কুস্তিগীরদের সমর্থনে রাজনীতি মমতার! যোগ্য ও বঞ্চিত আন্দোলনরতদের জন্য সহমর্মিতা কোথায়?
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে পদকজয়ী কুস্তিগীরদের পাশে থেকে ন্যায়বিচারের দাবিতে আজ কলকাতার রাজপথে পদযাত্রায় সামিল হলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কাল ময়দানে গোষ্ঠ পালের মূর্তির সামনে মোমবাতি জ্বালিয়ে ধরনা কর্মসূচির আহ্বানও জানালেন।
এখানেই শেষ নয়। প্রয়োজনে কুস্তিগীরদের পাশে থেকে দিল্লিতেও কর্মসূচি নিতে পারে তৃণমূল কংগ্রেস, সে ইঙ্গিত দিয়েছেন দলনেত্রী। তিনি কথাও বলেছেন প্রতিবাদী কুস্তিগীরদের সঙ্গে। যদিও বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছে, এই ইস্যুতে আন্দোলনের নৈতিক অধিকার কি আছে মমতার?

রাজনৈতিক মহলের ধারণা, কুস্তিগীরদের প্রতিবাদ-আন্দোলন যে জায়গায় গিয়েছে তা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী হস্তক্ষেপ করেই সামাল দিতে পারতেন। তাতে লোকসভা ভোটের আগের বছরে অস্বস্তিতে পড়ত না কেন্দ্রের শাসক দল। বিরোধীরা পেত না ইস্যু। কেন্দ্রীয় যুবকল্যাণ ও ক্রীড়ামন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর পারদর্শিতার সঙ্গে অবস্থা সামাল দিতে পারেননি।
পদকজয়ীরা দেশে ফিরলে তাঁদের বাসভবনে ডেকে আপ্যায়িত করেন প্রধানমন্ত্রী। এমনকী বড় ইভেন্টের আগে তিনি ক্রীড়াবিদদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি মিলিত হয়ে উৎসাহিত করেন। পদক জেতার পর ফোন করে কথাও বলেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এইসব কার্যকলাপের মাধ্যমে যে ইমেজ মোদী তৈরি করেছেন, তা ধাক্কা খেল সাক্ষী-ভিনেশ-বজরংদের ধরনা-প্রতিবাদে।
দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরে যেভাবে কুস্তিগীরদের আটক করেছে তা সোশ্যাল মিডিয়ায় বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে যেতে সময় লাগেনি। যা ধাক্কা দিচ্ছে দেশের ভাবমূর্তিকেও। অনুরাগ ঠাকুর আজও বলেছেন, কুস্তিগীররা আস্থা রাখুন সুপ্রিম কোর্ট, ক্রীড়া মন্ত্রক ও দিল্লি পুলিশের তদন্তের উপর। নিরপেক্ষ তদন্তের পর যথাযথ পদক্ষেপ করা হবে।
ইতিমধ্যেই ভারতের কুস্তি ফেডারেশনের সভাপতি ব্রিজ ভূষণ শরণ সিং ঠুঁটো জগন্নাথ। কেন না, ইন্ডিয়ান অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের তৈরি করে দেওয়া প্রশাসকমণ্ডলী ফেডারেশনের দৈনন্দিন কাজকর্ম দেখছে। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশি ধ্বস্তাধ্বস্তিও নতুন কিছু নয়। তবে এখানে তারকা ক্রীড়াবিদরা থাকায় বিষয়টি অন্য মাত্রা পেয়েছে।

কুস্তিগীরদের রাজনীতি-নিরপেক্ষ থাকার অনুরোধ জানিয়েছেন অনুরাগ। এটাও ঠিক, কুস্তিগীররা প্রতিবাদ-কর্মসূচির প্রথমে তাঁদের মঞ্চকে রাজনীতিমুক্ত থাকার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এপ্রিলের চতুর্থ সপ্তাহ থেকে দেখা গিয়েছে ধরনা মঞ্চে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব উপস্থিত থেকেছেন। পুলিশের অতি-সক্রিয়তায় নিগৃহীত হতে হয়েছে কুস্তিগীরদের।

এ রাজ্যের বিরোধী রাজনৈতিক মহলের দাবি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্তত এই ইস্যুতে প্রতিবাদে নামা মানায় না। তিনি কলকাতায় বসে দিল্লিতে আন্দোলনরতদের প্রতি সহমর্মিতার বার্তা দিতেই পারেন। কিন্তু বিষয়টি ছাপিয়ে বেরিয়ে আসছে রাজনীতি! সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরও কেন ব্রিজ ভূষণ গ্রেফতার নন? এই প্রশ্ন রেখে মমতা নিশানা করছেন মোদী সরকারকে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আজ রবীন্দ্র সদনে পদযাত্রা শেষ করেছেন। কাল ইডেনের উল্টোদিকে গোষ্ঠ পালের মূর্তির সামনেও কর্মসূচি। কিন্তু এই দুই জায়গার খুব কাছেই গান্ধীমূর্তির পাদদেশে ৮০০ দিনের বেশি সময় ধরে ধরনা কর্মসূচি পালন করছেন যোগ্য বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা।

শহিদ মিনার থেকে মাতঙ্গিনী হাজরার মূর্তির পাদদেশ। কোথাও ডিএ, কোথাও নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে আন্দোলন চলছে দিনের পর দিন। মমতা বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভার জন্য এই আন্দোলনকারীদেরও মাঝেমধ্যেই উঠে যেতে বলে পুলিশ। ধরনা চালানোর অনুমতি নিতে আন্দোলনকারীদের ছুটতে হয় হাইকোর্টেও।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যামাক স্ট্রিটের অফিসের সামনেই হোক, কিংবা বিকাশ ভবন অভিযানে পুলিশি হেনস্থা, লাঠিচার্জের মুখে পড়া, আটক হওয়ার অভিযোগ জানিয়েছেন যোগ্য, বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা। আন্দোলন করতে গিয়ে মৃত্যুর অভিযোগও উঠেছে। কেলেঙ্কারির জেরে শিক্ষামন্ত্রী বদলেছে। কিন্তু বদলায়নি যোগ্য প্রার্থীদের ভাগ্য।
ডিএ দেওয়া, না দেওয়া নিয়ে রাজ্যের মানুষের করের টাকা রাজ্য সরকার অকাতরে ব্যয় করে চলেছে হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্টে বাঘা-বাঘা আইনজীবী দিয়ে মামলা লড়তে। এ বেঞ্চ, ও বেঞ্চ ঘুরতে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে।

যোগ্য চাকরিপ্রার্থীদের ধাপে ধাপে চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মুখ্যমন্ত্রী দিয়েছেন কয়েক মাস আগে। তারপরও রোদে পুড়ে, জলে ভিজে ধরনা দিচ্ছেন কত মা। ডিএ আন্দোলকারীরা অনশন করে অসুস্থ হয়ে মাটিতেই কাতরাচ্ছেন। কোচবিহার থেকে কাকদ্বীপের এই মানুষজনের কাছে গিয়ে দুটো কথা তো বলতেই পারতেন মমতা। সময় পাননি, নাকি ইগো?
Our wrestlers, our pride!
— All India Trinamool Congress (@AITCofficial) May 31, 2023
Hon’ble Chairperson @MamataOfficial invited all to join us as we light candles tomorrow in a show of solidarity.
The guilty won’t go unpunished!
We won’t rest till JUSTICE is served. pic.twitter.com/bZGfmlancx
কোথায় সেই মমতা? বিরোধী নেত্রী থাকাকালীন যিনি পৌঁছে যেতেন সবার আগে। দাঁড়াতেন বিপন্ন মানুষের পাশে। গাড়ি চড়ে যেতে যেতে ঢুকে পড়তেন গরিব মানুষের বাড়িতে। দাওয়ায় বসে মুড়ি খেতে খেতে শুনতেন দিনগুজরানের কাহিনি। এখন মাঝেমধ্যে যান। সংখ্য়া কমেছে কয়েক গুণ।
এখন অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর জন্য বরাদ্দ থাকে হেলিকপ্টার। প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের টাকা গুনতে হয় পরিবহণ দফতরকেও। গাড়ি ছেড়ে কপ্টারে চড়ার সঙ্গে সঙ্গেই কি বদলে গিয়েছেন মমতা? মানুষের যন্ত্রণা কি তিনি নিজে দেখছেন, নাকি কানে শুনে দেখছেন?
পথে এবার নামো সাথী...প্রতিবাদের হাতিয়ারই তো রাস্তা। কুস্তিগীররা দিল্লির রাজপথে দিনের পর দিন কাটিয়ে শুয়ে-বসে কাটিয়েছেন। মোদী সরকারকে নিশানা করতে মমতাও আজ কুস্তিগীরদের ন্যায়বিচারের দাবিতে নামলেন পথে প্রতিবাদের রাস্তাতেই। তাহলে যোগ্য, বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীদের পথে-প্রতিবাদে দোষ কোথায়?

আজ মমতার পদযাত্রায় দেখা গিয়েছে যে ক্রীড়াবিদদের, তাঁরাই থাকেন ২১ জুলাই-সহ তৃণমূলের নানা রাজনৈতিক কর্মসূচিতে। কেউ পেয়েছেন ক্রীড়া সম্মান, কেউ রয়েছে কমিটিতে। তাঁরা সিরিয়াস মুখ করে উই ওয়ান্ট জাস্টিস বললেন ঠিকই। কিন্তু তাঁরা কতটা সিরিয়াস তা ঘেমে-নেয়ে মিছিল শেষেই ধরা পড়ল ক্রীড়ামন্ত্রীর সঙ্গে আড্ডায়।
Today, Hon'ble CM Smt @MamataOfficial attended a rally along with other sportspersons in protest of the mistreatment meted out to the protesting wrestlers.@BJP4India Govt has brought shame upon our nation by being a SILENT SPECTATOR to their plight.
— All India Trinamool Congress (@AITCofficial) May 31, 2023
We CONDEMN such INJUSTICE! pic.twitter.com/25vZopt3vg
এই ক্রীড়াবিদ, বুদ্ধিজীবীরাও শীতঘুমেই কাটান বেশিরভাগ সময়। ভাবেন শুধু সরকারকে খুশি রাখলেই হলো! এই ক্রীড়াবিদরা কি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছেন কেন বাংলার ছেলে-মেয়েদের অন্য রাজ্যে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়? বাংলার অলিম্পিক স্পোর্টসের হাল-হকিকৎ কেমন?
মোদী কুস্তিগীরদের মন কি বাত শোনেননি। তাতে তিনি সমালোচিত হতেই পারেন।যোগ্য বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থী, ডিএ-র দাবিতে আন্দোলনরত সরকারি কর্মচারী, নিয়োগ দুর্নীর্তির শিকার হওয়া ভাই-বোনেদের জন্য মমতাও কেন সহমর্মী নন? সেই প্রশ্ন থাকছেই। অন্তত আজ কুস্তিগীরদের ন্যায়বিচারের দাবিতে তাঁর পথে নামার পর তো বটেই।
মমতা কুস্তিগীরদের ন্যায়বিচারের দাবি জানাতেই পারেন। কিন্তু এ বাংলার মা-ভাই-বোনেরা কি পাবেন না ন্যায়বিচার? বাধা কোথায়? মানবিক হয়ে দৃষ্টান্ত দেখাতেই পারেন মমতা, ইগোকে সরিয়ে।












Click it and Unblock the Notifications