হুগলির মিত্র-মুস্তাফিদের পুজো ধ্বংসাবশেষ বুকে নিয়েই কৌলিন্য-আভিজাত্যে আজও অমলিন
আলোর চোখ ধাঁধানো রোশনাই, জাঁকজমক থেকে অনেক দূর..। তবে পরম্পরা মেনে সমারোহের সাধ্যমতো আয়োজনে নেই কোনও কার্পণ্য। হয়তো এভাবেই ব্যাখ্যা করা সহজ হবে হুগলির সুখারিয়ার মিত্র-মুস্তাফিদের পুজোকে।
আলোর চোখ ধাঁধানো রোশনাই, জাঁকজমক থেকে অনেক দূর..। তবে পরম্পরা মেনে সমারোহের সাধ্যমতো আয়োজনে নেই কোনও কার্পণ্য। হয়তো এভাবেই ব্যাখ্যা করা সহজ হবে হুগলির সুখারিয়ার মিত্র-মুস্তাফিদের পুজোকে। বাংলায় পঞ্চ কুলীনের অন্যতম 'মিত্র' পদবীর সঙ্গে কিভাবে 'মুস্তাফি' জুড়ে গেল ? সে প্রশ্নের উত্তরে এবাড়ির ইতিহাস এক অনন্য কাহিনি বলে। তেমনই হুগলির এই প্রসাদোপম বাড়ির দুর্গাপুজোও অতীত গৌরব বুকে নিয়ে আজও কৌলিন্যের গর্বের ইতিহাস ধরে রেখেছে।
|
জীর্ণপ্রায় প্রাসাদ ও সমারোহের উজ্জ্বল আয়োজন
এবাড়ির উঠোনে পা রাখলেই একজোটে একাধিক ইতিহাস-পর্ব যেন ফিসফিসিয়ে অনেকে গল্প শোনাতে চায়। এককালে সদর্পে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়ির খিলান আজ শ্যাওলার প্রলেপে 'পুরনো' হয়েছে। বাড়ির বিভিন্ন জায়গার দেওয়াল আঁকড়ে বাড়ছে গাছ-গাছালি, খসে পড়েছে পলেস্তারা, বাড়ির পাঁচিল আজ ভগ্নপ্রায়। বাড়ির বিভিন্ন অংশের ইওয়োপিয় কাঠামোতেই বোঝা যায় এবাড়ির প্রাচীন ইতিহাস কতটা গৌরবের ছিল। বাড়ির বারান্দা,প্রাঙ্গন ঘুরতে ঘুরতেই মনে এসে যেতে পারে সত্যজিতের 'জলসাঘর' ছবির বেশ কিছু দৃশ্য। আর ঠিক তখনই চোখ চলে যায় ঠাকুর দালানে। যেখানে মা দূর্গা সাড়ম্বরে অধিষ্ঠিত থাকেন পুজোর ক'টা দিন।
(ছবি সৌজন্য:টিম 'হুগলি হেরিটেজ'- প্রোজ্জ্বল দাস, সুচিন্ত্য মল্লিক, শঙ্খশুভ্র গঙ্গোপাধ্যায়)

'মিত্র-মুস্তাফি'দের ইতিহাস ও মোঘল আমলের কাহিনি
বাঙালি কায়স্থ কুলীন বংশ 'মিত্র'দের সঙ্গে জুড়েছে 'মুস্তাফি'দের নাম। অবাক লাগলেও এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে এক কাহিনি। শোনা যায়, এই বংশের পূর্বপুরুষরা বহুকাল আগে উলা বীরনগর ও সিরপুরের দেওয়ান ছিলেন। সেই বংশের কালিদাস মিত্র তৎকালীন কনৌজ থেকে বাংলায় আসেন।এঁদেরই ১৯ তম প্রজন্মে ছিলেন রামেশ্বর মিত্র। তিনি মোঘল সম্রাট ঔরাঙ্গজেবের রাজসভার রক্ষক ছিলেন বলে কথিত রয়েছে। সেই সেই সময় থেকেই মোঘল-দত্ত 'মুস্তাফি' উপাধি পান রামেশ্বর মিত্র। আর তাঁর বংশধরদের পদবী হয়ে যায় 'মিত্র মুস্তাফি'।

বাড়ির ঠিকানা
এই বাড়ির ঠাকুর দেখতে হলে, হাওড়া থেকে কাটোয়া লাইনে সোমরাবাজার পৌঁছে যেতে হবে। স্টেশনে নেমে রিক্সা বা টোটোতে চলে যেতে পারবেন মিত্র মুস্তাফি বংশের 'রাধাকুঞ্জ' বাড়িতে। বাড়ি জুড়ে রয়েছে দুর্গা দালান। সেখানেই পূজিতা হন মা দূর্গা। এলাকায় রয়েছে আনন্দ ভৈরবী মন্দির । রয়েছে তার সংলগ্ন 'উঠোন'। রয়েছে হরসুন্দরী মন্দির। সবমিলিয়ে মফস্বলের এক চোখ জোড়ানো সৌন্দর্য গোটা 'রাধাকুঞ্জ' জুড়ে।

২৫ রত্নচূড়ার আনন্দ ভৈরবী মন্দির
এই সুখারিয়া গ্রামে রয়েছে মিত্র মুস্তাফি বংশের নির্মিত ২৫ রত্নচূড়ার আনন্দ ভৈরবী মন্দির। যা বাংলার টেরাকোটা ইতিহাসের অন্যতম নিদর্শন। এছাড়াও এখানে দেখা যায় আরও ১২টি টি আলাদা মন্দির। দুই সারিতে তা বিভক্ত। এখানের হরসুন্দরী মন্দিরের কাছের পুকুর পাড়ে তৈরি হয়েছে দূর্গা দালান। সেখানেই পূজিতা হন মা।সবমিলিয়ে সুখারিয়ার 'রাধাকুঞ্জের' নির্মাতা রামজীবন মিত্র মুস্তাফির এই বাড়ি আজ শুধু করুণ বাস্তব আর অতীতের উজ্জ্বল ইতিহাস সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলেছে।












Click it and Unblock the Notifications