বিশ্ব বাংলা শারদ সম্মান যেন রাজনৈতিক প্রহসন! মমতার সাধু উদ্যোগ স্বজনপোষণ হয়ে উঠছে পূর্ব বর্ধমানে
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে বাংলা তথা বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো বিশ্ব দরবারে বন্দিত হয়েছে। পেয়েছে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি।
মুখ্যমন্ত্রীই চালু করেছেন বিশ্ব বাংলা শারদ সম্মান। বিভিন্ন পুজো কমিটিকে উৎসাহিত করতে। কিন্তু পূর্ব বর্ধমান জেলায় এটি এখন হাস্যকর জায়গায় পৌঁছে গিয়েছে। আজ তালিকা প্রকাশিত হওয়ার পরই উঠছে স্বজনপোষণের অভিযোগ।

কেউ কেউ মজা করে বলছেন, লিস্ট দেখে তো কপি-পেস্ট মনে হচ্ছে। ফালতু কেন সরকারি গাড়ির তেল পুড়িয়ে বিভিন্ন মণ্ডপে ঘোরেন তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের আধিকারিকরা। এক হেভিওয়েট বিধায়কের অঙ্গুলিহেলনেই পুজো উদ্বোধন থেকে পুরস্কার প্রাপকদের লিস্ট তৈরি হয় বলেও অভিযোগ আসছে। তৃণমূলেরই একাংশের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী যে লক্ষ্যে এই পুরস্কার চালু করেছেন, সেটা দলের কয়েকজনের জন্যেই সঠিক পথে চলছে না। সরকারি মহল থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া মেলেনি।
কয়েকটি ক্লাবকে কোনও না কোনও বিভাগে বিশ্ব বাংলা শারদ সম্মান টানা পাইয়ে দেওয়া হচ্ছে। অবস্থা এমন চলতে থাকলে বিভিন্ন পুজো কমিটি এই পুরস্কার নিতে আগ্রহ হারাবে। স্রেফ স্বজনপোষণের অভিযোগ তুলে। স্বজনপোষণ, যার পিছনে আছে তৃণমূলেরই রাজনৈতিক সমীকরণ।
এবার এই জেলায় সেরা পুজোর সম্মান পেয়েছে বাজেপ্রতাপপুর রেলওয়ে ট্রাফিক কলোনি বারোয়ারি দুর্গাপুজো। কী আশ্চর্য! গতবারের তালিকায় এই ক্লাবের নাম বিশ্ব বাংলা শারদ সম্মানে যে খোপে ছিল, এবারেও সেখানেই। একেবারে প্রথমে, নট নড়নচড়ন! এই পুজোর উদ্যোক্তা বর্ধমানের চার নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নুরুল আলম (সাহেব)। এ ছাড়া এই বিভাগে পুরস্কার জিতেছে কাটোয়ার ননগর সবুজ সংঘ ও বর্ধমানের তেলিপুকুর সুকান্ত স্মৃতি সংঘ। তেলিপুকুরের পুজোর কর্তা আবার তৃণমূলের যুব নেতা রাসবিহারী হালদার।
সেরা প্রতিমার পুরস্কার জিতেছে বর্ধমানের সবুজ সংঘ, কালনার পুরাতন বাসস্ট্যান্ড ব্যবসায়ী সমিতি ও আমরা সবাই দুর্গামাতা পূজা কমিটি। সেরা মণ্ডপের পুরস্কার জিতেছে বর্ধমানের সর্বমিলন সংঘ, মেমারি সারদাপল্লী অরবিন্দপল্লী রিক্রিয়েশন ক্লাব ও বর্ধমানের লাল্টু স্মৃতি সংঘ। সেরা সমাজ সচেতনতা বিভাগে পুরস্কার জিতেছে বর্ধমানের ইছলাবাদ পদ্মশ্রী সংঘ, কাটোয়ার হরগৌরীপাড়া মধ্যপল্লী দুর্গাপূজা কমিটি ও বর্ধমানের খণ্ডঘোষ হংসরাজ দুর্গাপুজো কমিটি।
এবারে যে পুজোগুলিকে শারদ সম্মান দেওয়া হলো তার বেশিরভাগ বর্ধমান উত্তর ও দক্ষিণের। গত কয়েক বছরের মতোই। এবার গত বছরের পুরস্কার প্রাপকদের তালিকা দেখলেই বোঝা যাবে কীভাবে একই ক্লাবের নাম প্রতি বছর কোনও না কোনও বিভাগে থাকে:
২০২৩ সালে বিশ্ব বাংলা শারদ সম্মানে সেরা পুজো হয়েছিল সবুজ সংঘ, মেমারি সোমেশ্বরতলা সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি, বড়শুলের অন্নদাপল্লী সর্বজনীন। সেরা প্রতিমা কালনা পুরাতন বাস স্ট্যান্ড বারোয়ারি ব্যবসায়ী সমিতি, মেমারি সারদা পল্লী অরবিন্দ পল্লী রিক্রিয়েশন ক্লাব, লাল্টু স্মৃতি সংঘ। সেরা মণ্ডপ- বর্ধমানের তেলিপুকুর সুকান্ত স্মৃতি সংঘ, কাটোয়ার নবোদয় সংঘ, বর্ধমানের সর্বমিলন সংঘ। সেরা সমাজ সচেতনতা- বর্ধমানের কেশবগঞ্জ চটি বারোয়ারি দুর্গোৎসব কমিটি, বর্ধমান সদর দক্ষিণের খণ্ডঘোষ তাঁতিপাড়া সর্বজনীন দুর্গোৎসব ও কালনার সেনপাড়া সর্বজনীন দুর্গোৎসব কমিটি।
২০২৪ সালে বিশ্ব বাংলা শারদ সম্মানে সেরা পুজোর স্বীকৃতি পায় বাজেপ্রতাপপুর রেলওয়ে ট্রাফিক কলোনি বারোয়ারি দুর্গাপুজো কমিটি, সবুজ সংঘ ও আলমগঞ্জ বারোয়ারি। সেরা প্রতিমা লাল্টু স্মৃতি সংঘ, ২ নং শাখারীপুকুর সর্বজনীন ও তেলিপুকুর সুকান্ত স্মৃতি সংঘ। সেরা মণ্ডপ সর্বমিলন সংঘ, ধাত্রীগ্রাম সম্প্রীতি ও জাজিগ্রাম নবোদয় সংঘ। সেরা সমাজ সচেতনতা অন্নদাপল্লী সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটি, কাটোয়ার ননাগর সবুজ সংঘ ও মেমারি সারদাপল্লী অরবিন্দপল্লী রিক্রিয়েশন ক্লাব।
ফলে এই প্রতিবেদন পড়ার সময় দেখতেই পাচ্ছেন কয়েকটা ক্লাবের নাম প্রতি বছরেই কমন। একে খান বারো পুরস্কার। তার মধ্যে খোকন দাসের ক্লাবগুলিই প্রতি বছর সিংহভাগ পুরস্কার জিতে নিচ্ছে। এত বড় জেলায় বাকি বিধায়করাও আছেন। ফলে তাঁদের এই সম্মানের তালিকা নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হচ্ছে। নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে সব কিছু হচ্ছে না বলেই অভিযোগ উঠছে।
গতকাল একটি পুজোমণ্ডপে গিয়ে একজন এসডিআইসিও বলেছিলেন, পূর্ব বর্ধমান জেলায় এমন উন্নত ভাবনার থিম দেখিনি। যদিও সেই ক্লাব কোনও বিভাগেই ঠাঁই পায়নি। বড়শুলে অন্নদাপল্লী সর্বজনীন দুর্গাপুজো কমিটি, ইয়ং ম্যান অ্যাসোসিয়েশন ও জাগরণী বড় পুজো করে। জনসমাগমও হয় ব্যাপক। গতবার অন্নদাপল্লীকে একটি পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। বাকিদের বঞ্চনার শিকার হতে হয় প্রতিবার। ফলে বিশ্ব বাংলা শারদ সম্মান এই জেলায় প্রহসন হয়ে দাঁড়িয়েছে। একজন বিধায়কের অঙ্গুলিহেলনে কেন মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত সম্মান হাসির কারণ হয়ে দাঁড়াবে, কেন জেলা তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের আধিকারিকরা মেরুদণ্ড দেখাতে পারছেন না? এই প্রশ্ন উঠছে। এমনকী জেলার বিভিন্ন মহকুমায় ভালো পুজো হলেও খোকনের দাপটে যোগ্যদের বঞ্চিত করার অভিযোগও উঠছে। তথ্য ও সংস্কৃতি দফতরের শীর্ষে খোদ মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দফতরের স্বচ্ছতা এক বিধায়কের জন্য প্রশ্নের মুখে পড়ছে, এটা নিয়ে ক্ষোভ জন্মাচ্ছে তৃণমূলের অন্দরেই।












Click it and Unblock the Notifications