ছ'মাসের নরকবাস শেষে ঘরে ফিরেও রেহাই নেই!

সবাই নদীয় জেলার বাসিন্দা। এখানে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল অবস্থায় ছিলেন না। কারও কুঁড়ে ভেঙে জল পড়ত বর্ষায়, কেউ বা বাচ্চার চিকিৎসা করাতে পারতেন না টাকার অভাবে। একদিন এক শহুরে বাবুর সঙ্গে দেখা। সে বলল, ইরাকে নাকি কাজের অনেক সুযোগ। শুধু গিয়ে পৌঁছলেই হল। সেই বাবুমশাই ভরসা দিলেন, "একবার গিয়ে দ্যাখো, জীবন বদলে যাবে। পাঁচ বছর পর দোতলা বাড়ি হাঁকিয়ে গাড়ি চেপে ঘুরতে পারবে।" গরিব মানুষগুলো সেই সরল কথা বিশ্বাস করে। পাসপোর্ট-ভিসা এবং বিমানভাড়া বাবদ অল্পচেনা লোকটির হাতে তুলে দেয় কয়েক লাখ টাকা। সবটাই ধার করে। কথা দেয়, ইরাকে গিয়ে কাজে যোগ দিলে মাসে মাসে টাকা পাঠাবে বাড়িতে। সেখান থেকে কিস্তিতে প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া হবে পাওনাদারদের।
"একবেলা খেতে পেতাম, টিনের চালা দেওয়া ঘরে ২৭ জন থাকতাম গাদাগাদি করে"
কেমন দিন কাটল ইরাকে? এই প্রশ্ন শুনে সাবিদুল মণ্ডল, জামির মণ্ডল, সমাধি মণ্ডল, রফিক শেখরা হতাশা উগরে দেন। একবাক্যে বলেন, "বিমান থেকে নামার পর আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ইরাকের মোসুল শহরে। আমাদের বলা হল, পাসপোর্ট ওদের জিম্মায় রাখতে। মালিক বলল, এটাই নাকি চাকরির শর্ত। এর পর যা শুরু হল, সেটা নরকবাস! একবেলা খেতে পেতাম। একটা টিনের চালা দেওয়া ঘরে ২৭ জন থাকতাম গাদাগাদি করে। ওই গরমে ঘরে পাখা পর্যন্ত ছিল না। প্রতিবাদ করায় আমাদের কয়েকজনকে কুকুরের মতো পিটিয়েছিল। দু'মাস পরপর মাইনে দিত। তাও যে টাকা দেবে বলেছিল, তার থেকে অনেক কম পেতাম। বাইরে কারও সঙ্গে কথা বলতে দিত না। ছ'মাস এভাবে কাটিয়ে দেওয়ার পর ভেবেছিলাম, হয়তো মরেই যাব। কিন্তু ওপরে আল্লা আছেন। একদিন শুনলাম, জঙ্গিদের ভয়ে সবাই শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। আমরা আর কোথায় যাব? কাউকে চিনি না, হাতে তেমন পয়সাও নেই। তাই আস্তানায় রয়ে গেলাম। জঙ্গিরা আমাদের ধরেছিল। তবে ওদের কাছ থেকে অনেক ভালো ব্যবহার পেয়েছি। দু'বেলা খেতে দিয়েছে। এক দিন সর্দার গোছের একজন এসে বলল, ভারত সরকারের সঙ্গে নাকি কথা হয়েছে। আমাদের ছেড়ে দেওয়া হবে। তার পর সত্যিই ছাড়া পেলাম। তাই দেশে ফিরতে পেরেছি।"
দুঃখের কাহিনীর আর একটু বাকি। ইরাক পাড়ি দেওয়ার আগে যে পাওনাদারদের থেকে ওঁরা টাকা নিয়েছিলেন, তাঁরা দু'বেলা আসছে। টাকা চাইছে। টাকা না পাওয়ায় হেনস্থা করছে। সেই শহুরে বাবুর টিকিও এখন দেখা যায় না। রাজ্য সরকার সাহায্য করুক, এটা চায় ওই ২৭ জন হতভাগ্য। নইলে আত্মহত্যা করা ছাড়া উপায় থাকবে না, বলছেন সবাই।












Click it and Unblock the Notifications