বহু বাধা পেরিয়ে নৈহাটি থেকে টোকিও অলিম্পিকের আসরে টিটি-র 'জায়ান্ট কিলার' সুতীর্থা

অপেক্ষা আর কয়েক ঘণ্টার। আজ রাতেই অলিম্পিকে অংশ নিতে চলা ক্রীড়াবিদ এবং কোচ ও সাপোর্ট স্টাফদের নিয়ে ভারত থেকে রওনা হচ্ছে প্রথম বিমান। ছোটবেলা থেকে যে স্বপ্ন দেখতেন, সেই স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে এই বিমানে গিয়েই টোকিওতে পা রাখবেন ভারতীয় টেবিল টেনিস খেলোয়াড়়, বাংলা তথা নৈহাটির মেয়ে বছর ২৫-এর সুতীর্থা মুখোপাধ্যায়।

স্বপ্নের দৌড়

স্বপ্নের দৌড়

টেবিল টেনিস শুরু মাত্র চার বছর বয়সে। নৈহাটি ইউথ অ্যাসোসিয়েশনে গিয়েছিলেন বাবা অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় ও মা নীতা মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে। কোচ মিহির ঘোষ স্থূলকায় সুতীর্থাকে দেখে বলেছিলেন, আদরের মেয়েকে টিটি শেখাতে গেলে অনেক প্রিয় কিছু ছাড়তে হবে। বাবা-মা রাজি হয়ে যান। এরপর মিহির ঘোষের প্রশিক্ষণেই এগোতে থাকে সুতীর্থার কেরিয়ার। ছোট থেকেই বিভিন্ন টুর্নামেন্টের সাফল্য তাঁর যাত্রাপথকে ত্বরান্বিত করে। কয়েক বছর পর মিহির ঘোষ সুতীর্থার বাবা-মাকে বলেছিলেন, এখানে ওর শেখা আপাতত শেষ। এবার অন্য কোথাও প্রশিক্ষণের জন্য নিয়ে যান। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের কাছে অন্য কোথাও বলতে তো শুধুই কলকাতা। মায়ের সঙ্গে সকালের ফার্স্ট বা সেকেন্ড ট্রেনে কলকাতায় এসে ট্রেনিং নিয়ে রাতের ট্রেনে বাড়ি ফেরা। ধকলে ক্লান্ত সুতীর্থা ট্রেনেই আসা-যাওয়ার সময় ঘুমিয়ে পড়তেন। তারপর কলকাতায় বাড়ি ভাড়া করে থাকার সিদ্ধান্ত। মেয়ের সঙ্গে ভাড়াবাড়িতে থাকতেন মা। সুতীর্থার উত্থান সৌম্যদীপ রায় ও পৌলমী ঘটকের আকাদেমিতে।

মিশন অলিম্পিক

মিশন অলিম্পিক

সুতীর্থার কথায়, ছোটবেলা থেকে সৌম্যদীপদা বা পৌলমীদির মতো হতে চাইতাম। স্বপ্ন দেখতাম ওঁদের মতোই অলিম্পিকে নামার। আমি যে আজ টোকিওতে যেতে পারছি তাতে বাবা-মায়ের আত্মত্যাগ তো রয়েছেই, সৌম্যদীপদা না থাকলে এটা সম্ভবই হতো না। আমার কেরিয়ারে সৌম্যদীপদাই সব কিছু। কোচের ভুলে বয়স সংক্রান্ত বিতর্কে এক বছর সাসপেন্ড হতে হয়েছিল সুতীর্থাকে। ফলে তখন ভারতের এক নম্বর হয়েও রিও অলিম্পিকে যোগ্যতা অর্জনে নামতে পারেননি। খেলার প্রতি বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছিল, খেলা দেখতেও ভালো লাগত না। কেরিয়ারে নির্বাসনের মতো কঠিন সময়ে বাবা-মা এবং কোচেরা সুতীর্থার মনোবল বাড়িয়ে বলেছিলেন, অপেক্ষা করো, তোমার সময় আসবে। সে কথাই আজ সত্যি হয়েছে। টোকিওতে চলেছেন সুতীর্থা। নিজের ছোটবেলার স্বপ্নপূরণের লক্ষ্য।

সাফল্যের সরণি

সাফল্যের সরণি

জাতীয় জুনিয়র, সাব জুনিয়র এবং দুবার জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়া, কনওয়েলথ গেমস থেকে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ, আল্টিমেট টেবিল টেনিস সুতীর্থার কেরিয়ারে সব কিছুর অভিজ্ঞতাই রয়েছে। বাকি ছিল শুধু অলিম্পিক। কাতারের দোহাতে অলিম্পিকের যোগ্যতা অর্জনে দেশের এক নম্বর মণিকা বাত্রাকে হারিয়ে সুতীর্থা আদায় করে নিয়েছেন টোকিওর টিকিট। ২০১৯ সালে ইউটিটি-তে ইউ-মুম্বার হয়ে খেলার সময় তিনি হারিয়েছেন জার্মানির পাত্রিসিয়া সোলজা কিংবা চাইনিজ তাইপে-র চেং আই-চিংকে। গত বছর আইটিটিএফ ওয়ার্ল্ড টিম কোয়ালিফিকেশন টুর্নামেন্টে তৎকালীন বিশ্বের ১৯ নম্বর রোমানিয়ার বার্নাদেত্তে স্জোক্সকে হারিয়ে চমক দিয়েছিলেন। সৌম্যদীপের কথায়, বিশ্ব ক্রমতালিকায় যে দ্রুততায় ৫০০ থেকে প্রথম ১০০-র মধ্যে চলে এসেছেন সুতীর্থা সেই যাত্রাপথে বিশ্বের প্রথম দশ বা প্রথম কুড়ির বিরুদ্ধেও জিতেছেন। কখনও হেরেওছেন। তবে বড় নাম শুনেও ঘাবড়ে না গিয়ে যে লড়াই তিনি টিটি বোর্ডে দেখান তা সত্যিই উল্লেখযোগ্য। শুধু এই অলিম্পিকে সুতীর্থা যাচ্ছেন ভেবে ভালো লাগছে না, ২০২৪-এর অলিম্পিকেও সুতীর্থাকে দেখবেন আরও উন্নত প্যাডলার হিসেবে।

অলিম্পিকের প্রস্তুতি

অলিম্পিকের প্রস্তুতি

২০১৮ সালে কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয় আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। তবে বাংলার সুতীর্থা এরপর আর বাংলার প্রতিনিধিত্ব করতে পারেননি। চলে যান হরিয়ানায়। সুতীর্থা বলেছেন, সবচেয়ে বড় কথা হরিয়ানায় খেলোয়াড়দের সম্মান দেওয়া হয় প্রচুর। আর্থিকভাবেও ক্রীড়াবিদদের অনেক সহযোগিতা করে সরকার। পরিকাঠামো ভালো। পদকজয়ীদের বাংলায় যে পরিমাণ অর্থ পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হয় হরিয়ানায় তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি অর্থ পান ক্রীড়াবিদরা। তবে বাংলা ছাড়া নিয়ে বাংলার প্রতি কোনও ক্ষোভ বা অভিমান নেই। সুতীর্থা বলছিলেন, কমনওয়েলথ গেমসের পর থেকে সৌম্যদীপদা বিভিন্ন টার্গেট স্থির করে দেন। ব্যৃাঙ্কিং বাড়াতে কোন টুর্নামেন্ট খেলব, কী লক্ষ্যে এগোতে হবে, সব কিছু তিনিই ঠিক করে দিয়েছেন। অলিম্পিকেও ভারতীয় দলের কোচ হিসেবে সৌম্যদীপ রায় যাচ্ছেন, এটা আমাকে মানসিকভাবে অনেক শক্তিশালী রাখছে। সৌম্যদীপ রায়ের ব্যবস্থাপনায় দৌড়-সহ নানা ফিটনেস ট্রেনিং করে সাত-আট কিলো ওজন কমিয়েছি। আমার লক্ষ্য ছিল ভালো প্রস্তুতি নিয়ে অলিম্পিকে নিজের সেরাটা দেওয়া। সোনিপথে অনুশীলন যথেষ্ট ভালো হয়েছে। জাতীয় দলের শিবির শেষে কলকাতায় এসে যাদবপুরে প্রান্তিকের মাঠে সৌম্যদীপ রায় ও পৌলমী ঘটকের আকাদেমিতে অনুশীলন করেছি। তবে খুব কঠোর পরিশ্রম করতে গত কয়েকদিন বারণ করেছিলেন সৌম্যদীপদা, রিল্যাক্স থাকতে বলেছিলেন। তাই প্র্যাকটিস করেছি। আর মায়ের সঙ্গে অনেক বেশি সময় কাটিয়ে হাল্কা থাকার চেষ্টা করেছি।

টিটি ঘিরে প্রত্যাশা

টিটি ঘিরে প্রত্যাশা

অলিম্পিকে ভারত কখনও টিটি-তে পদক জেতেনি। অচন্ত শরথ কমল নামবেন চতুর্থ অলিম্পিকে। এখনও ক্রীড়াসূচি তৈরি হয়নি। দিল্লি থেকে আজ ফোনে সুতীর্থা ওয়ানইন্ডিয়া বাংলাকে জানালেন, শরথ কমল, জি সাথিয়ান, মণিকা সকলেই আমাকে দারুণ সহযোগিতা করেন। আমি তাঁদের সঙ্গে আগেও দেশের হয়ে খেলতে গিয়েছি। আমি টোকিওতে সিঙ্গলসেই নামব। আমার মা চাইতেন, মেয়ে যেন অলিম্পিকে খেলতে পারে। মিহির স্যরের সঙ্গেও দেখা করেছি। সকলেই খুব খুশি। আমিও যদি অলিম্পিকে ভালো কিছু করতে পারি, ভালো লাগবে।

অলিম্পিয়ানের আঁতুড়ঘর

অলিম্পিয়ানের আঁতুড়ঘর

সৌম্যদীপ রায় কলকাতায় আকাদেমি শুরু করেছেন পুল্লেলা গোপীচাঁদের আকাদেমি ঘুরে দেখে। তিনি বলছিলেন, আমি, পৌলমী, মৌমা দাস, শুভজিৎ সাহার পর জাতীয় দলে একটা গ্য়াপ হয়েছে বাংলা থেকে। সৌম্যজিৎ ঘোষ ছাড়া আর নাম নেই। আমরা অর্জুন হয়েও অনেক বাধার মধ্যে অনুশীলন করেছি। তাই চেয়েছি অনুশীলনের জন্য যে পরিকাঠামো দরকার তা তৈরি করার। যাতে কেউ বলতে না পারেন আমরা এটা পাইনি, ওটা পাইনি। কলকাতা কর্পোরেশনের কাউন্সিলর সুশান্ত ঘোষও কসবায় একটি দারুণ পরিকাঠামো তৈরি করেছেন। করোনা পরিস্থিতিতে সেখানে প্রস্তুতি ব্যাহত হলেও ওখান থেকে আমরা অনূর্ধ্ব ১০ বাংলার চ্যাম্পিয়ন তৈরি করতে পেরেছি। সল্টলেক স্টেডিয়ামেও রাজ্য সরকার আকাদেমি গড়েছে। সবমিলিয়ে ভারতীয় দলে বাংলার সাপ্লাই লাইন মজবুত করাই লক্ষ্য। যাতে উঠে আসতে পারেন ভবিষ্যতের সুতীর্থারা।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+