কৃষ্ণনবম্যাদি কল্পারম্ভে দেবীর বোধন শেওড়াফুলি রাজবাড়িতে
ঢাকে কাঠি পড়ে গিয়েছে অনেক আগেই। আর মাত্র কয়েকদিনের অপেক্ষা। দুর্গাপুজোর আনন্দে মাতবে আপামর বাঙালি। ষষ্ঠীর দিনই সাধারণত দুর্গাপুজোর বোধন হয়। তবে শেওড়াফুলি রাজবাড়িতে নিয়মটা একটু আলাদা। এখানে ষষ্ঠীর দিন বোধন হয় না। বোধন হয় মহালয়ার আগে। প্রাচীন রীতি মেনে আজও জীতাষ্টমীর পরের দিন থেকে শেওড়াফুলি রাজবাড়িতে দুর্গা পুজো শুরু হয়।

এই রীতিটিকে বলা হয় কৃষ্ণনবম্যাদি কল্পারম্ভ। এদিন থেকে প্রতিদিন সকালে মন্দিরে চণ্ডীপাঠ হয়, সন্ধ্যায় আরতি হয়। এবছর ২৮৯ বর্ষে পদার্পণ করল হুগলি জেলার শেওড়াফুলি রাজবাড়ির পুজো। এবছর ২ আশ্বিন সোমবার সকালে হল শেওড়াফুলি রাজবাড়ির দেবী সর্বমঙ্গলার বোধন। এদিনই ছিল কৃষ্ণনবম্যাদি কল্পারম্ভ। আজ থেকে ২৮৯ বছর আগে বর্ধমান জেলার পাটুলির রাজা মনোহর রায় শেওড়াফুলির কাছারিবাড়িতে সর্বমঙ্গলা দেবীর প্রতিষ্ঠা করেন।
বর্ধমানের রাজবাড়ি গঙ্গাবক্ষে চলে যাওয়ার পর প্রজাদের সুবিধার্থে রাজা তাঁর জমিদারীর অন্তর্ভূক্ত এক পুষ্করিণী খনন করতে গিয়ে এই অষ্টধাতুর দেবী মূর্তি পেয়েছিলেন রাজা মনোহর রায়। তাঁকে স্বপ্নাদেশ দিয়েছিলেন দেবী সর্বমঙ্গলা। আর তারপরই শেওড়াফুলির কাছারি বাড়িতে দেবীকে প্রতিষ্ঠা করেন রাজা মনোহর রায়। শেওড়াফুলি রাজবাড়িতে অষ্টধাতুর দেবী সর্বমঙ্গলার পাশে নেই লক্ষ্মী, গণেশ, কার্তিক, সরস্বতী। তবে নিয়ম মেনে কলাবউ থাকে দেবীর পাশে। জানা যায়, সর্বমঙ্গলা দেবী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে রাজা মনোহর রায়ের পিতা বাসুদেব রায় শেওড়াফুলির এই কাছারি বাড়িতে লক্ষ্মীজনার্দ্দন ঠাকুরের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
রাজবাড়ির বর্তমান সদস্য আশিস কুমার ঘোষ জানান, বর্ধমানের পাটুলির রাজা মনোহর রায় জমিদারীর কাজ পরিচালনা করার জন্য একটি কাছারিবাড়ি প্রতিষ্ঠা করেন শেওড়াফুলিতে। ১৭৩৪ খ্রীষ্টাব্দে মনোহর রায় এই কাছারিবাড়িতে সর্বমঙ্গলা দেবীর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। তারপর থেকে এখানে কৃষ্ণনবম্যাদি কল্পারম্ভে দেবীর বোধন হয়। চণ্ডীপাঠ দিয়ে শুরু হয় দেবীর বোধন। এই চণ্ডীপাঠ চলে দশমী পর্যন্ত।

এছাড়াও, বোধন থেকে দশমী পর্যন্ত নিত্যপুজো ও সন্ধ্যারতি হয় এখানে। শেওড়াফুলি রাজবাড়ির দেবী সর্বমঙ্গলাকে ভোগ নিবেদন করা হয় না। নৈবেদ্য দেওয়া হয়। সন্ধ্যায় দেওয়া হয় লুচি, আলু ভাজা, পটল ভাজা, বেগুন ভাজা এবং দুধ। কথিত আছে, একশ বছর আগে বোধনের দিন ছাগ বলি, মহিষ বলি দেওয়ার প্রচলন ছিল এই রাজবাড়িতে। তবে, পূর্বে রাজবাড়ির এক সদস্য বলি হতে যাওয়া পশুর মধ্যে মায়ের মুখ দেখেছিলেন। সেই থেকেই এখানে পশু বলির পরিবর্তনে ছাঁচি কুমড়ো বলি দেওয়া হয়।
করোনা পরিস্থিতির জেরে গত দু’বছর আড়ম্বর ছাড়াই পূজিত হয়েছিলেন শেওড়াফুলি রাজবাড়ির দেবী সর্বমঙ্গলা। দুর্গাপুজোয় দর্শনার্থীদের রাজবাড়ির ভিতরে প্রবেশে ছিল নিষেধাজ্ঞা। রাজবাড়ির সদস্যরা একপ্রকার নম নম করেই সেরেছিলেন কূলদেবীর পুজো। কিন্তু এবছর করোনা পরিস্থিতি কাটিয়ে স্বাভাবিক হয়েছে সবকিছু। তাই আবার আগের ছন্দে ফিরেছে শেওড়াফুলি রাজবাড়ির পুজো।

মহালয়ার বেশকিছুদিন আগে দেবীর বোধনের দ্বারা শুরু হয়ে গেল এখানকার পুজো। রাজবাড়ির সদস্যদের কথায়, প্রতিবছরের মতো এবছরও দূরদূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা ভিড় জমাবেন এই রাজবাড়িতে। এবার আর অনাড়ম্বর নয় বেশ জাঁকজমকভাবেই হতে চলেছে শেওড়াফুলি রাজবাড়ির পুজো।












Click it and Unblock the Notifications