দশমীতে বন্দুক ধ্বনি, দু-নৌকায় চাপিয়ে বিসর্জন, বনেদি বাড়ির পুজোয় লুকিয়ে এমনই কিছু ট্র্যাডিশন
কলকাতা শহরের অভিজাত বনেদি বাড়ির পুজোগুলোর মধ্যে অন্যতম ৪৭ নং পাথুরিয়া ঘাটা স্ট্রিটের খেলাত ঘোষ বাড়ির পুজো। এই বাড়ির পুজো এবার ১৬৫ তম বর্ষে পা দিল
কলকাতা শহরের অভিজাত বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজো গুলির মধ্যে অন্যতম ৪৭ নং পাথুরিয়া ঘাটা স্ট্রিটের খেলাত ঘোষ বাড়ির পুজো। এই বাড়ির পুজো এবার ১৬৫ তম বর্ষে পা দিল।

কীভাবে যাবেন
গিরিশ পার্ক মেট্রো স্ট্রেশন থেকে নেমে মিনিট দশেকের হাঁটা পথে গণেশ টকিজ। সেখানেই যে কাউকে জিজ্ঞাসা করুন পাথুরিয়াঘাটার খেলাত ঘোষের বাড়ি। মুহূর্তে পথের নির্দেশ দিয়ে দেবে যে কেউ। গণেজ টকিজের মোড় থেকে মিনিট দুয়েকের পথ। পাথুরিয়াঘাটায় পৌঁছে প্রথম গলিতে ঢুকে, উত্তর কলকাতার নস্ট্যালজিক আবেগটা পেতে না পেতেই কয়েক পা দূরেই পেল্লাই সাইজের বড়ো বড়ো থামওয়ালা এক রাজবাড়ি। বাইরে প্রবেশ পথে সিংহের দুই মূর্তি। দেখেই বুঝে নিতে অসুবিধে হবে না, ওটাই খেলাত ঘোষ রাজবাড়ির দুর্গাপুজো।

পুজো শুরু কবে
এই পুজো শুরু ১৮৫৫ সালে। বাবু খেলাত চন্দ্র ঘোষ এই পুজো শুরু করেন। পাথুরিয়াঘাটার বিখ্যাত ঘোষ বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন রামরাম ঘোষের ছেলে রামলোচন ঘোষ। রামলোচন ৪৬ নম্বর পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটের বাড়িতে দুর্গাপুজা শুরু করেছিলেন। রামলোচনের তিন পুত্র শিবনারায়ণ, দেবনারায়ণ ও আনন্দনারায়ণ। রামলোচনের মেজো ছেলে দেবনারায়নের ছেলে বাবু খেলাত ঘোষ আনুমানিক ১৮৪৬ সালে পুরনো বাড়ির পাশেই ৪৭ নং পাথুরিয়াঘাটা স্ট্রিটে দুর্গাদালানসহ নতুন বাড়ি তৈরি করে সেখানে থাকতে শুরু করেন। সেই বাড়িই পাথুরিয়াঘাটার খেলাত ঘোষের বাড়ি ও সে বাড়ির পুজো, খেলাত ঘোষের বাড়ির পুজো নামে পরিচিত।

এবাড়ির দুর্গাপুজো মঠচৌরি চালের, জেনে নিন প্রতিমার বৈশিষ্ট্য
এবাড়ির দেবী মঠচৌরি চালের অর্থাৎ তিনচালার প্রতিমা। এবাড়ির দুর্গাপুজার বিশেষ একটা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এবাড়ির প্রতিমায় লক্ষ্মী-সরস্বতীর সঙ্গে পেঁচা বা হাঁস নেই। এ বাড়িতে লক্ষ্মী-সরস্বতীকে দশমহাবিদ্যা মতে কমলকামিনী রূপে পুজো করা হয়। লক্ষ্মীর পিছনে মহাদেবের বিগ্রহ রয়েছে। অন্যদিকে সরস্বতীর পিছন দিকে রামচন্দ্রের বিগ্রহ রয়েছে। অকাল বোধন পুজোর জন্যই রামচন্দ্রের বিগ্রহ রয়েছে। প্রতিমায় মা দুর্গার গায়ের রঙ হলুদ, দুর্গার বাহন সিংহ এখানে সাদা রঙের ঘোটক সিংহ। অন্যদিকে অসুরের গায়ের রঙ সবুজ। এবাড়ির প্রতিমা ডাকের সাজের। প্রতিমাকে সোনা-রূপার অলঙ্কার পরানো হয়।

ঠাকুর দালান
কলকাতার বনেদি বাড়ির দীর্ঘতম ঠাকুর দালানগুলির মধ্যে খেলাত ঘোষের বাড়ির ঠাকুর দালান অন্যতম। ৮০ ফুট লম্বা এই ঠাকুর দালানেই দুর্গা পুজো হয়।

নবপত্রিকাকে বাড়িতেই স্নান করানো হয়
এ বাড়িতে এটাই চল। এবাড়িতে নবপত্রিকাকে বাড়ির ভিতরেই স্নান করানো হয়। আগেরকার দিনে বাড়ির মা-বউরা খুব একটা রাস্তায় বেড়োতেন না। সেকারণেই বাড়িতেই নবপত্রিকা স্নানের রীতি রয়েছে।

পুজোর রীতি
প্রতিপদ,পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী পাঁচদিন কুমারী পুজোর রীতি রয়েছে।সপ্তমী, অষ্ঠমী ও নবমী তিথি ও সন্ধি পুজোতে চিনির মঠের বলিদান হয়।অন্ন ভোগের পরিবর্তে শুকনো চালের ভোগ, লুচি-পাঁচ রকমের ভাজার ভোগ দেওয়া হয়।

বিসর্জনের বিশেষ রীতি
এবাড়ির প্রতিমা বিসর্জনের বিশেষ রীতি রয়েছে। সাত বার বন্দুক ধ্বনি জানিয়ে মায়ের বিদায় জানানো হয়। দশমীর দিনে দুপুর বারোটার মধ্যে প্রতিমার প্রাণ বিসর্জন হয়। এরপর বরণ ও সিঁদুর খেলা। এরপর বাঁশের কাঠামোয় ঠাকুর বেঁধে কাঁধে করে বিসর্জনের ঘাট পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। বিসর্জনের জন্য বাড়ি থেকে ঠাকুর বার করার আগে সাত বার গান স্যালুট দেওয়া হয়। এরপর সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে প্রসন্ন কুমার ঠাকুর ঘাটে জোড়া নৌকায় মাঝগঙ্গায় নিয়ে গিয়ে প্রতিমা বিসর্জন করা হয়।












Click it and Unblock the Notifications