পিতা পুত্র হত্যাকাণ্ডে যাবজ্জীবন রায়ে অসন্তোষ, উচ্চ আদালতের পথে পরিবার, পাশে থাকার আশ্বাস বিরোধী দলনেতার
মুর্শিদাবাদের শমসেরগঞ্জে আলোড়ন তোলা পিতা পুত্র খুনের মামলায় আদালতের রায়ে ক্ষুব্ধ নিহতদের পরিবার। অভিযুক্ত ১৩ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষণায় সন্তুষ্ট নয় হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর পুত্র চন্দনের পরিবার। দোষীদের ফাঁসির দাবিতে অনড় থেকে এই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পরিবার। সেই আইনি লড়াইয়ে পাশে থাকার আশ্বাস দিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
সংশোধিত ওয়াকফ আইনের বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে গত এপ্রিল মাসে উত্তাল হয়ে উঠেছিল মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ এলাকা। শমসেরগঞ্জ, সুতি, ধুলিয়ান একের পর এক জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে অশান্তি ও হিংসা। সেই অশান্ত পরিবেশের মধ্যেই ১২ এপ্রিল শমসেরগঞ্জে খুন হন হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর ছেলে চন্দন। ঘটনাটি ঘিরে রাজ্যজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়। যদিও পুলিশের তরফে প্রথম থেকেই দাবি করা হয়, এই খুনের পিছনে রাজনৈতিক কারণ নয়, ব্যক্তিগত শত্রুতাই মূল কারণ।

ঘটনার গুরুত্ব বুঝে বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করে তদন্তে নামে রাজ্য পুলিশ। চলতি বছরের ৬ জুন ১৩ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে চার্জশিট জমা পড়ে আদালতে। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে গত সোমবার জঙ্গিপুর মহকুমা আদালতের বিচারক অমিতাভ মুখোপাধ্যায় ১৩ জনকেই দোষী সাব্যস্ত করেন। মঙ্গলবার প্রত্যেকের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা ঘোষণা করা হয়।
তবে এই রায়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছে নিহতদের পরিবার। মঙ্গলবার আদালতে রায় ঘোষণার সময়ই হরগোবিন্দের স্ত্রী পারুল দাসকে পাশে বসিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "এই রায়ে আমরা খুশি নই। গোটা দেশ এই খুনের জন্য ফাঁসির সাজা চেয়েছিল। পারুল দাসের সম্মতিতেই বলছি পরিবার এই রায়ের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে যাবে। প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়াই হবে। সেরা আইনজীবীদের দিয়ে আমরা আইনি সহায়তা করব।"
এখানেই থামেননি বিরোধী দলনেতা। ফাঁসির সাজা না হওয়ার জন্য রাজ্য পুলিশের ভূমিকাকেও কাঠগড়ায় তুলেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, "কামদুনির মতোই পুলিশ এই মামলাটাকেও নষ্ট করেছে। এটা পুলিশের চক্রান্ত। কেন ফাঁসি হল না, তার দায় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর পুলিশের।" শুভেন্দুর দাবি, পরিবারের সদস্যরা তিন জন মূল অভিযুক্তকে চিহ্নিত করেছিলেন, যাঁদের সঙ্গে জমি সংক্রান্ত পুরনো বিবাদ ছিল। কিন্তু পুলিশ সকল অভিযুক্তকে এক সারিতে দাঁড় করিয়ে বিচারপ্রক্রিয়াকে বিভ্রান্ত করেছে।
তিনি আরও বলেন, "পরিবার যে ফাঁসির দাবি করছে, তার সঙ্গে আমরা সম্পূর্ণ একমত। পারুল মায়ের আইনি লড়াইয়ে আমরা শেষ পর্যন্ত পাশে থাকব। দোষীদের মৃত্যুদণ্ড না হওয়া পর্যন্ত এই লড়াই চলবে।"
অন্যদিকে, রায় ঘোষণার পর মামলার সরকারি আইনজীবী বিভাষ চট্টোপাধ্যায় জানান, এই মামলায় মোট ৩৮ জন সাক্ষী ছিলেন, যার মধ্যে পাঁচ জন প্রত্যক্ষদর্শী। এছাড়াও একজন নিহতের মৃত্যুকালীন জবানবন্দি আদালতে পেশ করা হয়। তাঁর কথায়, "আমরা ঘটনাটিকে 'বিরলের মধ্যে বিরল' বলে বিবেচনা করে ফাঁসির সাজা চেয়েছিলাম। তবে বিচারক সম্ভবত অভিযুক্তদের পারিবারিক পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেননি।"
যাবজ্জীবন রায়ে প্রশ্নচিহ্ন তুলে এবার উচ্চ আদালতের লড়াইয়ে নামতে চলেছে নিহত পিতা পুত্রের পরিবার। তাদের দাবিতে শেষ পর্যন্ত আদালতের উচ্চতর বেঞ্চ কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই তাকিয়ে এখন গোটা রাজ্য।












Click it and Unblock the Notifications