শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে ডিআই বললেন 'চাবকে পিঠের চামড়া তুলে নেব', প্রকাশ্যে ভাইরাল অডিও টেপ
'চাবকে পিঠের চামড়া তুলে নেব'। শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে এমনই হুঁশিয়ারি দেওয়ার অভিযোগ উঠল এক দক্ষিণ ২৪ পরগণার ডিআই-এর বিরুদ্ধে। স্কুল শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন ডিআই নজরুল হক সিপাই।
'চাবকে পিঠের চামড়া তুলে নেব'। শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে এমনই হুঁশিয়ারি দেওয়ার অভিযোগ উঠল দক্ষিণ ২৪ পরগণার ডিআই-এর বিরুদ্ধে। স্কুল শিক্ষকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন ডিআই নজরুল হক সিপাই। অভিযোগ, সেই বৈঠকেই তিনি প্রকাশ্যে সমস্ত শিক্ষককে 'চাবকে পিঠের চামড়া' তুলে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। অভিযোগ, ডিআই নজরুল হক হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, কেউ যদি এই বৈঠকের কোনও ভিডিও বা অডিও রেকর্ড করেন এবং তা বাইরে প্রকাশ করেন তাহলে 'চাবকে পিঠের চামড়া' তুলে নেওয়া হবে। এক ডিআই-এর এমন মন্তব্য কি আদৌ একজন প্রকৃত শিক্ষাকর্মীর মতো?- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

এই ঘটনাটি দক্ষিণ ২৪ পরগণার নামখানার দুর্গাপুরের চঞ্চলাময়ী আদর্শ বিদ্যাপীঠে। সপ্তাহ দুয়েক আগেই এই স্কুলের ছয় শিক্ষক এবং অশিক্ষক কর্মীদের বহিরাগতরা এসে মারধর করে। অভিযোগ বহিরাগতদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তৃণমূলের স্থানীয় এক নেতা। আর এর জন্য প্রহৃত শিক্ষকরা ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক আশিস ভট্টাচার্যের দিকে আঙুল তুলেছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত প্রধানশিক্ষকের মদতেই এই হামলা। এই মারধরের ঘটনার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায়তে ভাইরালও হয়ে যায়। প্রহৃত শিক্ষকদের অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের বিভিন্ন অনিয়মের প্রতিবাদ করাতেই তাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন।
এই ঘটনার পর আক্রান্ত শিক্ষকরা ডিআই-এর কাছে নালিশ জানান। পুলিশে এফআইআরও করেন। বিষয়টি যাতে রাজ্য সরকারের কানে তোলা হয় তার জন্য বিধানসভায় বামেদের মুখ্যসচেতক সুজন চক্রবর্তী এবং বিরোধী দলনেতা আব্দুল মান্নানের কাছেও অভিযোগ জানান। দিন কয়েক আগে শিক্ষক ঐক্য মুক্ত মঞ্চের পক্ষ থেকে স্কুলের কাছে প্রতিবাদ সভাও করা হয়। এই সভা থেকে হামলার ঘটনায় দোষীদের গ্রেফতারির দাবিও তোলা হয়। সিপিএম-এর ছাত্র সংগঠন এসএফআই-ও স্কুলে পোস্টার সাঁটায়।
পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক করতে সোমবার আচমকাই সন্ধ্যার আগে স্কুলে এসে হাজির হন ডিআই নজরুল হক সিপাই এবং তাঁর দল। সমস্ত শিক্ষকদের নিয়ে বৈঠক শুরু হতেই নজরুল হক 'পিঠের চামড়া তুলে' নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন বলে অভিযোগ।
শুধু এখানেই শেষ নয়, বৈঠক শুরু হতেই সিপিএম-এর নাম করে তুমুল গালাগালি দিতে থাকেন বলেও অভিযোগ। আক্রান্ত শিক্ষকরা সুজন চক্রবর্তী ও আব্দুল মান্নানের দ্বারস্থ হয়েছিলেন, তা নিয়ে প্রবল ধমকানি দিতে শুরু করেন বলেও অভিযোগ। নামখানার চঞ্চলাময়ী আদর্শ বিদ্যাপীঠের অচলাবস্থা নিয়ে বহুদিন ধরেই নানা ঘটনা ঘটে আসছে। ২৩ তারিখে স্কুলের ভিতরে তৃণমূল নেতার নেতৃত্বে হামলার ঘটনা ঘটে তা যেন ছিল শেষ পেরেকটা ঠোকার মতো। বৈঠকে হাজির সকলেই আশা করেছিলেন যে স্কুলের পঠন-পাঠনকে স্বাভাবিক করা থেকে শুরু করে অপ্রতুল শিক্ষকের সংখ্যাকে বাড়ানোর বিষয়-সহ আক্রান্ত শিক্ষকদের মারধরের ঘটনা নিয়ে হয়তো ডিআই আলোচনা করবেন। কিন্তু, দক্ষিণ ২৪ পরগণার স্কুল জেলা পরিদর্শক যেভাবে বৈঠকের শুরুতেই রণংদেহী মূর্তি ধরে রাজনৈতিক বক্তব্য রাখতে শুরু করেন তাতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
সেই বিতর্কিত অডিও টেপ--
বৈঠকে হাজির অনেকের মতে, মনে হচ্ছিল ডিআই কোনও সরকারি দফতর থেকে নয় তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিস থেকে বেরিয়ে বৈঠক করতে এসেছেন। দিন কয়েক আগেই শিক্ষক ঐক্য মঞ্চ স্কুলের কাছেই সভা করে। এই সভায় উপস্থিত ছিলেন আক্রান্ত আমরার অম্বিকেশ মহাপাত্র, অরুণাভ গঙ্গোধ্যায়, মইদুল ইসলামরা। তাঁরা চঞ্চলাময়ীর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের অপসারণ দাবি করা থেকে শুরু করে দোষীদের গ্রেফতারি এবং আক্রান্ত শিক্ষকদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার দাবি তোলেন। বৈঠকে থাকাদের অভিযোগ, সমস্যা সমাধান নয় ডিআই-আর আসল রাগ ঘটনায় সিপিএম ও আক্রান্ত আমরা-র প্রতিবাদ করাটা। তাই শিক্ষকদের উপরে হামলার ঘটনায় কোনও নিন্দাসূচক বাক্য না বলেই কেন তারা চারিদিকে বিষয়টি জানাজানি করলেন তা নিয়ে অধিকাংশ সময় সওয়াল করে যান ডিআই। অথচ, যে তৃণমূলনেতার নেতৃত্বে স্কুলের শিক্ষকদের উপরে হামলা তা নিয়ে একটা বাক্যও খরচ করেননি তিনি। মাঝখানে বেশকিছু শিক্ষক স্কুলের অনিয়ম ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা কথা বলার চেষ্টা করেন। অভিযোগ, মাত্র ২ জনের বক্তব্য শোনা ছাড়া আর কারোর কথাতেই কান দেননি তিনি। চঞ্চলাময়ী আদর্শ বিদ্যাপীঠের শিক্ষকদের পিএফ থেকে সার্ভিস বুক নিয়ে বহুদিন ধরে অচলাবস্থা- তা নিয়ে ডিআই কোনও কথাই শোনেনি বলে অভিযোগ। ২৮ সেপ্টেম্বর ফের বৈঠক করবেন বলে বেরিয়ে যান।

ওয়ানইন্ডিয়া বাংলার পক্ষ থেকে ডিআই নজরুল হক সিপাই-এর সঙ্গে কথাও বলা হয়। বৈঠকে সুজন চক্রবর্তী, আব্দুল মান্নান, আক্রান্ত আমরা, মইদুল ইসলাম, অম্বিকেশ মহাপাত্রদের নাম যে তিনি নিয়েছেন তা স্বীকার করে নেন। তবে, তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক, তা মানতে চাননি তিনি। তাঁর যুক্তি একটা স্কুলের ঘটনার সঙ্গে এরা কেন জড়াবে সেই প্রশ্নই তিনি রেখেছেন। তাঁর আরও অভিযোগ, নামখানা এলাকায় প্রতিবাদী শিক্ষক নেতা মইদুল ইসলাম স্কুলে না গিয়ে লোক খেপিয়ে বেড়াচ্ছেন। মইদুল এলাকায় সিপিএম, আক্রান্ত আমরা-কে দিয়ে চঞ্চলাময়ী আদর্শ বিদ্যাপীঠের ঘটনায় রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। স্কুলে কেন টয়লেট থাকবে না তা নিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে কড়া ধমকও দিয়েছেন বলে ডিআই নজরুল হক-এর দাবি। কিন্তু, স্কুলের আসল সমস্যা এবং কেন হামলা হল এই বিষয় নিয়ে কী ভাবছেন প্রশ্নের উত্তরে ডিআই জানান, পরে বৈঠক করে বিষয়টি মিটিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কথা প্রসঙ্গে ডিআই এও জানান যে শিক্ষমন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ডাকেই তিনি হাওড়ার স্কুল জেলা পরিদর্শকের পদ ছেড়ে দক্ষিণ ২৪ পরগণার দায়িত্ব নিয়েছেন।
বৈঠকের শেষে ডিআই-কে ঘিরে ধরে চঞ্চলাময়ী আদর্শ বিদ্যাপীঠের শিক্ষকের অপসারণও দাবি করেন কিছু অভিভাবক। যে ভাবে স্কুলের পঠন-পাঠনে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে তা দূর করতে ডিআই-কে অনুরোধও জানান তাঁরা।












Click it and Unblock the Notifications