দশমীর দিন ব্যাতাইচণ্ডীর মাথায় মা দুর্গার মুকুট পরিয়ে দেওয়াই রীতি রায়চৌধুরী বাড়ির পুজোয়
দেবী দুর্গার স্বপ্নাদেশ পেয়েই শিবপুরের রায়চৌধুরী পরিবারে শুরু হয়েছিল দুর্গাপুজো। চণ্ডীর উপাসক রাজা রামব্রহ্ম ৩৩৩ বছর আগে পুজোর প্রচলন করেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।
ঐতিহ্য বজায় রেখে আজও দেবী দুর্গার আরাধনা হয়ে চলেছে হাওড়ার শিবপুরের রায়চৌধুরি পরিবারে। এই পরিবারে পূজিতা মা দুর্গার মুকুট প্রতি বৎসর দেবী ব্যাতাইচণ্ডীর মাথায় পরিয়ে দেওয়াই রীতি। ব্যাতাইচণ্ডীর পুরানো মুকুটটি ঠাকুর দালানের পাশে বেলগাছের তলায় রেখে দেওয়া হয়। দক্ষিণা কালীপুজো পর্যন্ত তা রেখে, কালী প্রতিমা বিসর্জনের সময় ভাসান দেওয়া হয় গঙ্গায়। সেই পুরানো প্রথা আজও পালন করে চলেছে রায়চৌধুরি পরিবার।

হাওড়ার শিবপুরের রায়চৌধুরি পরিবারের এই পুজো হাওড়ার প্রাচীন পুজোগুলির অন্যতম। প্রাচীন পুজো, তাই কবে শুরু এই পুজোর, তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত রয়েছে। পুরনো নথি অনুযায়ী, এবার এই পুজো ৩৩৩ বছরে পা দিল। তবে প্রবীণদের মতে, এই পুজোর বয়স পাঁচশো বছরেরও বেশি।
তাঁদের কথায়, পূর্বপুরুষদের কাছে রায়চৌধুরিদের দু্র্গাপুজোর কথা শুনেছেন তাঁরা। সেই গল্পের নিরিখেই রায়চৌধুরি বাড়ির পুজো পাঁচ শতাব্দী পুরনো বলে ধারণা। এই বাড়ির পুরোহিতও একই দাবি করেছেন। এ প্রসঙ্গে রায়চৌধুরি পরিবারের বর্তমান সদস্য অরুণ রায়চৌধুরি বলেন, তাঁদের বাড়ির পুজোর বয়স আনুমানিক ৫০০ বছর বলে প্রয়াত পুরোহিত অজিত ঘোষাল তাঁকে জানিয়েছিলেন। ১১ পুরুষ ধরে বংশপরম্পরায় রায়চৌধুরি পরিবারে দুর্গাপুজো হয়ে আসছে বলে তিনি জানান।

অরুণবাবু জানান, তাঁদের প্রকৃত পদবি মুখোপাধ্যায়। তাঁরা আগে জমিদার ছিলেন। বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশ সেনাদের বিরুদ্ধে তাঁর পূর্বপুরুষরা লড়াই করেছিলেন। সে সময় নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ সাহসিকতার পুরস্কার স্বরূপ তাঁদেরকে 'রায়চৌধুরি' খেতাব দেন।

এই পরিবারে দুর্গা পুজোর প্রচলন কোন আঙ্গিকে? অরুণবাবুর কথায়, পূর্বপুরুষ রাজা রামব্রহ্ম রায়চৌধুরি ছিলেন দেবী চণ্ডীর উপাসক। তিনি স্বপ্নাদেশ পান দেবী দুর্গা পুজো শুরু করার জন্য। সেইমতো রাজা রামব্রহ্ম তৎকালীন পণ্ডিতবর্গের সঙ্গে কথা বলেন। কেননা তিনি চণ্ডীর উপাসক। তিনি কী করে দুর্গাপুজো করবেন! এই ভেবেই তীব্র মানসিক দ্বন্দ্বে পড়েন তিনি।

শেষপর্যন্ত ফের স্বপ্নাদেশ পেয়ে তিনি দুর্গাপুজো প্রচলন করেন। তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, 'দেবী দুর্গা তাঁকে বলছেন, তিনি দেবী চণ্ডীরই আর এক রূপ।' তখন স্বপ্নের মধ্যেই রামব্রহ্ম জিজ্ঞাসা করেন, 'তিনি তাঁর বাড়িতে কতদিন অধিষ্ঠান করবেন।' দেবী দুর্গা বলেন, 'যতদিন তোর বংশধরেরা আমায় ভক্তিভরে ডাকবে ততদিন আমি এখানে আসব।' এই স্বপ্নের পর সব সংশয় কাটিয়ে রাজা রামব্রহ্ম রায়চৌধুরি মহাসমারোহে বাড়িতে দুর্গাপুজো শুরু করেন।
তাই রাজা রামব্রহ্মচারী যদি পুজোর প্রচলন করে থাকেন, তবে সরকারি নথি ও পুরনো দলিল অনুযায়ী এই পুজোর বয়স এবার ৩৩৩-এ পা দিল। রাজা রামব্রহ্ম রায়চৌধুরি ১৬৮৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলার ১০৯২ সালে এই দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। রায়চৌধুরি বাড়ির ঠাকুরদালানে এই পুজো শুরু হয়।

অরুণবাবু বলেন, সে সময় রায়চৌধুরিদের ঠাকুরদালান রাজার আটচালায় একটা বেলগাছ ছিল। কথিত আছে, দেবী দুর্গা ওই বেলগাছের মধ্যে দিয়ে ধরাতলে নেমে আসেন। সেই জন্য ওই বেলগাছকে ঘিরেই রামব্রহ্ম দুর্গার উপাসনা শুরু করেন। তবে সেই প্রাচীন বেলগাছটি অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। সেখানে নতুন বেলগাছ লাগানো হয়েছে।
রায়চৌধুরী পরিবারের দুর্গাপুজোর বিশেষত্ব কী? এই সম্পর্কে অরুণবাবু জানান, পুজো শুরু হওয়ার আগে কৃষ্ণা নবমী তিথি থেকেই চণ্ডীপাঠ শুরু হয়ে যায়। দুর্গাপুজোর নবমী পর্যন্ত এই চণ্ডীপাঠ চলে। বৃহত্তর নান্দিকার মতে তাঁদের পরিবারে পুজো করা হয় মা দুর্গার। প্রাচীন প্রথা মেনে এখনও বলিদান হয়। সপ্তমীতে একটি, অষ্টমীতে দু'টি ছাগবলি দেওয়া হয়ে থাকে। নবমীর দিন দুর্গামণ্ডপ থেকে একটি ছাগ হাওড়ার শিবপুরে ব্যাতাইতলায় ব্যাতাইচণ্ডীর কাছে নিয়ে গিয়ে বলি দেওয়া হয়।

এই পুজোর আর একটি বড় রীতি হল, ব্যাতাইচণ্ডীর মুকুট এনে দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে ঠাকুর দালানে পুজো করা হয়। তারপর মা দুর্গার মাথায় মুকুট দশমীর দিন পরিয়ে দেওয়া হয় ব্যাতাইচণ্ডীর মাথায়। ব্যাতাইচণ্ডীর পুরানো মুকুটটি ঠাকুর দালানের পাশে বেলগাছের তলায় রেখে দেওয়া হয়। দক্ষিণা কালীপুজো সময় তা বিসর্জন দেওয়ার রীতি চলে আসছে আজও।












Click it and Unblock the Notifications