সোনার মেয়ে নিখাত জারিন আপ্লুত প্রধানমন্ত্রীর বার্তায়, কোন পরামর্শ উপেক্ষা করে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন?
পঞ্চম ভারতীয় মহিলা বক্সার হিসেবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতেছেন নিখাত জারিন। ২০১৮ সালে মেরি কমের পর ফের ভারত বিশ্ব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপ থেকে সোনা জয় করল। নিখাতকে মেরি কমের উত্তরসূরী ভাবা হচ্ছে। এমনকী ধারাবাহিক সাফল্যে তাঁকে ঘিরে বাড়ছে অলিম্পিক পদকের প্রত্যাশাও। অভিনন্দন বার্তায় ভাসছেন সোনার মেয়ে। তবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় থেকে এই শীর্ষে পৌঁছানোর যাত্রাপথ কিন্তু মোটেই মসৃণ ছিল না।
|
বাধা পেরিয়ে উত্তরণ
নিজামাবাদের প্রাক্তন ক্রিকেটার ও ফুটবলার মহম্মদ জামিল চাইতেন তাঁর চার কন্যার একজন খেলাধুলোয় আসুক। সেজো কন্যা নিখাতকে নিয়ে আসেন অ্যাথলেটিক্সে। স্প্রিন্ট ইভেন্টে রাজ্য চ্যাম্পিয়নও হন। কিন্তু এক কাকার পরামর্শে পরে বেছে নেন বক্সিংকেই। ১৪ বছর বয়সেই বিশ্ব যুব বক্সিংয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে শোরগোল ফেলে দেন। কাঁধের চোটে ২০১৭ সালের পুরোটাই কাটাতে হয় বক্সিং রিংয়ের বাইরে। সেই যন্ত্রণা ভুলে পাঁচ বছরের মধ্যেই ৫২ কেজি বিভাগে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলেন। টানা পাঁচটি বাউটে সর্বসম্মতভাবে জয়ী ঘোষিত হন, এতেই বোঝা যাচ্ছে কতটা দাপট তিনি এই প্রতিযোগিতায় দেখিয়েছেন।
|
মুসলিম কন্যাদের প্রেরণা
নিখাতের গর্বিত পিতা জামিল একটি সর্বভারতীয় দৈনিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে এই সোনা জয় মুসলিম মেয়েদের অনুপ্রাণিত করবে। দেশের প্রত্যেক মেয়ে জীবনে এমন বড় কিছু অর্জন করার লক্ষ্যে এগোতে চাইবেন। নিখাত যেমন তাঁর যাত্রাপথ তৈরি করে এগিয়ে চলেছেন, তেমনই ছেলে হোক বা মেয়ে সকলেই নিজেদের লক্ষ্যে এগোক এটাই চাই। উল্লেখ্য, নিখাতের দুই খুড়তুতো ভাই বক্সার। ফলে বক্সিংয়ে অনুপ্রেরণা পরিবার থেকেই পেয়েছেন নিখাত। ২০০০ সালের পর থেকেও হায়দরাবাদ বা নিজামাবাদে বক্সিংয়ে মেয়েদের বেশি দেখা যেত না। কিন্তু নিখাতকে তাঁর লক্ষ্যের পথে এগোতে কোনও বাধাদান করেনি তাঁর পরিবার। বাবার সঙ্গে মেয়েকে উৎসাহিত করেছেন মা পরভীন সুলতানাও। ২০১১ সালে নিখাত বিশ্ব যুব বক্সিংয়ে চ্যাম্পিয়ন হন। মেয়ের পড়াশোনা ও বক্সিং চালিয়ে যেতে যাতে সুবিধা হয় সেজন্য সৌদি আরবে সেলস অ্যাসিস্ট্যান্টের ১৫ বছরের চাকরি ছেড়ে নিজামাবাদে ফিরে আসেন পিতা জামিল।
|
পাশে থেকেছে পরিবার
নিখাতের দুই দিদি চিকিৎসক। বোন ব্যাডমিন্টন খেলেন। নিখাত যখন বক্সিং বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান পরিবার কোনওরকম সংশয়েই পড়েনি। কিন্তু নিখাতদের কিছু আত্মীয় ও বন্ধুবান্ধবরা পরামর্শ দিতেন মুসলিম ঘরের মেয়েকে এমন কিছু খেলায় যুক্ত হওয়া উচিত নয় যেখানে শর্টস বা হাফ প্যান্ট পরতে হয়। কিন্তু তাতে কর্ণপাত না করে মেয়েকে লক্ষ্যপূরণের দিকে এগিয়ে যেতে সবরকম অনুমতিই দেয় তাঁর পরিবার। স্বাভাবিকভাবেই আজ জামিলদের গর্বের দিন। ফ্লাইওয়েট ক্যাটেগরিতে নিখাতের প্রথম জাতীয় খেতাব জয় ২০১৬ সালে হরিদ্বারে। এই ক্যাটেগরিতেই খেলতেন মেরি কম। ফলে নিখাতের চ্যালেঞ্জ ছিল বেশ কঠিন। চোট সারিয়ে ২০১৮ সালে সিনিয়র ন্য়াশনালসে ব্রোঞ্জ জেতেন, ওই বছরই বেলগ্রেড ইন্টারন্যাশনালে খেতাব জেতেন। ২০১৯ সালে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ ও তাইল্যান্ড ওপেনে জেতা পদক বাড়ায় নিখাতের আত্মবিশ্বাস।
|
হতোদ্যম হননি
২০১৮ সালে কমনওেলথ গেমস ও এশিয়ান গেমসে সুযোগ না পেলেও নিখাতকে মোটিভেটেড রাখার প্রয়াস চালিয়ে যান জামিল। নিজামাবাদের বক্সারদের সাব জুনিয়র ও জুনিয়র খেতাব জয়ের উদাহরণ তুলে ধরে বোঝাতেন সব কিছুর জন্যই সময় প্রয়োজন। নিখাতের পর জাতীয় বক্সিং ক্যাম্পে আরও দুই মুসলিম কন্যা যোগ দেন। নিখাতের বাবা এই ঘটনার কথা তুলে ধরে কন্যাকে বোঝান, কীভাবে তিনি অনুপ্রেরণা হয়ে উঠছেন মুসলিম মেয়েদের কাছেও। নিখাতকে কোচিং করানো সাইয়ের প্রাক্তন কোচ ইমানি চিরঞ্জীবি বলেছেন, কখন পাঞ্চের প্রয়োজন, কখন পাঞ্চ থামাতে হবে, কীভাবে পাঞ্চ এড়াতে হবে এ সবই বাউট চলাকালীন সঠিকভাবে করার দক্ষতা রয়েছে নিখাতের। তাঁর বড় শক্তি হলো ইচ্ছাশক্তি।
|
তারকাদের বিরুদ্ধে জয়
বিগত তিন বছরে নিখাত জারিন লাইট-ফ্লাইওয়েট (৫১ কেজি) বিভাগের প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন রাশিয়ার একাতেরিনা পালসেভাকে হারিয়েছেন। একই বিভাগে দু-বারের প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন কাজাখস্তানের নাজিম কাইজাইবে, টোকিও অলিম্পিকে রুপোজয়ী তুরস্কের বুসানেজ সাকিরগলুকে পরাস্ত করেছেন। কমনওয়েলথ ও এশিয়ান গেমসের পর অলিম্পিকে পদকের লক্ষ্যে জারিন ৫৪ কেজি বিভাগকে বেছে নেবেন। এতে তাঁর পাঞ্চে আরও বেশি শক্তি ও গতির প্রয়োজন হবে। ভারতের মহিলা বক্সিং দলের কোচ ভাস্কর চন্দ্র ভাটের কথায়, নিখাতের স্পিড রয়েছে। নতুন বিভাগের জন্য প্রয়োজনীয় যা কিছু করা হবে। পাওয়া ও স্ট্যামিনার দিকেও জোর দেওয়া হবে।
|
সোনার মেয়ের অপেক্ষায়
নিখাতের পরিবার অপেক্ষায় রয়েছে সোনার মেয়ের প্রত্যাবর্তনের। পছন্দের বিরিয়ানি ও নিহারি ২-৩ বছর ধরে খাননি নিখাত। বাড়ি ফিরলে কন্যার পছন্দের সব কিছু তৈরি রাখা হবে। পরবর্তী লক্ষ্যে নামার আগে দু-একদিনের জন্য বাড়িতে আসতেও পারেন নিখাত। একটা সময় মেরি কম অবজ্ঞার সুরে বলেছিলেন, কে নিখাত? টোকিও অলিম্পিকে টিকিট নিশ্চিতের পথে নিখাতকে ২০১৯ সালে হারিয়েও দেন মেরি কম। তবে তাতে দমে যাননি নিখাত। মেরি কম ২০২২ সালে একের পর এক ইভেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানোর সুযোগ হাতছাড়া করেননি তেলেঙ্গানার এই বক্সার। নিজের নাম টুইটারে ট্রেন্ডিং দেখে নিখাত কিছুটা অবাকও হয়ে যান। বক্সিং ছেলেদের খেলা বলে যাঁরা তাঁকে নিরুৎসাহিত করতেন, তাঁদের ভুল প্রমাণ করে ছেড়েছেন নিখাত। বক্সিংয়ে তাঁকে উৎসাহিত করার জন্য বাবার অবদানের কথা উল্লেখ করে নিখাত বলেন, সব মেয়েদের বাবাই যেন আমার বাবার মতো হন।
|
প্রধানমন্ত্রীর টুইটে গর্বিত
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ-সহ অনেকেই নিখাতকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। চেন্নাই সুপার কিংস-সহ আইপিএলের দলগুলিও নিখাতের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত। অভিনন্দন জানিয়েছেন বিভিন্ন ক্রীড়াক্ষেত্রের তারকারা, বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীরাও। ব্রোঞ্জজয়ী বক্সারদেরও প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী। নরেন্দ্র মোদীর এই টুইট তাঁকে বিশেষভাবে গর্বিত করেছে বলেও জানিয়েছেন সোনার মেয়ে নিখাত।












Click it and Unblock the Notifications