভ গঙ্গোপাধ্যায়কে এই নামের তালিকা থেকে বাইরে রাখা হয়। আক্রান্ত আমরার অভিযোগ, ৬ সদস্যের নাম লেখা হতেই এক পুলিশ কর্মী এসে খাতায় লেখা নামগুলি মোবাইলের ক্যামেরায় তুলে নেন এবং তিনি তৎক্ষণাৎ থানা থেকে বেরিয়ে যান। আক্রান্ত আমরার দাবি, এই ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই থানায় এসে হাজির হন গোপাল কুণ্ডু ও সুভাষ কুণ্ডুরা। রাকেশ নামে এক তৃণমূল কর্মীকেও তাঁরা থানায় নিয়ে এসেছিলেন। রাকেশে চোখে আঘাত ছিল। গোপাল কুণ্ডু ও সুভাষ কুণ্ডুরা আক্রান্ত আমরার ৬ সদস্যের বিরুদ্ধে মার-দাঙ্গা ও প্রাণঘাতী হামলার অভিযোগ দায়ের করেন। এমনকী, পুলিশের কাছে করা এফআইআর-এ আক্রান্ত আমরার ৬ সদস্যের নাম ও ঠিকানা, বাবার নাম-সহ পুঙ্খনাপুঙ্খ আকারে উল্লেখ করা হয়। আক্রান্ত আমরার সদস্যের দাবি, এই কয়েক মিনিটের মধ্যে গোপাল কুণ্ডুরা কীভাবে তাঁদের পাঁচ সদস্যের ঠিকুজি-কুষ্ঠি জেনে ফেললেন? কারণ যে ৬ জনের নামে এফআইআর দায়ের হয়েছিল তাঁদের মধ্যে একজনের বাড়ি মেদিনীপুরে। এমনকী তাঁর বাড়ির ঠিকানা, বাবা-র নাম পর্যন্ত সঠিক ভাবে পুলিশের খাতায় লিপিবদ্ধ করে দেন তৃণমূলের দুই নেতা।
উল্লেখ্য, এরপরই পুলিশ আক্রান্ত আমরার আরও দুই সদস্য অম্বিকেশ মহাপাত্র ও অরুণাভ গঙ্গোপাধ্যায়ের নাম খাতায় লিখতে শুরু করে। অম্বিকেশ ও অরুণাভ- দু'জনেরই বক্তব্য তাঁদের নাম বাদ রেখে দিয়ে আগে ৬ সদস্যের নামে কেন অভিযোগ দায়ের হল? তাহলে তৃণমূলের এফআইআর দায়েরের সঙ্গে এর কোনও যোগ আছে?
পুলিশের অভিযোগ, ১৫ তারিখের অবস্থান কর্মসূচির জন্য আক্রান্ত আমরা কোনও অনুমতি নেয়নি। এমনকী বেআইনিভাবে তারা মাইকিং করছিল। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষিপ্ত হতেই পারেন!
পুলিশের অভিযোগ অবশ্য মানতে রাজি নয় আক্রান্ত আমরা। তাঁদের পাল্টা দাবি, ৯ ফেব্রুয়ারি সভার অনুমতি চেয়ে ই-মেল করা হয়েছিল এসপি বারুইপুরকে। এই আবেদন যে আদৌ বৈধ নয় তা আক্রান্ত আমরা জানতে পারে ১৪ ফেব্রুয়ারি। ক্যানিং-এ ওই দিন সভার জন্য মাইকিং করছিলেন আক্রান্ত আমরার দুই সদস্য মইদুল ইসলাম ও অলক প্রামাণিক। সেই দিনও গোপাল কুণ্ডু ও সুভাষ কুণ্ডুর নেতৃত্বে কয়েক জন মইদুল ও অলককে মারধর করে বলে অভিযোগ। মাইকও ভাঙার চেষ্টা হয়। যে অটোতে করে মইদুলরা মাইকিং করতে বেরিয়েছিলেন তার চালককেও শাসানি দেওয়া হয়। আতঙ্কে সেই অটো চালক মাইক ও অটো নিয়ে পালিয়ে যান। ক্যানিং থানায় অভিযোগ দায়ের করতে যান মইদুল ও অলোক। অভিযোগ, বিষয়টি খতিয়ে দেখার নাম করে উল্টে ক্যানিং থানার এক অফিসার গোপাল কুণ্ডুর সঙ্গে এক চায়ের দোকানে চা খেয়ে ফিরে আসেন। তিনি নাকি জানান ঘটনাস্থলে কাউকে পাওয়া যায়নি। তখনই ক্যানিং থানা জানিয়ে দেয় আক্রান্ত আমরা বেআইনিভাবে মাইকিং করছে। ১৫ তারিখের কর্মসূচির জন্য পদ্ধতি মেনে নির্দিষ্ট আবেদনপত্রে আবেদন করতে বলে এসপি বারুইপুরের দফতর। ক্যানিং থানায় সঙ্গে সঙ্গে সেই আবেদনও করা হয়। কিন্তু, ক্যানিং থানা জানিয়ে দেয় কর্মসূচির জন্য অন্তত ৪৮ ঘণ্টা আগে আবেদন করতে হয়। সুতরাং, ১৫ তারিখের কর্মসূচি পিছিয়ে দিতে হবে।
১৪ ফেব্রুয়ারি আক্রান্ত আমরা মাইকিং হামলায় অভিযুক্ত মারমুখী গোপাল কুণ্ডু, দেখুন ভিডিও
বহুদিন আগে থেকেই কর্মসূচি ঘোষিত হয়ে যাওয়ায় তা আর পিছতে রাজি ছিল না আক্রান্ত আমরা। অম্বিকেশ মহাপাত্র, অরুণাভ গঙ্গোপাধ্যায়রা জানিয়েছেন, তাঁরা যদি নিয়ম ভেঙে থাকেন তাহলে পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু, তৃণমূল কংগ্রেসের লোকজন কেন হামলা করবে? আর সেই হামলাকারীর অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁদের সদস্যদের গ্রেফতার করা হবে কেন?
আক্রান্ত আমরার পক্ষ থেকেও গোপাল কুণ্ডু ও সুভাষ কুণ্ডু এবং তাঁদের সাঙ্গ-পাঙ্গদের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করে ১৫ তারিখ একটি পাল্টা এফআইআর দায়ের করা হয়। কিন্তু, পুলিশ এখনও পর্যন্ত সেই এফআইআর-এর ভিত্তিতে কাউকে গ্রেফতার তো দূর ছাড় জিজ্ঞাসাবাদও করে উঠতে পারেনি। অথচ, তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও জামিন অযোগ্য ধারা বলবৎ করেছে ক্যানিং থানা। এসপি বারুইপুর অরিজিৎ সিনহা জানিয়েছেন, '১৫ তারিখের ঘটনায় তৃণমূল কংগ্রেসের রাকেশ নামে এক যুবকের আঘাত গুরুতর ছিল। তাঁর চোখে ভালোরকম আঘাত লেগেছিল। কিন্তু, আক্রান্ত আমরার কারোর শরীরেই তেমন কোনও আঘাত ছিল না। মেডিক্যাল রিপোর্টেও আক্রান্ত আমরার কেউ চোট পেয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়নি। সেই তুলনায় রাকেশের আঘাত যে গুরুতর সেই রিপোর্ট পুলিশ পেয়েছে।' এমনকী এসপি বারুইপুর আক্রান্ত আমরার বিরুদ্ধে বেআইনিভাবে মাইকিং ও জমায়েতেরও অভিযোগ করেছেন। তবে, তিনি জানিয়েছেন, তৃণমূল কংগ্রেসের যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তাঁদের থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এদিকে, আক্রান্ত আমরার সদস্যদের শরীরে কোনও আঘাত ছিল না একথা মানতে রাজি নন অম্বিকেশ মহাপাত্র, অরুণাভ গঙ্গোপাধ্যায়রা। মারধরের জেরে ঠোঁট ফেটে গিয়েছিল অম্বিকেশ মহাপাত্রর। এমনকী, অরুণাভ গঙ্গোপাধ্যায়, মইদুল ইসলামরা সহ আক্রান্ত আমরার অন্য যে সদস্যদের পুলিশ লক-আপ-এ ঢুকিয়ে ছিল তাঁদের প্রত্যেকের শরীরেই জায়গায়-জায়গায় রক্ত জমাট বেঁধেছিল। প্রত্যেকেই অসুস্থ বোধ করছিলেন। বেশ কয়েক জনের মাথায়, পিঠে ও বুকে আঘাত ছিল। অভিযোগ, তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা মাটিতে ফেলে কয়েক জনকে লাথি-কিল-ঘুসি মেরেছিল। ক্যানিং হাসপাতালে আক্রান্ত আমরার বেশ কয়েক জনকে অক্সিজেনও দিতে হয়েছিল। কিন্তু, পুলিশের দাবি তারা এসব কিছুই জানেন না। আক্রান্ত আমরার সদস্যদের চিকিৎসার ব্যাপারে ওয়ান ইন্ডিয়া বাংলা থেকে ক্যানিং হাসপাতালের সুপার অর্ঘ্য চৌধুরীর সঙ্গেও কথা বলা হয়। কিন্তু তিনি এই বিষয়ে কোনও কথা বলতে বা তথ্য জানাতে অস্বীকার করেন।
আলিপুর আদালত এই ঘটনায় ১৯ তারিখে আক্রান্ত আমরার ৫ সদস্যকে জামিন দিয়েছে। কিন্তু, এখনও জেলের মধ্যে রয়েছেন মইদুল ইসলাম। ২২ তারিখ তাঁর জামিনের বিষয়টি ফের আদালতে ওঠার কথা। আক্রান্ত আমরা ও মইদুলের পরিবারের অভিযোগ, দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ক্যানিং ও ডায়মন্ড হারবার অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই মইদুলকে নিশানা করেছে তৃণমূল। এলাকায় তৃণমূল বিরোধী প্রতিবাদী হিসাবে তাঁর ভাবমূর্তি আছে। মইদুল সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর ঘনিষ্ঠ বলেও একটা মহল দাবি করছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে মইদুলকে এক সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চক্রান্তের নিশানা করা হয়েছে বলেই দাবি করা হচ্ছে।
বিশেষ সূত্রে পাওয়া খবরে জানা গিয়েছে, ১৫ তারিখে রাতে ক্যানিং থানায় ওসি আশিস দাসের ঘরে এক বিশেষ বৈঠক হয়। আর সেখানেই মোটামুটি অপারেশন মইদুল-এর ছক এঁকে ফেলা হয়েছিল বলেই এই সূত্র দাবি করছে। সেই বৈঠকে কারা কারা ছিলেন। নাম জানা না গেলেও খবর পুলিশের উচ্চ মহলের কয়েক জন কর্তা এবং স্থানীয় তৃণমূল নেতারা সেখানে হাজির ছিলেন।
ক্যানিং-এ তৃণমূল গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের গুলি চালনার ঘটনায় নিহত হয়েছিল ক্লাস ফোরের ছাত্র রিজাউল মোল্লা। সেই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত রিজাউলেরই স্কুলের প্রধান শিক্ষক তপু মাহাতো। পুলিশ এখন পর্যন্ত তপু মাহাতোকে ধরতেই পারেনি। অভিযোগ, তপু মাহাতোর মা গ্রাম পঞ্চায়েতে তৃণমূল প্রধান। আক্রান্ত আমরার দাবি তপু মাহাতোর গ্রেফতারির দাবিতে ১৫ ফেব্রুয়ারি ক্যানিং-এ মহকুমা শাসকের দফতরে অবস্থান বিক্ষোভের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে তাঁদের লোকেদেরই জেলে পুরে দিল পুলিশ। অথচ, আজ পর্যন্ত তপু মাহাতোকে ধরা গেল না। মইদুলের মুক্তির দাবিতে এবং ক্যানিং-এ হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনেরও শরণাপন্ন হচ্ছে আক্রান্ত আমরা। মইদুলের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে অ্যাকাডেমি-র সামনেও অবস্থানে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাঁর স্ত্রী ও পরিবারের বাকি সদস্যরা।












Click it and Unblock the Notifications