Tokyo Olympics : ব্রোঞ্জ তো কী! দেশকে পদক দেওয়া নায়ক ছেলের বিরাট কাজে গর্বিত শ্রীজেশের বাবা
Tokyo Olympics : ব্রোঞ্জ তো কী! দেশকে পদক দেওয়া নায়ক ছেলের কাজে গর্বিত শ্রীজেশের বাবা
টোকিও অলিম্পিকের তৃতীয় স্থান নির্ধারক ম্যাচে শেষ মুহুর্তে মরিয়া জার্মানির গোলমুখী পেনাল্টি কর্নার সেভ করা পিআর শ্রীজেশ ভারতের নতুন নায়ক। বৃহস্পতিবারের নায়কোচিত পারফরম্যান্সের পর সবিতা পুনিয়ার পাশাপাশি কেরলের হকি গোলরক্ষককেও 'দ্য ওয়াল' বলে সম্বোধন করতে শুরু করেছে দেশ। শ্রীজেশের বীরত্বে মুগ্ধ হয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে কিংবদন্তি সচিন তেন্ডুলকররা। যে গর্ব বুকে রাখতে না পারা ভারতীয় নায়কের বাবা আবেগে কেঁদে ফেলেছেন। উচ্ছ্বসিত শ্রীজেশের রাজ্য কেরল।

দুর্দান্ত শ্রীজেশ
টোকিও অলিম্পিকে ভারতীয় হকি দলের সাফল্যের অন্যতম কারিগর বলা চলে পিআর শ্রীজেশকে। গোলের নিচে দাঁড়িয়ে একের পর এক ম্যাচে দলকে ভরসা জুগিয়েছেন ৩৩ বছরের খেলোয়াড়। জার্মানির বিরুদ্ধে তৃতীয় স্থান নির্ধারক ম্যাচে শেষ মুহুর্তের শেষ প্রহরী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন কেরলের গোলরক্ষক। জার্মানির পেনাল্টি কর্নার থেকে ভারতের গোলমুখে ছুটে আসা শট দুর্দান্ত দক্ষতায় সেভ করে দেশের নায়ক হয়ে গিয়েছেন শ্রীজেশ। তাঁকেই ভারতের 'দ্য ওয়াল' বা প্রাচীর বলে সম্বোধন করা হচ্ছে।
|
শ্রীজেশের টুইট
বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ৫ গোল হজম করতে হয়েছিল ভারতের পুরুষ হকি দলকে। ওই ঘটনা যে তাঁকে ধাক্কা দিয়েছিল এবং জার্মানির বিরুদ্ধে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে তিনি যে ওই বিপর্যয়ের জ্বালা ঝেরে ফেলতে পারলেন, তা নিজেই জানান দিয়েছেন শ্রীজেশ। টোকিও গেমসে ব্রোঞ্জ জয়ের পর সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ছবি পোস্ট করেছেন ভারতের হকি গোলরক্ষক। লিখেছেন যে এখন তাঁকে হাসতে দেওয়া হোক। শ্রীজেশের এই পোস্ট ঝড়ের গতিতে ভাইরাল হয়েছে। আপ্লুত হয়েছেন নেটিজেনরা।
|
কী বললেন বাবা ও স্ত্রী
৪১ বছর পর দেশকে অলিম্পিকের হকি থেকে পদক এনে দিতে সক্ষম হওয়া দলের গোলরক্ষক পিআর শ্রীজেশের বীরত্বে গর্বিত হয়েছেন তাঁর বাবা পিভি রবিন্দ্রণ। ম্যাচে শেষে ধরা গলা ও চোখ ভর্তি জল নিয়ে তিনি বলেছেন, ব্রোঞ্জ কি সোনা সেটা বড় ব্যাপার নয়। এত বছর পর অলিম্পিক থেকে দেশকে পদক এনে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেওয়া ছেলের কীর্তিই তাঁকে গর্বিত করেছে বলে জানিয়েছেন রবিন্দ্রণ। বৃহস্পতিবার সকালে একসঙ্গে বসে শ্রীজেশের খেলা দেখেন পরিবারের সকলে। ভারতের দুর্দান্ত জয়ের পর উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়েন প্রত্যেকে। সেই ছবি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। ছেলের গর্বে গর্বিত শ্রীজেশের মা আপ্লুত হয়ে কেঁদেই ফেলেছেন। ছেলের বীরত্ব দেশকে সফল করতে পারায় পরম শান্তি অনুভব করছেন তিনি। অন্যদিকে দীর্ঘদিন পরিবারের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকা শ্রীজেশের স্ত্রী অনিশা স্বামীর পথ চেয়ে বসে রয়েছেন। গর্বিত ঘরনি জানিয়েছেন, প্রায় ৬ মাস শ্রীজেশকেতিনি দেখেননি। একই সঙ্গে বিশ্বের আঙিনায় স্বামী যে নজির গড়েছেন, তাতেও আবেগতাড়িত হয়েছেন অনিশা। যিনি নিজেও ছিলেন এক সফল লং জাম্পার।
|
শ্রীজেশের বে়ড়ে ওঠা
দেশের হয়ে ২৩০টিরও বেশি হকি ম্যাচ খেলে ফেলা শ্রীজেশের জন্ম হয়েছিল ১৯৮৮ সালের ৮ মে, কেরলের কোচির থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে কিঝাক্কামবালাম গ্রামে। কৃষক পরিবার থেকে উঠে আসা ভারতীয় তারকার প্রতিভা স্কুলের গণ্ডী পেরোনোর আগেই নজরে পড়েছিল। প্রথমে স্প্রিন্টার হওয়া প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেছিলেন শ্রীজেশ। পরে ভলিবল ও লং জাম্প শেখার দিকেও ঝুঁকেছিলেন টোকিও গেমস থেকে ভারতীয় হকি দলের ব্রোঞ্জ পদক জয়ের অন্যতম নায়ক। ১২ বছর বয়সে থিরুবনন্তপুরমের জিভি রাজা স্পোর্টস স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরই শ্রীজেশের জীবন অন্য খাতে বইতে শুরু করে। সেই স্কুলের কোচই তাঁকে হকি গোলরক্ষক হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করেছিলে়ন। হকি কোচ জয়কুমারের হাত ধরে এই ক্ষেত্রে নিজেকে নিজেকে নিয়োজিত করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন শ্রীজেশ। ২০০৪ সালে তিনি ভারতের জুনিয়র দলে ডাক পেয়েছিলেন। ২০০৮ সালের জুনিয়র এশিয়া কাপ জয়ী ভারতীয় দলের গোলরক্ষক শ্রীজেশ, সেরার পুরস্কার পেয়েছিলেন। ২০০৬ সাল থেকে ভারতীয় দলের সদস্য কেরলীয় তারকা ২০১৪ সালের এশিয়ান গেমস জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছনো ভারতীয় হকি দলকে অধিনায়ক ও গোলরক্ষক হিসেবেও ভরসা জুগিয়েছিলেন শ্রীজেশ।
|
কঠিন পথ
কৃষক পরিবারে বেড়ে ওঠা শ্রীজেশের উত্থান অতি সহজে হয়নি। বেশ কাঠখড় পুড়িয়েই ছেলেকে হকি খেলা শেখাতে সাহায্য করেছিলেন তাঁর বাবা। পরপর অনেক ধাপ পেরিয়ে ভারতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন শ্রীজেশ। দক্ষতা দিয়ে নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছেন কেরলের তারকা। দলকে বহু কঠিন ম্যাচ তিনি উতরে দিয়েছেন অনায়াসে। সেই তাঁকেই মাঝেসাঝে ভারতীয় দলে হারাতে হয়েছিল প্রথম গোলরক্ষকের মর্যাদা। সেসবে হতাশ না হয়ে বরং ফিরে আসার লড়াই আরও তীব্র করেছিলেন শ্রীজেশ। প্রমাণ করার মঞ্চ হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন টোকিও গেমসকে। তৃতীয় স্থান নির্ধারক ম্যাচের শেষ মুহুর্তে জার্মানির ১৩তম পেনাল্টি কর্নার বাঁচিয়ে এখন তিনি শুধু ওই দলের নয় গোটা দেশের প্রাচীর। ২০১৭ সালে শ্রীজেশকে পদ্মশ্রী সম্মানে ভূষিত করেছিল ভারত সরকার। ২০১৫ সালে অর্জুন পুরস্কারও পেয়েছিলেন কেরলের গোলরক্ষক। যাকে নিয়ে দেশের গর্বের শেষ নেই।

২১ বছরের অভিজ্ঞতা
গত ২১ বছর ধরে গর্বের সঙ্গে হকি খেলছেন শ্রীজেশ। এতদিনের অভিজ্ঞতা তিনি বৃহস্পতিবারের ম্যাচে ঢেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে ম্যাচ শেষে জানিয়েছেন ভারতীয় গোলরক্ষক। জানিয়েছেন যে মনে মনে বলে নেমেছিলেন জার্মানির বিরুদ্ধে ৬০ মিনিটে তিনি নিজের সেরাটা উজাড় করে দিতে চান। দলের প্রতিটি সদস্যও একই মানসিকতা নিয়ে মাঠে নেমেছিল বলে জানিয়েছেন শ্রীজেশ। ৪১ বছর পর অলিম্পিক হকি থেকে পদক জেতাটাকে স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে ভারতীয় গোলরক্ষকের। জানিয়েছেন যে বাড়ি ফিরে আপনজনদের মাঝে পৌঁছে তিনি এই মুহুর্তকে বিশ্বাস করতে চান। ১৯৮০ সালের পর তাঁদের গড়া নজির আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা জোগাবে বলেও জানিয়েছেন শ্রীজেশ। সর্বোপরি অলিম্পিকে ১৩০ কোটির ভারতকে গর্বিত করতে পেরে আপ্লুত হয়েছেন কেরলের হকি খেলোয়াড়। যাঁকে ম্যাচ শেষে গোলপোস্টের মাথায় চড়ে বসতে দেখা গিয়েছে। পরে সতীর্থদের সঙ্গে আবেগঘন আলিঙ্গনেও আবদ্ধ হয়েছেন শ্রীজেশ।












Click it and Unblock the Notifications