আজকের মতো মিডিয়ার রমরমা থাকলে বামেরাও ৩৪ বছর টিকতো না; মমতা সেটা বুঝছেন হাড়ে হাড়ে
লোকসভা নির্বাচনের পরে পশ্চিমবঙ্গে নিরন্তর রাজনৈতিক হানাহানির ঘটনায় পারদ চড়ছেই। রাজ্যে শেষ পর্যন্ত ৩৫৬ ধারা বলবৎ করা হবে কি না, সেই নিয়েও চর্চা চরমে।
লোকসভা নির্বাচনের পরে পশ্চিমবঙ্গে নিরন্তর রাজনৈতিক হানাহানির ঘটনায় পারদ চড়ছেই। রাজ্যে শেষ পর্যন্ত ৩৫৬ ধারা বলবৎ করা হবে কি না, সেই নিয়েও চর্চা চরমে। যদিও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, সেরকম ইঙ্গিত দিলেও কেন্দ্রের বিজেপি-নেতৃত্বাধীন সরকার শেষ পর্যন্ত সেই পদক্ষেপ নিয়ে মমতার সুবিধা করে দেবে না। কিন্তু, রাষ্ট্রপতি শাসন ইত্যাদির জুজু দেখিয়ে তারা মমতার তৃণমূলকে চাপে রাখবে। বাংলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোনদিকে এগোয়, তা এখনই বোঝা যাচ্ছে না তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিরামহীন হিংসার ঘটনায় পশ্চিমবঙ্গ এখন সারা দেশেই শিরোনামে।
লোকসভা নির্বাচন সমাপ্ত হলেও পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাতের রেশ চলছে। অনেকের কাছে এটা অদ্ভুত মনে হলেও আসলে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এটাই।

বামেদের সময়ে বিরোধী রাজনীতি করলে কী শাস্তি হত তা সবাই জানে
রাজনৈতিকভাবে সচেতন বাঙালির স্বাধীনতার আগে অস্ত্র নিয়ে ইংরেজের সঙ্গে লড়াই করার ঘটনা আমাদের সবার জানা। পরে নকশাল আমলেও দেখা যায় সেই একই প্রবণতা এবং তারপর বামেদের সময়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক হিংসা তো ইতিহাস। গ্রাম কে গ্রাম বিরোধী শূন্য করে মেশিনারির নির্বাচন জয়কে আজও মানুষ ত্রাসের সঙ্গে স্মরণ করে। বিরোধী দল করার জন্যে হাত কেটে নেওয়া বা গলায় জ্যান্ত কই মাছ ঢুকিয়ে দেওয়ার অত্যাচার আজও লোকের মুখে মুখে ঘোরে। বামেদের সেই রক্ত হিম করা রাজনীতির ছোঁয়া আজকেও দেখা যায় যখন বিরোধী দলের সদস্যের চোখে গুলি করে মারা হয়। রাজনীতির দল, রং বদলায়, ধরন সেই একই থাকে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের দাপটকে সিপিএম-এর আমলের সেই ভয়ংকর দিনগুলির সঙ্গে তুলনা করা যায় না কোনওভাবেই। তার প্রধান কারণ দু'টি।

তৃণমূলের বামেদের সংগঠন নেই আর তাই তারাও মার খাচ্ছে
প্রথমত, তৃণমূল কোনওদিনই সিপিএম-এর মতো সংগঠিত দল ছিল না। বামেদের দলের বাঁধন এবং সংগঠনের মধ্যে দিয়ে যে ত্রাসের রাজ চলত, তা তৃণমূলের মতো এক-ব্যক্তিকেন্দ্রিক দলের পক্ষে চালানো সম্ভব নয়। আর তাই বামেরা যেমন একপেশে মারতো তাদের আমলে, তৃণমূল কিন্তু সেটা পারছে না। দলের বাঁধন তো দূরে থাকে, এমন ভাঙন দেখা দিয়েছে যে সর্বোচ্চ নেত্রী প্রচন্ড নিজের ক্ষোভ-হতাশা ধরে রাখতে পারছেন না। সাংগঠনিকভাবে বাংলায় বিজেপি এখনও দুর্বল হলেও সারা দেশের নিরিখে দেখলে তারাও কিন্তু বামেদের মতো ক্যাডার-নির্ভর দল। তৃণমূলের মতো ব্যক্তি-কেন্দ্রিক দলের পক্ষে তাই তাদের সঙ্গে টক্কর দেওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং, বিশেষ করে আসন সংখ্যা যেখানে প্রায় সমানে সমানে এসে দাঁড়িয়েছে।

মিডিয়ার রমরমা; আজকের মিডিয়া থাকলে বামেরা কি ৩৪ বছর পেরোতে পারতো?
দ্বিতীয় কারণটি হচ্ছে মিডিয়ার রমরমা। সত্তর, আশি, নব্বই বা দু'হাজারের দশকে বামেরা যখন গ্রামাঞ্চলে ত্রাসের সৃষ্টি করতো, তখন এত ক্যামেরা, মাইক্রোফোনের চল ছিল না। এমনকি, খাস কলকাতার বুকে আনন্দমার্গীদের পুড়িয়ে মারার ঘটনা না কলকাতার কাছেই বানতলায় ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার রেশ রাজনৈতিকভাবে প্রায় কিছুই পড়েনি; বামেরা বহাল তবিয়তে চালিয়ে গিয়েছেন সরকারে; জবাবদিহির ন্যূনতম প্রয়োজনও তাদের পড়েনি। আজকের দিনে কিন্তু এমন ঘটনা ভাবাই যায় না। কিন্তু শেষের দিকে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে বামেদের সেই কণ্ঠরোধের রাজনীতি বে-আব্রু করে মিডিয়াই। মমতা সরকারও বারবার এখানে হোঁচট খাচ্ছে। কামদুনিতে তিনি মেজাজ হারালে তা সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর লোক দেখে ফেলছে আর তৃণমূলের জনপ্রিয়তায় একটু হলেও কালি লাগছে। আজকের মতো মিডিয়ার রমরমা থাকলে বামেরা ৩৪ বছর ক্ষমতায় টিকতে পারতো কী না সন্দেহ। আর সেটা বোঝা যাচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শাসনের নবম বছরে পড়তেই।












Click it and Unblock the Notifications