তৃণমূলে সায়নীর উল্কার মতো উত্থান, মমতার মাস্টারস্ট্রোক নাকি যোগ্য নেতার অভাব
তৃণমূলে সায়নীর উল্কার মতো উত্থান, মমতার মাস্টারস্ট্রোক নাকি যোগ্য নেতার অভাব
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জায়গায় সদ্য রাজনীতিতে পা দেওয়া সায়নী ঘোষকে এনেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অভিনেত্রী থেকে নেত্রী বনেছেন উল্কার গতিতে। তাঁর এই উত্থানের কারণ নিয়ে চর্চা শুরু হয়ে গিয়েছে রাজনৈতিক মহলে। রাজ্য রাজনীতিতে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে সায়নীকে যুব সভানেত্রী করা মমতার মাস্টারস্ট্রোক নাকি দলের ফাঁকফোকর বোজানোর মরিয়া চেষ্টা?

বাংলার নারী শক্তিতে ভরসা মমতার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রথম থেকেই নারী শক্তির উপর জোর দিয়েছিলেন। বিশেষ করে একুশের ভোটযুদ্ধে নামার আগে বাংলার নারী শক্তিকে জাগরিত করে ভোট বৈতরণী পার হওয়ার বার্তা উঠে এসেছিল বারবার। মহিলাদের জন্য বিভিন্ন জনকল্যাণকর প্রকল্প থেকে শুরু করে সবকিছুতেই মহিলাদের সামনের সারিতে রাখতে চেয়েছেন তিনি।

সায়নীকে দেখে আরও মহিলা রাজনীতিতে আসবেন
এবার তিনি দলের সংগঠনের ভারও সেই মহিলাদের উপর ন্যস্ত করতে চেয়েছেন। আজ পর্যন্ত কোনও মহিলা তৃণমূল যুব সভাপতির চেয়ারে বসেননি। এবার সায়নীকে সেই পদে বসিয়ে মহিলাদের বার্তা দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সায়নীকে দেখে আরও মহিলা রাজনীতিতে আসবেন বলে তিনি মনে করছেন। বাংলার তরুণ-তরুণীরা ছুটে আসবেন সায়নীর সঙ্গী হতে।

মমতাও যুবর দায়িত্বে ছিলেন, তারপর সায়নী!
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে যুব সংগঠনের দায়িত্ব সামলেছেন কংগ্রেসে থাকাকালীন। তিনি বোঝেন যুব সম্প্রদায়কে টানতে কী ধরনের প্রয়াস নেওয়া কার্যকর হবে। তিনি তেমনটাই নিতে চেয়েছেন। সায়নীকে যুব সংগঠনের মাথায় বসিয়ে ফারাক দূর করতে চেয়েছেন। অনেকে কুণ্ঠা দূর করার চেষ্টা করেছেন। এক করতে চেয়েছেন সমস্ত নেতাদের।

সায়নীর মতো উঠতি মুখকে যদি সামনে রাখা যায়...
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের গুরুত্ব বাড়িয়ে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক করা হলে তাঁর জায়গায় কে আসবেন, সেটা নিয়ে একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। আর তৃণমূলের যুব সংগঠন থেকে কোনও নেতাকে তুলে আনা মানে একাংশ ক্ষুণ্ণ হবে। তার থেকে সায়নীর মতো উঠতি মুখকে যদি সামনে রাখা যায়, তবে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সংগঠনটা বাড়াতে পারবেন, এমনটাই মনে করছে রাজনৈতিক মহলের একটা বড় অংশ।

পুরনো নেতাদের ওপর ভরসা নেই মমতার, প্রশ্ন
তবে এ প্রসঙ্গে কথা উঠে গিয়েছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভরসা নেই দলের নেতা-নেত্রীদের উপর। তাই সায়নী ঘোষ, জুন মালিয়া, সায়ন্তিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, লাভলি মিত্রদের মতো নব্যদের দলের এত গুরুত্বপূর্ণ পদে আনা হচ্ছে। নেতৃত্বে স্থান দেওয়া হচ্ছে? তবে দলে কি যোগ্য নেতৃত্বের অভাব? নাকি পুরনো নেতাদের ওপর ভরসা নেই মমতার, প্রশ্ন উঠে পড়েছে।

নয়া ট্র্যাডিশন আমদানি করে ফেললেন তৃণমূল সুপ্রিমো
এমন কথাও রাজনৈতিক মহলের চর্চায় উঠে এসেছে, দলের বিভাজন রুখতেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অরাজনৈতিক নব্য রাজনীতিকদের সামনে আনছে? এর আগে এই রণনীতি শুধু ভোটের সময় দেখা গিয়েছে। অভিনেতা-নেত্রীদের এনে ভোট জয়ের কৌশল নিতে দেখা গিয়েছে তৃণমূল-সহ অনেক দলকেই। এবার দলের সংগঠনেও কলাকুশলীদের এনে নয়া ট্র্যাডিশন আমদানি করে ফেললেন তৃণমূল সুপ্রিমো।

সায়নীকে আনা মমতার মাস্টারস্ট্রোক কেন?
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটাই মমতার মাস্টারস্ট্রোক। ভোট প্রচারে সায়নীর স্টাইল, মানুষের সঙ্গে মিশে যাওয়া মুগ্ধ করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ভোটে হারলেও সায়নীর জনসংযোগের ক্ষমতাকে কাজে লাগাতে তাঁকে গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁকে বসানো হয়েছে দলের যুব সভানেত্রীর পদে।

সায়নীকে চেয়ে পথে নেমেছিল তৃণমূলের নবীন প্রজন্ম
ভোটের পর সায়নীকে সরকারি দায়িত্বে আনার জন্য পথে নেমেছিল তৃণমূলের নবীন প্রজন্মের বহু মুখ। তাঁরা নেত্রী হিসেবে চাইছিলেন সায়নী ঘোষকে। সায়নীর মতো দাপুচে মেয়েকে তাই তৃণমূলের যুব সংগঠনে এনে মাস্টারস্ট্রোকটা দিয়ে দিলেন মমতা। দল মনে করছে, তাঁকে দিয়ে যুব সংগঠনকে চালানো যাবে। সায়নীর মধ্যে সই গুণাবলী আছে। আর মহিলা আনকোরা মুখকে সামনে আনায় গোষ্ঠীকোন্দলও তৈরি হবে না।

দলের ভবিষ্যৎ তৈরি করার গুরুদায়িত্ব সায়নীর কাঁধে
সেইসঙ্গে সায়নীকে সামনে এনে নবীন প্রজন্মের কাছে বিশেষ বার্তা দিতে চেয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। সায়নীর মতো অল্পবয়সী মেয়েকে দেখে নতুন প্রজন্মকে দেল টানা সম্ভব হবে বলে মনে করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বহু তরুণ-তরুণী রাজনীতিতে আসবেন এর ফলে। দলের ভবিষ্যৎ তৈরি হবে। আর সায়নী দায়িত্ব নিতে জানে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্বাস সায়নী দলকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন।

সায়নীকে দায়িত্বে এনে ফাঁকফোকর বোজালেন মমতা
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যুব সভাপতি থাকাকালীন যে ক্রেজ তৈরি হয়েছিল, তাতে অনেক যুব সংগঠনের নেতানেত্রীরা তাঁর কাছে পৌছতে পারতেন না। ফলে একটা গ্যাপ তৈরি হত। সায়নীকে যুব সংগঠনের দায়িত্বে অনে সেই জায়গাটা ভরাট করতে চাইছেন মমতা। সংগঠনের অন্দরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসন্তোষ থেকেও দলকে বের করে আনার চেষ্টা এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে রয়েছে।

শুভেন্দুর হাত থেকে সৌমিত্র ভায়া সভাপতি হয়েছিলেন অভিষেক
বরাবরই যুব সংগঠনের দায়িত্ব নিয়ে তৃণমূল সুপ্রিমো ফাটকা খেলেছেন। শুভেন্দুর হাত থেকে যুব তৃণমূল কংগ্রেসের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল সৌমিত্র খাঁকে। মুকুল-ঘনিষ্ঠ নেতা সৌমিত্র কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পর এই গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই সৌমিত্র খাঁকে সেই পদ থেকে সরিয়ে বসানো হয়েছিল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে।

যুব-যুবাকে মিলিয়ে সংগঠনের মাথায় বসেছিলেন অভিষেক
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তখন যুবার সভাপতি ছিলেন। অভিষেককে রাজনীতিতে আনতে যুব'র পাশাপাশি যুবা নামে একটি সংগঠন তৈরি করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছাত্র ও যুব সংগঠনের মাঝে সোপান ছিল ওই যুবা। পরে যুবা ও যুবকে মিলিয়ে দেওয়া হয়। তারপরই যুব সংগঠনের মাথায় বসেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

এই যুব সভাপতি পদ নিয়েই শুভেন্দুর সঙ্গে দ্বন্দ্ব ছিল
আর এই যুব আর যুবার একসঙ্গে মিলে যাওয়া এবং যুবর সভাপতি পদে অভিষেককে বসানো নিয়েই শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয়। শুভেন্দু অধিকারী তাঁর অপসারণ মানতে পারেননি যুব সভাপতির পদ থেকে। তারপর তাঁকে অনেক পদ, অনেক দায়িত্ব, অনেক গুরুত্ব দিলেও তিনি দূরত্ব তৈরি করতে শুরু করেন।

সায়নীর বিরাট উত্থান হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলে
২০২১-এর মহাযুদ্ধ জেতার পর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরিয়ে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে আসেন তৃণমূলে। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন সায়নী ঘোষ। রাজনীতিতে পা দিয়েই সায়নীর বিরাট উত্থান হল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলে। সিনে জগৎ থেকে রাজনীতির ময়দানে পা দিয়েই তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন। তারপরই একেবারে এলেন সাংগঠনিক পদে।

সায়নীর মধ্যে আদর্শ যুব নেত্রীকে খুঁজে পান মমতা
ভোটে হেরেও তাঁর পদ পাওয়া প্রসঙ্গে তৃণমূলে সে অর্থে কোনও অস্বস্তি তৈরি হয়নি। প্রথমত তিনি আসানসোল দক্ষিণে বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিশাল লড়াই দিয়েছিলেন। লোকসভায় পিছিয়ে থাকা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রায় জয় হাসিল করে নিয়েছিলেন। তবে শেষপর্যন্ত তাঁকে হারতে হয়। কিন্তু হারলেও তাঁর জনসংযোগ, প্রচার কৌশল নেতা-কর্মীদের মন জয় করে নেয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর মধ্যেই খুঁজে পান আদর্শ যুব নেত্রীকে।












Click it and Unblock the Notifications