বিজেপির প্রার্থী তালিকায় তৃণমূলীদের ভিড়, দলে উল্টো স্রোত বইয়ে যাঁরা ‘বেসুরো’
বিজেপির প্রার্থী তালিকায় তৃণমূলীদের ভিড়, দলে উল্টো স্রোত বইয়ে যাঁরা ‘বেসুরো’
বিজেপির ঘোষিত ২৮২ জন প্রার্থীর মধ্যে ৪৬ জনই ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর অন্য দল থেকে আসা নেতা। তাঁরা সদ্য বিজেপিতে যোগ দিয়েই প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু এতদিন ধল করেও টিকিট মেলেনি আদি বিজেপি নেতাদের। তার জেরেই বিজেপির বিদ্রোহ দানা বেঁধেছে। উল্টোস্রোত বইতেও শুরু করেছে।

বিজেপির প্রার্থী তালিকায় ঠাঁই পাননি শোভন-বৈশাখী
২০১৯ থেকে ২০২১ সাল- এই দু'বছরের মধ্যে বিজেপিতে যোগের হিড়িকে বিজেপি বেড়েছে বহরে। বহু নেতা-নেত্রী শেষ ছ-মাসে যোগ দিয়েছে। শেষ ছ-মাসে যোগ দেওয়া ৩৪ জনকে প্রার্থী করেছে বিজেপি। কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণভাবে বিজেপির প্রার্থী তালিকায় ঠাঁই পাননি শোভন চট্টোপাধ্যায় ও তাঁর সহযোগী বৈশাখী বন্দ্যোপাধ্যায়।

বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা শোভন-বৈশাখীর
শোভন ও বৈশাখী বিজেপির প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর দিলীপ ঘোষকে চিঠি লিখে বিজেপির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। শোভন চট্টোপাধ্যায়কে তাঁর কেন্দ্র বেহালা পূর্বে প্রার্থী না করায় এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। শুধু শোভন-বৈশাখী নয়, আর অনেকেই বিজেপির এই প্রার্থী তালিকা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

শিব প্রকাশ, মুকুল রায় ও অর্জুন সিং বিক্ষোভের মুখে
বিজেপির প্রার্থীদের নিয়ে অসন্তোষের কারণ হিসেবে যেমন নতুন যোগদানকারীরা, তেমনই আদি নেতাদের বাদ পড়ার জন্য বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা শিব প্রকাশ, মুকুল রায় এবং অর্জুন সিংকে বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়। বেশ কিছু বিধানসভা আসনে দলীয় প্রার্থীদের পরিবর্তনের দাবিতে দলীয়কর্মীদের একাংশ বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলেই ব্যাখ্যা করেন বিজেপি নেতৃত্ব।

বিজেপির প্রার্থী তালিকায় এমন নাম, যাঁরা অন্য দলে
আবার বিজেপির প্রার্থী তালিকায় এমন কিছু নাম ছিল, যাঁরা বিজেপিতে এখনও যোগ দেননি। প্রয়াত প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি সোমেন মিত্রের স্ত্রী শিখা মিত্র ছাড়াও নাম ছিল তৃণমূল বিধায়ক মালা সাহার স্বামী তরুণ সাহার নাম। তাঁরা বিজেপির প্রার্থী তালিকায় নিজের নাম দেখে হয়েছেন। তাঁরা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চান না বলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।

বিজেপির প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর যাঁরা দল ছাড়েন
বিজেপির প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর হুগলিতে চুঁচুড়া, হরিপাল, সিঙ্গুর, উত্তরপাড়া এবং সপ্তগ্রাম বিধানসভা আসনে বিক্ষোভ দেখা দেয়। টিকিট না পেয়ে হুগলি জেলা বিজেপি সভাপতি সুবীর নাগ রাজনীতি ছাড়েন। একইভাবে রাজকমল পাঠক, সৌরভ শিকদার প্রমুখ একাধিক নেতাও প্রতিবাদে দলত্যাগ করেছেন।

দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্দল দাঁড়াবেন বিজেপি নেত্রী
বিজেপি চারবারের টিএমসি বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যকে টিকিট দিয়েছে। তিনি তাঁর বয়সের জন্য শাসক দল তৃণমূলের টিকিট পাননি। তারপরই বিজেপিতে যোগদান করেন। এবং তাঁকেই সিঙ্গুর থেকে টিকিট দেওয়া হয়। উত্তরপাড়া আসনে দলীয় প্রার্থী প্রবীর ঘোষালও কর্মীদের একাংশের ক্ষোভের মুখে পড়েন। তাঁর বিরুদ্ধে বিজেপির কৃষ্ণা ভট্টাচার্য নির্দল প্রার্থী হয়ে দাঁড়ানোর হুমকি দিয়েছেনI

একদিকে বিজেপি ছাড়ার হিড়িক, অন্যদিকে গোঁজ প্রার্থী
বিজেপির প্রার্থী পছন্দ না হওয়ায় নদিয়ার দক্ষিণ সাংগঠনিক জেলার ১৭ জন সদস্য বিজেপি থেকে ইস্তফা দেওয়ার ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন। তাঁরা দলীয় নেতৃত্বকে চিঠি লিখে পদত্যাগ কররার কথা জানান। তাঁর পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, রানাঘাটের উত্তর-পশ্চিম কেন্দ্রের প্রা্র্থী পার্থ চট্টোপাধ্যায়কে না বদল করলে তাঁরা বাধ্য হবেন ইস্তফা দিতে। এছাড়া বর্ধমানের ৯টি কেন্দ্রেই আদি বিজেপি নেতারা নির্দল হয়ে দাঁড়াতে মনস্থ করেছেন।

তৃণমূল ছেড়ে আসারাই নন, বিজেপিতে প্রার্থী বাম-কংগ্রেসেরও
শুধু তৃণমূল ছেড়ে আসা নেতা-নেত্রীরাই নন, বিজেপিতে এসেই প্রার্থী হয়েছেন অন্য দলের নেতা-নেত্রীরাও। এই তালিকায় তৃণমূলের পরেই রয়েছে সিপিএম। সিপিএমের ছ-জন, কংগ্রেসের চার-জন এবং ফরওয়ার্ড ব্লক ও গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা থেকে আসা নেতানেত্রীদের মধ্যে একজন করে প্রার্থী হয়েছেন বিজেপির।

এতদিন দল করে এলেন আদি নেতারা, টিকিট দলত্যাগীদের
এর ফলে বিজেপির প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরই প্রায় প্রতিটি জেলায় ব্যাপক আকারে বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তায় নেমে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গিয়েছে বিজেপির আদি নেতা-কর্মীদের। সম্প্রতি বিজেপি-তে যোগদানকারীদের টিকিট দেওয়ার জন্যই এই বিক্ষোভ। বিজেপির আদিনেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, তাঁরা এতদিন দল করে এলেন, আর প্রার্থী হচ্ছেন যাঁদের বিরুদ্ধে তাঁরা লড়াই করেছেন তাঁরা।

পাঁচ জন আদি নেতা প্রার্থী তালিকা প্রকাশের দল ছেড়েছেন
গত দু-বছরে বিজেপিতে যোগ দেওয়া ৪৬ জন প্রার্থী হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৪ জন গত ছয় মাসে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। এটাই মূল কারণ পুরানো দলীয় কর্মীদের হতাশার। টিকিট বিতরণে অসন্তুষ্ট পাঁচ জন আদি নেতা প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পর বিজেপি ছেড়ে দিয়েছেন। আরও কয়েকজন প্রার্থী পরিবর্তন না করা হলে পদত্যাগের হুমকি দিয়েছেন।

নেতাদের চাপে প্রার্থী পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছে বিজেপি
এখানেই শেষ নয় বিতর্কের। জেলা নেতাদের চাপে একটি আসনে প্রার্থী পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে বিজেপি। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও প্রাক্তন প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অশোক লাহিড়ী উত্তরবঙ্গের আলিপুরদুয়ার আসনে সুমন কাঞ্জিলালের জায়গায় এসেছেন। বিজেপি ২৮২টি আসনে প্রার্থীদের নাম প্রকাশ করেছে। পুরুলিয়া জেলার বাঘমুণ্ডি জোটের শরিক এজেএসইউয়ের জন্য ছেড়ে দিয়েছে।

দ্বিতীয় দফার প্রার্থী তালিকা প্রকাশের পরই বিক্ষোভ শুরু
বিজেপির কথায়, বাংলায় মাত্র ২৯৪টি আসন রয়েছে। আমরা সবাইকে টিকিট দিতে পারি না। কিছু লোক টিকিট পাবে, অন্যরা পাবে না। পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পূর্ব এবং পশ্চিম মেদিনীপুরের মতো জেলাগুলির অন্তর্ভুক্ত প্রথম দুটি পর্যায়ের প্রার্থীর তালিকায় কোনও প্রতিবাদ দেখা যায়নি। পরে ১৪ মার্চ বিজেপি তার দ্বিতীয় তালিকা প্রকাশ করে। তারপরই প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে হুগলি, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা এবং হাওড়া জেলার পার্টির কর্মীরা হেস্টিংয়ে বিজেপির সদর দফতরে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।












Click it and Unblock the Notifications