নারী-শক্তির জয়গানে পুরুষ সমাজে থরহরি কম্প, মহাষষ্ঠীতে একে অপরের হাত ধরল 'মি-টু' ও 'মা দুর্গা'

আশ্বিনের শারদ-প্রাতে বেজে উঠেছে আলোকও মঞ্জরী... ৮ অক্টোবর ভোরে যখন এই স্তোত্র পাঠ রেডিও-তে বেজে উঠেছিল তখন কে জানত যে এবারের দেবীপক্ষ কার্যত নারী শক্তিরই জয়গান হতে চলেছে!

আশ্বিনের শারদ-প্রাতে বেজে উঠেছে আলোকও মঞ্জরী... ৮ অক্টোবর ভোরে যখন এই স্তোত্র পাঠ রেডিও-তে বেজে উঠেছিল তখন কে জানত যে এবারের দেবীপক্ষ কার্যত নারী শক্তিরই জয়গান হতে চলেছে! কিন্তু, পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে তাতে পুজোর মূল দিনগুলিতেও এই জয়গান আরও বাড়বে বই কমবে না। সত্যিকারে এমন পুজো কবে হয়েছে যেখানে দুর্গার নারীশক্তির জয়গান এভাবে বাস্তবে সমাজের উপরে আঁছড়ে পড়েছে!

নারী-শক্তির জয়গানে পুরুষ সমাজে থরহরি কম্প, মহাষষ্ঠীতে একে অপরের হাত ধরল মি-টু ও মা দুর্গা

তাই আশ্বিন শারদ-প্রাতে মহাষষ্ঠীতে পুজোর যে আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়ে গেল তাতে এখন মিলে-মিশে একাকার 'মি-টু' মুভমেন্ট। নরেন্দ্রপুর গ্রিনপার্ক সর্বজনিন-এর এবারের থিম 'মুছে দিয়ে সব কালো, আমার উমা ঘরে এল'। যার হাত ধরে উঠে এসেছে সমাজের অব্যক্ত রোজকার নারী নির্যাতনের কথা। যেখানে প্রতিনিয়তই নারীদের কোনও না কোনওভাবে সমাজের বুকে নিপীড়িত ও লাঞ্ছনার শিকার হতে হচ্ছে। পুরুষ সমাজের লালায়িত ভোগের সামনে পণ্যের মতো ব্যবহৃত হচ্ছেন নারীরা। আর এই সব নারীর মধ্যে লুকিয়ে থাকা নারী শক্তি একদিন রুখে দাঁড়িয়ে পুরুষরূপী এই অসুরদের বধ করছেন। নরেন্দ্রপুর গ্রিনপার্ক সর্বজনিন-এর এই ভাবনা এখন দুর্গাপুজোর প্রেক্ষাপটে 'মি-টু' আন্দোলনের সঙ্গে সমার্থক হয়ে উঠেছে। 'মুছে দিয়ে সব কালো, আমার উমা ঘরে এল'- এই ভাবনাকে বাস্তবায়িত করার সময় আদৌ এই পুজো কমিটি 'মি-টু'-র উত্তাপকে আগাম আঁচ করতে পেরেছিল কি না তা বলা কঠিন। কিন্তু, বাস্তব সমাজজীবনে নারী শক্তির এমন জয়গানের মধ্যে দিয়ে দুর্গাপুজোর আরাধানার উদাহরণ খুব একটা পাওয়া যায় না।

বরং বারবার সমাজের কোনও সাম্প্রতিক প্রভাব ফেলা ঘটনাকেই দুর্গাপুজো মণ্ডপে স্থান পেতে দেখা যায়। যেমন মাঝেরহাট উড়ালপুলের ভেঙে পড়ার ঘটনা এবার কলকাতা এবং জেলার বহু পুজো মণ্ডপে স্থান পেয়েছে। কিন্তু, এমনভাবে পুজো মণ্ডপে স্থান পায়নি 'মি-টু'। অমিতাভ বচ্চন থেকে শুরু করে কিংবদন্তি সাংবাদিক তথা বিদেশপ্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর, বলিউড ইন্ডাস্ট্রির একাধিক কেস্টবিস্টু, বিসিসিআই-এর রাহুল জোহরি, এমনকী খোদ কলকাতায় দুই সাংবাদিক-এর নামও জড়িয়ে গিয়েছে 'মি-টু'-তে।

'মি-টু' যেমন এক অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা সত্যকে প্রকাশ্যে আনার নারীশক্তির লড়াই, তেমনি এমন কিছু নারী এবার পুজোর সময়ই শিরোনামে এসেছেন তাঁদের উজ্জ্বল কৃতিত্বের জন্য। যেমন স্বপ্না বর্মণ। শারীরিক থেকে আর্থিক সমস্ত প্রতিবন্ধকতাকে উড়িয়ে দিয়ে আজ স্বপ্না এশিয়া মাহাদেশের বুকে তাঁর উজ্জ্বল কৃতিত্বকে শুধু স্থাপনই করেননি, ভারতের ক্রীড়াক্ষেত্রে এক ইতিহাস রচনা করেছেন।

সমাজের বুকে গড়ে ওঠা এই সব টুকরো-টুকরো ছবির পিছনের ব্যাকড্রপে তাকালে যেটা স্পষ্ট হয়ে উঠছে তা হল নারীশক্তি। এই শক্তিকেই আধার করে তৈরি হয়েছে দুর্গা-কথা। মা-উমার বাপের বাড়িতে আসা-যাওয়ার মাঝেও রয়েছে এক নারীশক্তির লড়াই। নেশাতুর, ভবঘুরে, উন্নাসিক স্বামীর ঘর-সংসার সামলাতে-সামলাতে ক্লান্ত উমা। সংসারে দু'মুঠো অন্ন সংস্থানেরও চিন্তা নেই মহাদেবের। যেখান-সেখানে গাঁজার নেশায় নন্দি-ভিঙ্গি-কে সঙ্গে করে ছাই মেখে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। স্বামীর এমন ছন্নছাড়া বারবার মা মেনকা, পিতা হিমালয়ের স্নেহের স্পর্শের জন্য ডুকরে ওঠে উমার মন। উমার বাপের বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্তে তো রেগে কাঁই শিব। শ্বশুরবাড়িতে কদর না পাওয়া জামাই শিব চান না উমা সন্তানদের সঙ্গে করে বাপের বাড়ি যান। এই কাহিনি-তো বাংলার ঘরে ঘরে। যেখানে বাড়ির বিয়ে হয়ে যাওয়া মেয়েটির স্বামীর ঘরের কাহিনি মিলে যায়।

শিব যতই ভিখারি হন, উমার পিতৃগহ তো হিমালয় রাজ। এমন এক পরিবারের মেয়েকে সুসজ্জিত করে গৃহে না ঢোকালে মান-সম্মানটা থাকে কোথায়। কিন্তু সেখানেও তো বিপত্তি। কারণ কৈলাস থেকে সন্তান আর পোষ্যদের নিয়ে তো উমা একা বাইরে পা রাখার জো নেই। শিব-তো তাহলে মহাতাণ্ডব জুড়ে দেবেন। কিন্তু, নেশাখোর শিব যখন স্ত্রী ও ছেলে-মেয়েদের নিয়ে হিমালয়রাজের বাড়ির চৌহদ্দিতে পৌঁছন তখন অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে। মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের নতুন জামা-কাপড়় না পরিয়ে কিছুতেই ঘরে তুলবেন না হিমালয়। এদিকে সূর্য অস্তে গিয়ে অন্ধকারও নেমে গিয়েছে। শেষমেশ মেয়ে ও নাতি-নাতনি বরণ করলেও রাতের জন্য বাড়ির বেলতলাতেই তাঁদের ঠাঁই দেন হিমালয়। শাস্ত্রমতে এটাই বোধন। রাত পেরিয়ে সকালের আলো ফুটলে মেয়ে ও নাতি-নাতনিদের স্নান করিয়ে নতুন জামা-কাপড় পরিয়ে ঘরে তোলার তোড়জোড় শুরু করে দেন তিনি। শাস্ত্রমতে এটাই সপ্তমী। উমা-র পিতৃগৃহে পা-রাখার দিন।

এবার দিন হিসাবে ১৫ তারিখ মহাষষ্ঠী হলেও, সময় ও কাল অনুযায়ী ষষ্ঠী শুরু হয়ে গিয়েছে মহাপঞ্চমীতে। যার ফলে মা-এর বোধনও এবার হয়ে গিয়েছে মহাপঞ্চমীর সন্ধ্যায়। বলতে গেলে এবার হিমালয় গৃহে বেলতলায় উমা ও তাঁর সন্তানদের দেড়দিন কাটাতে হচ্ছে। আর এই অপেক্ষার অবসান হলেই বাপের বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশ ঘটবে উমার। ১২ মাসের মাথায় ফের মেয়ের সঙ্গে মিলন ঘটবে মেনকা ও হিমালয়ের। আর এই মিলন উৎসবে চারদিন ধরে আনন্দে মেতে উঠবে সকলে।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+