বালুরঘাট কি তবে 'উল্টো রাজা'-র দেশে পরিণত হল, দুই প্রতিবাদীর গ্রেফতার উস্কে দিল নয়া বিতর্ক
রিং-রোডের মতো এক রাস্তাকে বেস্টন করেই গড়ে উঠেছে বালুরঘাট শহর। অথচ, পুজোর সময় এই রাস্তাকেই পুরো অচল করে দেওয়া হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন বালুরঘাট শহরের বাসিন্দারা।
মাসখানেক সময় ধরেই সোশ্যাল মিডিয়ায় বারবার উঠে আসছে বালুরঘাট শহরের নাম। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে বালুরঘাট যেভাবে বারবার শিরোনামে আসছে তাতে গত কয়েক দশকে এমনটা কতবার হয়েছে মাথা চুলকে বলা কঠিন! পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রের যেখানটা টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো বেঁকে আছে, সেখানে একটা ছোট বিন্দুর মতো জ্বলজ্বল করে বালুরঘাটের নামটা। মুক্তমনা, শান্ত আর সংস্কৃতির শহর বলেই বরাবর বালুরঘাটের নাম। বাংলাদেশ সীমান্তের গা ঘেঁষে থাকা আত্রেয়ী নদীর পারের এই শহরের ইতিহাস শতাধিক বছরেরও বেশি। আজও ইতিহাসের পাতায় স্বদেশী আন্দোলেনের যে বর্ণময় চরিত্রগুলোকে পাওয়া যায় সেখানে বালুরঘাটের চট্টোপাধ্যায় পরিবারের কয়েকজনের নামেরও দেখা মেলে। রাজ্যের প্রথম স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীলরঞ্জন চট্টোপাধ্যায় এই বালুরঘাটেরই লোক। বাংলা নাট্য আন্দোলনের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব মন্মথ রায়ও এই বালুরঘাট শহরেরই মানুষ। সুতরাং, বালুরঘাটের রাজনৈতিক ইতিহাস থেকে মুক্তমনা ব্যক্তিত্বদের কৃত-কর্মে মনোনিবেশ করলে তার হিসেব শেষ হওয়ার নয়।

এহেন এক শহরের বুকে সম্প্রতি যে ধরনের ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তাতে সাধারণ মানুষ যে উদ্বিগ্ন, কোনও সন্দেহ নেই। বারবার সামনে যে বিষয়টি চলে আসছে তা হল সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমাতে গিয়ে উল্টে তাঁদের আরও দুর্ভোগ বাড়িয়ে দিচ্ছে না তো পুলিশ-প্রশাসন? না হলে এক আজব নিয়মের জাঁতাকলে বালুরঘাট শহরের মানুষ সাধারণ পরিবহণ ব্যবস্থায় একটানা রেল স্টেশনে পৌঁছতে পারেন না! মালের লটবহর টানতে টানতে তাঁদের টোটো থেকে নেমে পড়তে হয় থানা মোড়ে। এরপর হেঁটে সরোজ সেতু পেরিয়ে ফের টোটো নিয়ে পৌঁছতে হয় রেল স্টেশনে। এ যেন কোনও লক্ষণ গণ্ডি কেটে দিয়েছেন! কিন্তু কে সেই লক্ষণ? তাঁর খোঁজ করতে নামলে এক নয় একাধিক এমন 'লক্ষণ'-দের খোঁজ মেলে। এরাই নাকি এখন বালুরঘাট শহরের দণ্ড-মুণ্ডের কর্তা! বিধি-বাম শহরবাসীর!
এমন নিয়মের জাঁতাকলেই আরও এক উপরি! পুজোর মধ্যে বারো ঘণ্টার যান নিয়ন্ত্রণ। বিকেল ৪টা থেকে ভোর ৪টা। মোটরবাইক থেকে চার-চাকা সবেতেই নিষেধাজ্ঞ। শুধু চলবে টোটো! কিন্তু, যারা বিকেলে রেল স্টেশন থেকে শহরে আসবেন! টোটোর ভাড়া শুনলে ছ্যাঁকা খাওয়ার জোগাড়। স্টেশন থেকে দু'টো বাস চলে বটে, কিন্তু পুজোর যান নিয়ন্ত্রণের নিষেধাজ্ঞায় তাদের দেখা মেলা ভার। অগতির গতি কাঁধে-মাথায় মালপত্র তুলে কোনওমতে গন্তব্যস্থলে যাত্রা। যাঁরা এমন যান নিয়ন্ত্রণের কথা জানতেন না অথচ ট্রেনে চেপে বিকেলে বালুরঘাট স্টেশনে নেমেছিলেন তাঁদের তো ভিড়মি খাওয়ার অবস্থা। এ যেন আচমকা অঘোষিত পরিবহণ ধর্মঘটের মধ্যে পড়ে হাঁসফাঁস অবস্থা। কারণ স্টেশন থেকে মূল শহরেরই তো দূরত্ব কম করেও দেড় কিলোমিটার।

বালুরঘাট শহরের মেন রোড নামে যা পরিচিত তা বলতে গেলে ঘোড়ার ক্ষুরের নালের মতো আকৃতির অথবা রিং-রোড প্য়াটার্নের। আর শহরের বাড়বাড়ন্ত এই রিং-রোডকে ঘিরেই। সুতরাং এই রিং-রোডের উপর যান নিয়ন্ত্রণের অর্থ শহরের পরিবহণ চালিকা শক্তিকে শ্বাসরোধ করে দেওয়া। যেমন মহারাষ্ট্র সরকার কোনওদিনই হাজারও যান নিয়ন্ত্রণে বারো ঘণ্টার জন্য মুম্বই লাইফ-লাইনকে স্তব্ধ করার হিম্মত দেখাবে না, অনেকটা তেমন। ডানলপ মোড় সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাকে পুজোর সময় যদি বিকেল ৪টার পর রঘুনাথপুর মোড়ে যেতে হয়েছে সেক্ষেত্রে তাঁর পরিবহণ বলতে টোটো। এছাড়া এই তিন কিলোমিটার দূরত্বের রাস্তা তাঁর হাঁটা ছাড়া কোনও গতি ছিল না। কিন্তু, ঝোপ বুঝে কোপ মারা টোটো চালকদের কথায় যে সব সাধারণ মানুষ সায় দেননি, তাঁদের অবস্থা অনুধাবন করাই যায়।
এমন এক পরিস্থিতিতে বালুরঘাট শহরের কিছু প্রতিবাদীর কাছে ভাব প্রকাশের মাধ্যম ছিল সোশ্যাল মিডিয়া। আর প্রতিবাদ জানানো এই মানুষদের ভিড়েই ছিলেন অনুপম তরফদার, দেবজিৎ রায়, কৌশিকরঞ্জন খান-দের মতো কিছু মানুষ। যে স্বাধীন মতাদর্শ, চিন্তা-ভাবনাকে বরাবরই কুর্নিশ জানিয়ে এসেছে বালুরঘাটের মানুষ সেই ইতিহাসের স্থানে মতামতের এমন স্বতস্ফূর্ত বহিঃপ্রকাশ খুব একটা অপরিচিত নয়। বরং এই ধরনের ভাবনা তাঁদের কাছে অপরিচিত হতে বাধ্য যাঁরা বালুরঘাট শহরের ইতিহাস এবং মানবিক চরিত্রটা না বুঝেই সেখানে ডিসিশন মেকার হয়ে কাজ করছেন।

পুলিশি হেফাজত থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ওয়ান ইন্ডিয়া বাংলার সঙ্গে কথা হয়েছিল অনুপম তরফদার এবং দেবজিৎ রায়ের। দু'জনেরই একই কথা, লোক খ্যাপানোর জন্য তাঁরা পুজোর সময়কার যান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ফেসবুকে মুখ খোলেননি। তাঁদের মতামত ছিল প্রতিবাদের স্বতস্ফূর্ত প্রকাশ। সুতরাং, কীভাবে তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক অপরাধের ধারা প্রয়োগ করা শুধু নয়, আইটি অ্যাক্টে মামলা করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দু'জনে। হাইকোর্টে দক্ষিণ দিনাজপুরের পুলিশ সুপার-সহ প্রশাসনের কয়েক জন কর্তা-ব্যক্তির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মামলাও হয়েছে। আপাতত সেই মামলার দিকেই তাকিয়ে অনুপম, দেবজিৎরা। কৌশিক অবশ্য আগাম জামিন নিয়েছেন বুনিয়াদপুর আদালত থেকে। অনুপম, দেবজিৎ-দের দাবি, তাঁদের বিরুদ্ধে পুলিশ যে সব ধারায় মামলা দায়ের করেছে তা যেমন তুলতে হবে, তেমনি পুলিশি রেকর্ডও ডিলিট করতে হবে এবং আপাতত এই দাবিতে তাঁরা আইনি লড়াই লড়বেন।
এদিকে, বালুরঘাটের বিধায়ক বিশ্বনাথ চৌধুরী এই গোটা বিষয়টিকে গণতান্ত্রিক অধিকারের উপর আঘাত বলেই মনে করছেন। তাঁর প্রশ্ন, রাষ্ট্রদ্রোহিতা বা সাম্প্রদায়িক উস্কানি ব্যতিরেকে যদি কেউ তাঁর মত প্রকাশ করে সেক্ষেত্রে কেন তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দায়ের করবে?
অন্যদিকে, তৃণমূল সাংসদ তথা দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের সভাপতি বিপ্লব মিত্র-র অভিযোগ, বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির উস্কানিতে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। যাঁরা প্রতিবাদ করেছে তাঁরা সব মার্কামারা। এঁদের পিঠে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি লেবেল সাঁটা আছে। যদিও, বিপ্লব মিত্রর এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন দুই প্রতিবাদী অনুপম এবং দেবজিৎ। বিষয়টিতে কোনও মন্তব্য করতেই রাজি হননি বিধায়ক বিশ্বনাথ চৌধুরী।
কথা হয়েছিল মানবাধিকার আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত 'আক্রান্ত আমরা'-র সদস্য অম্বিকেশ মহাপাত্রর সঙ্গেও। গোটা ঘটনার জন্য তিনি বালুরঘাটের পুলিশ প্রশাসনকেই দায়ী করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এটা গণতন্ত্রের উপর কুঠারাঘাত। মানুষের স্বাধীন-চিন্তাভাবনা রুদ্ধ করে দেওয়ার প্রয়াস। অনুপমদের মতো প্রতিবাদীদের বিরুদ্ধে বালুরঘাট পুলিশ প্রশাসনের দমন-পীড়ন গণতন্ত্রের পক্ষে বিপজ্জনক বলেও মনে করেন তিনি। ইতিমধ্যেই অনুপম এবং দেবজিৎ-এর গ্রেফতারির প্রতিবাদ জানিয়েছেন অম্বিকেশরা। খুব শিগগিরি এই নিয়ে কলকাতায় তাঁরা মিছিলও করবেন বলে জানিয়েছেন অম্বিকেশ মহাপাত্র।












Click it and Unblock the Notifications