বরাহনগরের স্কুলে কি 'ভুত' পড়ল, ঠিকাদারকে নিয়ে স্কুলেই সালিশি সভা বসালেন মণীশকুমার
গোপন ভিডিও-তে ঠিকাদার কিশোর ভার্মা জানিয়ে দেন কী ভাবে প্রধানশিক্ষক মণীশকুমার নেজ স্কুলের নানা নির্মাণকল্পে বাড়তি বিল বানিয়ে দুর্নীতি করে চলেছেন
ডিআই-এর দাবি এই ব্যক্তির কোনও অস্তিত্ব নেই। তাঁকে নাকি খোদ বরাহনগরের শরৎচন্দ্র ধর বিদ্যামন্দিরের প্রাইমারি বিভাগের শিক্ষক মণীশ নেজ এমনটাই জানিয়েছেন। আসলে ২ অক্টোবর ওয়ানইন্ডিয়া বেঙ্গলির একটি প্রতিবেদনে উঠে আসে এক ঠিকাদারের কথা। গোপন ভিডিও-তে সেই ঠিকাদার কিশোর ভার্মা সরাসরি জানিয়ে দেন কী ভাবে প্রধানশিক্ষক মণীশকুমার নেজ স্কুলের নানা নির্মাণকল্পে বাড়তি বিল বানিয়ে দিনের পর দিন দুর্নীতি করে চলেছেন। এমনকী সেই ভিডিও-তে কিশোর ভার্মা জানান কীভাবে বাড়তি বিলের অর্থ মণীশকুমার নেজকে হস্তান্তর করতে হয়। প্রধানশিক্ষকের ক্ষমতাকে অপব্যবহার করে অনেকসময় স্কুলের নির্মাণকাজের বরাতে নিজের বাড়ির নির্মাণকাজের খরচও নাকি আদায় করে নেন মণীশকুমার নেজ। এমন অভিযোগও করেন কিশোর ভার্মা।

ওয়ানইন্ডিয়া বেঙ্গলি-তে এই গোপন ভিডিও-সহ প্রতিবেদন প্রকাশ পেলেও মণীশকুমার নেজ নিজে ল্যান্ডলাইন নম্বর থেকে সম্পাদককে ফোন করে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি এও দাবি করেন যে তাঁর উপস্থিতিতে কিশোর ভার্মা-র সঙ্গে কথা বলা হোক। কিশোর সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করবেন। ওয়ানইন্ডিয়া বেঙ্গলির সম্পাদকের প্রশ্ন ছিল তাহলে ভিডিও-তে অযথা মিথ্যা কথা কেন বলতে গেলেন কিশোর ভার্মা? তাহলে তো মণীশকুমারের উচিত আগে কিশোরকে চেপে ধরে সেই মিথ্যার জবাবদিহি চাওয়া! মণীশকুমার নেজ বলতে থাকেন সে বিষয়ে পরে কথা হবে, বরং সম্পাদক মহাশয় মণীশের উপস্থিতিতে ঠিকাদার কিশোর ভার্মা-র সঙ্গে কথা বলুন।

মণীশকুমার নেজের এমন চাপ দেওয়ার পিছনে কি অন্য কোনও খেলা ছিল সেদিন? সে প্রশ্ন বারবারই উঠছিল। তাহলে কি তিনি কিশোর ভার্মার উপর পাল্টা চাপ তৈরি করেছিলেন? কারণ কিশোর ভার্মা একজন ঠিকাদার এবং মণীশকুমার নেজের স্কুলেও তাঁকে কাজ করতে হয়। সুতরাং, সত্য ঢাকার জন্য কিশোর ভার্মা-কে চাপটা প্রধানশিক্ষক হিসাবে তিনি সহজেই দিতে পারেন। ফলত, মণীশকুমার নেজের উপস্থিতিতে কিশোর ভার্মার সঙ্গে কথা বলতে স্পষ্টতই অস্বীকার করেছিলেন ওয়ানইন্ডিয়া বেঙ্গলির সম্পাদক। বরং মণীশকুমার নেজের কাছে কিশোরের ফোন-নম্বর চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু মণীশ তা দিতে অস্বীকার করেন।

সবচেয়ে অবাক হতে হয় গোটা ঘটনার প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে ডিআই অফ স্কুল সঞ্জয়কুমার চট্টোপাধ্যায় জানান, ভিডিও-তে দেখতে পাওয়া কিশোর ভার্মার কোনও অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকী, সব্যসাচী এও জানান খোদ শরৎচন্দ্র ধর বিদ্যামন্দির স্কুলের প্রধানশিক্ষক মণীশকুমার নেজ এমন কোনও ব্যক্তির অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন। অথচ, ডিআই-এর এই বক্তব্যের কিছু সময় আগেই মণীশকুমার নেজ ফোন করে তাঁর উপস্থিতিতে কিশোর ভার্মার সঙ্গে কথা বলার জন্য চাপ তৈরি করেছিলেন। ডিআই বলছেন গোপন ভিডিও-তে দেখতে পাওয়া কিশোর ভার্মার কোনও অস্তিত্ব নেই। অথচ, মণীশকুমার নেজের নিজস্ব বয়ান অন্যরকম।
তাহলে কি ঠিকাদার কিশোর ভার্মা কোনও ভুত? না কোনও রহস্যময় এক চরিত্র? হঠাত করে কেন তিনি মণীশকুমার নেজের দুর্নীতিকে এভাবে খুল্লাম-খুল্লা বলে দিলেন? আর সবচেয়ে বড় কথা মণীশকুমার নেজের কাটমানি খাওয়ার পদ্ধতিটাই বা এতটা সুন্দর করে কীভাবে জানলেন কিশোর?

কিশোরের সঙ্গে মণীশ কুমার নেজের সম্পর্ক কতটা ঘণিষ্ট তার প্রমাণ মিলেছে মঙ্গলবার। অভিযোগ, এদিন বরাহনগরের শরৎচন্দ্র ধর বিদ্যামন্দিরে পেরেন্টস মিটিং- বসানোর নামে কার্যত এক সালিশি সভা বসান প্রধানশিক্ষক মণীশকুমার নেজ। সেখানেই ডেকে পাঠানো হয় ঠিকাদার কিশোর ভার্মাকে। অভিযোগ, যে ভাবে থানার ভিতরে কোনও অপরাধীকে চিহ্নিত করার জন্য টিআই প্যারেড বসানো হয় ঠিক তেমনভাবেই স্কুলের দোতালার একটি ঘরে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ডেকে পাঠান প্রধাানশিক্ষক মণীশকুমার নেজ। এরপর ঠিকাদার কিশোর ভার্মাকে সামনে দাঁড় করিয়ে বলা হতে থাকে কে তাঁর গোপন ভিডিও করেছে তাকে চিহ্নিত করতে। এই গোটা ঘটনাই এক অভিভাবিকা মোবাইলে ভিডিও করতে থাকেন বলে অভিযোগ।
এক প্রধানশিক্ষকের বেনিয়ম নিয়ে যখন জেলাশাসক তদন্ত করছেন ঠিক তখন সেই অভিযুক্ত স্কুলে সালিশি সভা বসিয়ে দিচ্ছেন! গোটা বিষয়টি নিয়ে ডিআই-এর প্রতিক্রিয়া চাওয়া হয়েছিল। তিনি স্পষ্টতই জানিয়ে দেন ওই প্রধানশিক্ষক স্কুলের মধ্যে কী করছেন? কী করছেন না ?- তা তিনি জানতে আগ্রহী নন। তাঁর কাছে কিছু নির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে সেটা নিয়েই তিনি তদন্ত জারি রেখেছেন। কিন্তু, তাই বলে পেরেন্টস মিটিং-এ একজন ঠিকাদার কী করছে? এই প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতে চাননি ডিআই।
বুঝতে অসুবিধা নেই যে দিনের পর দিন জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছে নানা অনিয়ম ও বেনিয়ম। দুর্নীতি এবং সরকারিআইনকে বুড়ো আঙুল দেখানোর জন্য জেলাশাসকের তদন্তের নির্দেশের পরও সেই অনিয়ম ও বেনিয়ম থেমে নেই। বরং নানা কৌশলে সেই অনিয়ম ও বেনিয়ম-কে চালিয়ে যাওয়ারই কি লাইসেন্স তাহলে দেওয়া হচ্ছে? এমন প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে।
অভিযোগ, বরাহনগরের শরৎচন্দ্র ধর বিদ্যামন্দিরে মঙ্গলবার প্রধানশিক্ষক যে সালিশি সভা বসিয়েছিলেন তাতে এক জন যারপরনাই অপমানিত বোধ করেন। কেন এমনভাবে ভিডিও তোলা হবে তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। কিন্তু, প্রধানশিক্ষক নিজেই নাকি জানিয়ে দেন তিনি বলেছেন ভিডিও করতে। সালিশি সভায় প্রধানশিক্ষক মিড ডে মিল থেকে শুরু করে নানা তহবিলে আসা অর্থের হিসাব নিয়ে আলোচনা করেন। এমনকী, পেরেন্টস বডির মিটিং-এ এক বহিরাগত ঠিকাদারের সামনেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদেরও তাঁর গলায় গলা মেলাতে বাধ্য করেন বলেও অভিযোগ। পেরেন্টস বডির মিটিং-এ ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা নিয়ে কথা হওয়ার কথা। সেখানে প্রধানশিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি এবং অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা কস্মিনকালেও সরকারি নিয়মের মধ্যে রয়েছে কি না তা কোনও শিক্ষাবিদই বলতে পারছেন না।
এই সালিশি সভা নিয়ে পরিস্থিতি এতটা জটিল হয়েছে যে স্কুলশিক্ষা দফতরে অভিযোগ জমা পড়েছে। কিন্তু, স্কুল শিক্ষা দফতর এই অভিযোগ নিয়েও মুখে কুলুপ এঁটেছে। তাহলে কি 'মণীশ বিসর্জন' নয় 'মণীশ বাঁচানো'-তে-ই বেশি করে চেষ্টা চলছে?












Click it and Unblock the Notifications