ছটপুজোতে দু'দিন ছুটির চল তো মমতাই চালু করেছিলেন এই 'বহিরাগত'দের মন জিততে
একই মাসে পর পর দু'বার। মে-র প্রথম সপ্তাহে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় "জয় শ্রীরাম" স্লোগান শুনে গাড়ি থামিয়ে তেড়ে গিয়েছিলেন তিনি।
একই মাসে পর পর দু'বার। মে-র প্রথম সপ্তাহে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় "জয় শ্রীরাম" স্লোগান শুনে গাড়ি থামিয়ে তেড়ে গিয়েছিলেন তিনি। আর এবারে মে-র শেষ সপ্তাহে উত্তর ২৪ পরগনাতে সেই ঘটনারই পুনরাবৃত্তি। এই দফায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিকবার তাঁর সরকারি কনভয় থামিয়ে তেড়ে যান স্লোগানমুখী জনতার দিকে। এমনকি, প্রচন্ড রেগে গিয়ে তাঁদের "বিজেপির বাচ্চা" এবং "শালা ক্রিমিনাল" বলেও গালাগালি দেন। এরপর বলেন যাঁরা এই স্লোগান দিচ্ছে তাঁরা পশ্চিমবঙ্গের লোক নয়, বহিরাগত।
এখানে মনে রাখা ভালো যে কয়েক সপ্তাহ আগে লোকসভা নির্বাচনের সপ্তম ও শেষ দফার আগে কলকাতায় বিজেপির বিরাট মিছিলের সময়ে বিদ্যাসাগর কলেজে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আবক্ষ মূর্তি ভেঙে দেওয়ার ঘটনার পরেও তিনি একই অভিযোগ তুলেছিলেন। বলেছিলেন তৎকালীন বিজেপি অধ্যক্ষ অমিত শাহ তাঁর নির্বাচনী প্রচারে বিহার, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান এবং ঝাড়খন্ড থেকে লোক নিয়ে এসেছিলেন বাংলায় গোলমাল বাধানোর জন্য। তিনি এও বলেন যে বহিরাগতদের দিয়ে ঝামেলা পাকানো হয়েছে দার্জিলিং এবং জঙ্গলমহলেও।

আগে বিপক্ষকে বলা হত 'মাওবাদী'-'সিপিএম'; আর এখন 'বহিরাগত'
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অভিযোগের পরিবর্তন লক্ষ্যণীয়। এর আগে আমরা দেখেছি যে নিজের প্রশাসন ও দলের দিকে আঙ্গুল উঠলে মমতা সোজাসুজি তাকে মাওবাদী বা সিপিএম-এর ষড়যন্ত্রের আখ্যা দিয়ে দিতেন। তা কলেজের ছাত্রী হোক বা কৃষক বা ছাত্রী ধর্ষণের বিরুদ্ধে ন্যায়প্রার্থী স্থানীয় মহিলা। কোনও প্রশ্ন তুললেই মমতার রোষানলে পড়তে বিন্দুমাত্র সময় লাগত না এবং "মাওবাদী" বা "সিপিএম" তকমা সেঁটে যেত প্রতিবাদীর গায়ে।
বিপক্ষ বদলাতেই মমতার অভিযোগের অভিমুখও বদলেছে। এখন কোনও প্রতিবাদী কণ্ঠ শুনলেই তিনি মাওবাদী বা সিপিএম নয়, বিজেপির বাচ্চা বলে তেড়ে যাচ্ছেন, গো-বলয়ের লোক বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। অর্থাৎ, আদর্শগত রাজনীতির দিক থেকে সরে এসে তিনি এখন ভৌগোলিক রাজনীতির পথ ধরেছেন।

গত বছরের শেষে ছটপুজোতে মমতা যে দু'দিন ছুটি দিলেন, কিসের জন্যে?
কিন্তু কথায় কথায় বাঙালি-অবাঙালির মধ্যে আমরা তফাৎ করি না বলে মমতা কিন্তু আসলে এই তফাৎটাই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখাচ্ছেন। এখানে জানিয়ে রাখা ভালো যে গত বছরের শেষের দিকে তৃণমূল নেত্রী স্বয়ং বাংলায় বসবাসকারী প্রায় এক কোটি বিহারীদের জন্যে বিশেষ নজর রেখে ছটপুজোতে দুদিনের ছুটি ঘোষণা করেছিলেন। এমনকি, প্রতিবেশী রাজ্যের মানুষজনের দাবিদাওয়া মেটানোর লক্ষ্যে তিনি দলে একটি বিশেষ সেল খোলারও সিদ্ধান্ত নেন। তৃণমূল কংগ্রেসের একটি হিন্দিভাষী শাখাও তিনি খোলেন যার নেতৃত্বে রাখা হয়েছিল দলের প্রাক্তন সদস্য অর্জুন সিংকে। সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস হিন্দিভাষী প্রকোষ্ঠর সেক্রেটারি রাজেশ সিনহা তো বলেই দিয়েছিলেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেভাবে রাজ্যে বসবাসকারী হিন্দিভাষীদের স্বীকৃতি দিয়েছেন যে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপিকে নয়, সমর্থন করবে তৃণমূল সুপ্রিমোকেই।
তা সেই হিন্দিভাষীদের লক্ষ্য করে "এটা বাংলা, গুজরাত নয়" ইত্যাদি গর্জন করে মমতা এখন কী প্রমাণ করতে চাইছেন? কথায় কথায় "বহিরাগত" বলে হিন্দিভাষীদের অপমানই বা করছেন কেন? এটা কি হতাশা থেকে যে এত কিছু করেও বিজেপিকে ঠেকানো গেল না রাজ্যে? আর তাই মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারের সম্মান খুইয়ে ছুটছেন যেখান থেকেই "জয় শ্রীরাম" শুনছেন, সেই পানে?

এই 'বহিরাগত' রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কেউ যদি বাংলায় এনে থাকেন, তাহলে তা মমতাই
সাদায়-কালোয় রাজনীতিকে মেপে কোনও কাজের কাজ হওয়ার নয়। বঙ্গীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যদি 'হিন্দিভাষী' দলের ছোঁয়া কেউ এনে থাকে, তা মমতা নিজেই। এ রাজ্যে বামেদের হারাতে বহুবার তিনি কেন্দ্রে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, রাজ্যে ভোটে লড়েছেন। বিজেপির বিরুদ্ধে আজ তাঁর বিষোদ্গার চরমে উঠলেও এখনও মানুষের স্মরণে রয়েছে যে তিনি এই বিজেপির সরকারের মন্ত্রী হয়েছেন গুজরাত দাঙ্গার দু'বছর পরেও। আর তাই আজকে টলমল অবস্থাতে বাংলা গুজরাত নয় ধরনের মন্তব্য করে তিনি যতই সাংস্কৃতিক উৎকর্ষ প্রমাণের চেষ্টা করুন, "জয় শ্রীরাম" স্লোগানের অন্ত এখনই ঘটবে বলে মনে হয় না।












Click it and Unblock the Notifications