বিশ্বমঞ্চে বাংলাকে গর্বিত করেছেন এঁরা, তবু ঝুলন-সায়নীর প্রত্যাবর্তনের দিনে নিশ্চুপ সরকার
রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে সেরার সম্মান ছিনিয়ে এনে রাজ্য সরকার কন্যাশ্রীকে প্রচারের মুখ করেছিল। কিন্তু ক্রীড়া-জগতে বিশ্বসভায় বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেও এই বাংলার দুই ‘কন্যাশ্রী’ আঁধারেই রয়ে গেলেন।
কন্যাশ্রীর বিশ্বজয়ে রাজ্যজুড়ে প্রচারের ঝড় উঠেছিল। রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে সেরার সম্মান ছিনিয়ে এনে রাজ্য সরকার কন্যাশ্রীকে প্রচারের মুখ করেছিল। কিন্তু ক্রীড়া-জগতে বিশ্বসভায় বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেও এই বাংলার দুই 'কন্যাশ্রী' আঁধারেই রয়ে গেলেন। রাজ্যে পা দিয়েও সরকারের তরফে মিলল না তাঁদের বীরত্বের পুরস্কার।
বিশ্বসভায় বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেও বাংলায় ব্রাত্যই রয়ে গেলেন ওঁরা। ওঁদের অভ্যর্থনায় খুঁজে পাওয়া গেল না রাজ্য সরকারকে। শুক্রবার মহিলা বিশ্বকাপ ক্রিকেটে রানার্স হয়ে ঝুলন গোস্বামী পা রাখলেন বাংলায়। একই দিনে ইংলিশ চ্যানেলজয়ী সাঁতারু সায়নী দাসও কলকাতায় ফিরলেন। তবু ঝুলন-সায়নীর হাতে একটি ফুলের তোড়া তুলে দিতে দেখা গেল না রাজ্য সরকারের কোনও প্রতিনিধিকে।

আনন্দ ছিল, উচ্ছ্বলতা ছিল, উন্মাদনা ছিল। জমায়েত হয়ছিল ভক্তকুলও। কিন্তু কোথায় যেন সুর কেটে যাচ্ছিল বারবার। রাজ্যে এসে সরকারের তরফ থেকেই প্রথম অভ্যর্থনা থেকে বঞ্চিত ঝুলন-সায়নীরা। রাজ্য সরকার শুধু পুরস্কার ঘোষণা করেই ক্ষান্ত। এর বাইরেও যে কর্তব্য থাকে, তা করতেই এদিন ভুলে গেলেন মমতা সরকারের মন্ত্রীরা।
কিন্তু কেন এই অবহেলা? মহিলা খেলোয়াড় বলেই কি তাঁরা অভিনন্দন পাবেন না? বাংলার নদিয়ার চাকদহের একটা মেয়ে বল হাতে লর্ডস শাসন করে এলেন। একা কাঁধে ঘাম ঝরিয়ে দিলেন ব্রিটিশদের। তবু প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত তিনি। তবে সরকার চুপ করে থাকলেও এদিন উন্মাদনায় কোনও খামতি ছিল না। ঝুলনের ক্ষেত্রে সিএবি সেই অভাব অনেকটাই দূর করে দিয়েছিল।

কোনও মহিলা ক্রিকেটারের কপালে এতদিন যে সম্মান জোটেনি, ঝুলনকে সাম্মানিক সদস্যপদ দিয়ে সেই সম্মান এনে দিল সিএবি। ৮ আগস্ট সিএবি-র বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ঝুলনের হাতে সাম্মানিক সদস্যপদ তুলে দেওয়া হবে বলে ঘোষণা হল ঝুলনের ফেরার দিনই। ওইদিনই তাঁকে সংবর্ধনাও দেওয়া হবে। স্মারক ছাড়াও ১০ লাখ টাকা মূল্যের গাড়ি উপহার দেওয়া হবে ঝুলনকে।
এদিন দমদম বিমানবন্দরে নেমেই অভিনন্দনের বন্যায় ভেসে যান ঝুলন। তিনি জানান, 'এতদিনে মহিলা ক্রিকেট প্রচারের আলোয় এসেছে। এবার বিশ্বকাপ সেরা হয়ে থাকবে। কেননা প্রচুর মানুষ আমাদের খেলা দেখেছেন। আইসিসি এই প্রথম এতবড় ব্র্যান্ডিং করেছে মহিলা ক্রিকেটের জন্য। প্রচুর প্রচার পেয়েছে এবার। সোশ্যাল মিডিয়াতেও প্রচার ঢেউ লেগেছে। তার থেকেও বড় কথা এবারের বিশ্বকাপ অনেক কিছু শিখিয়েছে তাঁদের।'
তিনি আরও বলেন, 'এত কিছু ভালো লাগার মধ্যেও কোথায় যেন একটি বিষাদের ছাপ স্পষ্ট। আমরা জিততে পারিনি বিশ্বকাপ। এত বড় সুযোগ আমরা হাতছাড়া করেছি। তাই দুঃখ থাকবেই। এরই মধ্যে পরবর্তী বিশ্বকাপের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে এখনও চার বছর বাকি। তার মধ্যে অনেক কিছুই বদলে যাবে। সামনেই অবশ্য টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ রয়েছে। সেদিকেই মনোনিবেশ করতে হবে সবার আগে।'
তিনি স্পষ্টতই জানান, ফাইনালে হারার আক্ষেপ শত সংবর্ধনাতেও যাবে না। বিশ্বকাপ বিশ্বকাপই। তা হাতছাড়া করেছি। সেই আক্ষেপ সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে। তবু তারই মধ্যে আশার আলো মহিলা ক্রিকেট এবার তরতর করে এগোবে। সেই আভাস দেখা দিয়েছে। সেই আশা নিয়েই আমরা পরবর্তী বিশ্বকাপকেই নিশানা করব। চেষ্টা করব নিজেকেও পরবর্তী বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করার মতো ফিট রাখার।
এদিনই ঝুলনের মতো বাংলার সম্মান বিশ্বের দরবারে তুলে ধরা আর এক বাঙালি কন্যা সায়নী দাস ইংলিশ চ্যানেল জয় করে ফিরলেন কলকাতায়। দেশের তেরঙাকে তিনি ডোভারের চ্যানেলের পারে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করে এসেছেন। বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। ১৪ ঘণ্টারও বেশি সাঁতারের ধকল সামলে তিনি অমর কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁকে নিয়েও এদিন কম উন্মাদনা হল না। কিন্তু সেখানেও রাজ্য সরকারের তরফে গরহাজিরা চোখ এড়াল না।

এদিন কলকাতায় পা দিয়ে সায়নীও অভিনন্দনের বন্যায় ভাসছিলেন। ইংলিশ চ্যানেল জয়ের পর লন্ডনের প্রবীসা বাঙালিরাও তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। কিন্তু কলকাতায় অভিনন্দনের জোয়ারে ভেসে যাওয়া অন্যরকম। তা জানিয়েই সায়নী বলেন, ভীষণ কষ্টকর ছিল এই জার্নিটা। রাতের অন্ধকারে, প্রতিকূল আবহাওয়ায় মধ্যেও আমি নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে পেরেছি এটাই আমার ভালো লাগছে। সেই মুহূর্তে যে আনন্দ পেয়েছি, তা ব্যাখ্যা করা যাবে না। তারপরই দেশ থেকে অভিনন্দনের পর অভিনন্দন।
এদিনই দমদম বিমানবন্দর থেকে সায়নীকে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হয় পূর্ব সাতগাছিয়ার সংহতি ক্লাবে। রাতেই সেখানে সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। সেই সংবর্ধনা নিয়ে তিনি ঢোকেন বাড়িতে। ইংলিশ চ্যানেলজয়ী মেয়ের জন্য মা পছন্দের পদ রান্না করে অপেক্ষা করছিলেন। মেয়েকে কাছে পেয়ে তাঁর আনন্দের সীমা নেই এদিন।
এরই মধ্যে পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে সায়নী জানিয়েছেন, এখন ক'দিন বিশ্রাম। তারপর ভাববেন পরবর্তী প্রতিযোগিতা নিয়ে। তবে জানিয়েছেন আগস্টেই ইন্টার কলেজ সাঁতার রয়েছে। নিজের কলেজের হয়ে যে তাঁকে নামতেই হবেই। তাই সে জন্য প্রস্তুতি শুরু করবেন শীঘ্রই।












Click it and Unblock the Notifications