টোকিও অলিম্পিকে দেশকে ব্রোঞ্জ জেতানোর নায়ক সুমিতের হাহাকার মায়ের জন্য

৪১ বছরের খরা মিটিয়ে অলিম্পিকে পদক জিতেছে ভারতের পুরুষ হকি দল। মনপ্রীত সিংয়ের দলের এই সাফল্যের কারণ দলগত সংহতি। তবে বেশ কয়েকজন আছেন যাঁরা বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন টোকিও অলিম্পিক অভিযানে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম সুমিত বাল্মিকী। ১৭ নম্বর জার্সিধারী সুমিতের প্রশংসায় মুখর হয়েছেন অলিম্পিক হকিতে ১৯৬৪ সালের টোকিও অলিম্পিকে সোনাজয়ী ভারতীয় দলের সদস্য গুরবক্স সিং-সহ অনেকেই। তবে সুমিতের টোকিওর যাত্রাপথ একেবারেই মসৃণ ছিল না। তাই তো ঐতিহাসিক ব্রোঞ্জ জিতেও সুমিতের হাহাকার তাঁর মায়ের জন্য।

প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে

প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে

সুমিত কুমার, সুমিত বা সুমিত বাল্মীকি। নানাভাবেই পরিচিত বছর ২৪-এর এই হকি খেলোয়াড়। ফরওয়ার্ড পজিশনে খেলেন। সুমিতের জন্ম হরিয়ানার সোনিপত জেলার কুরাড গ্রামে। সুমিত-সহ তিন সন্তানকে অভাবের মধ্যেই অনেক কষ্ট করে দিনগুজরানের মাধ্যমে বড় করেছেন বাবা প্রতাপ সিং ও মা দর্শনা দেবী। অভাবের সংসারে সব সময় দুই বেলা খাবার জুটত তেমনটাও নয়। অমিত ও জয় সিং সুমিতের দুই দাদা। প্রতাপ সিং ও দর্শনাদেবী সংসার চালাতে দিনমজুরের কাজ করতেন। প্রতাপ সিং স্থানীয় মোহন কম্বোজ ধাবায় কাজ করতেন। বাবার কাজের বোঝা কমাতে তাঁকে সাহায্য করতে যেতেন তিন ছেলে। ধাবায় যেমন কাজ হয়, বাসন মাজা থেকে টেবিল পরিষ্কার সে সব কাজ করতেন আজ ভারতীয় হকি দলের তারকা সুমিত।

কঠিন দিনগুলি

কঠিন দিনগুলি

ভারত এবারের অলিম্পিক হকিতে সোনা জয়ের পর তাই সুমিতের দাদা আবেগাপ্লুত অমিতের গলা মাঝেমাঝেই বুজে আসছে। তিনি বললেন, অনেক রাত কাটিয়েছি যখন সুমিতও আমাদের সঙ্গে খালি পেটে শুতে গিয়েছে। কখনও হয়তো জুটেছে একটা রুটি। আমাদের কাছে দুধ এক সময় ছিল বিলাসিতা। স্বাভাবিকভাবেই খেলোয়াড়দের জন্য যে দুগ্ধপান জরুরি ছোটবেলায় সুমিতের সেই ভাগ্য হয়নি। ৪৪ নম্বর জাতীয় সড়কের ধারে ওই ধাবায় ৫ বছর বয়স থেকে কাজ করতেন সুমিত, বাবা ও দাদাদের সঙ্গে। বছর পাঁচেক কাজ করার পর ধাবা মালিক যে খাবার বাঁচত তা বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেন সুমিতকে। গ্রামের স্কুলেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক অবধি পড়াশোনা করেছেন।

বিনামূল্যে হকি স্টিক

বিনামূল্যে হকি স্টিক

এইচকে সিনিয়র সেকন্ডারি স্কুলের হকি আকাদেমিতে আট বছর বয়সে হকি শেখার সুযোগ পান সুমিত। খেলার প্রতি তাঁর আগ্রহ দেখে এবং প্রতিভা আঁচ করে আকাদেমির কোচ সুমিতকে একজোড়া জুতো ও হকি স্টিক উপহার দিয়েছিলেন। ভোরে উঠে বাড়ির ঘর-উঠোন পরিষ্কার করে ঠিক ৫টায় আকাদেমিতে পৌঁছে যেতেন সুমিত। যখনই সময় পেতেন করতেন হকি অনুশীলন। সেই কঠোর পরিশ্রম এবং প্রতিবন্ধকতা সুমিতের প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হয়েছে, করেছে মনের দিক থেকেও ভীষণ শক্তিশালী।

মায়ের জন্য হাহাকার

মায়ের জন্য হাহাকার

সুমিতের মা চাইতেন ছেলে অলিম্পিক খেলুক। করোনার কারণে টোকিও অলিম্পিক পিছিয়ে না গেলে ছেলের এই সাফল্যে স্বপ্নপূরণ হতো দর্শনাদেবীর। কিন্তু মাস ছয়েক আগে মা প্রয়াত হন। এরপরই মায়ের কানের দুল ভেঙে মায়ের ছবি-সহ একটি লকেট গড়েছিলেন সুমিত। কোনও কারণে সেটি বাড়িতেই রেখে গিয়েছিলেন। অস্ট্রেলিয়ার কাছে বড় ব্যবধানে হারের পর বাড়িতে ফোন করেন সুমিত। দাদাকে বলেন, লকেটটা টোকিওতে পাঠাতে। দাদা দেরি করেননি। লকেট পেয়েই তা পরে দেশের হয়ে খেলতে থাকেন সুমিত। ব্রোঞ্জ জয়ের ম্যাচেও দুরন্ত পারফরম্যান্স উপহার দেন সুমিত। মা ছেলেকে টোকিও অলিম্পিকে দেখতে চেয়েছিলেন। সুমিতও এভাবেই লকেট পরে মাকে নিজের কাছেই রাখলেন। মা আশীর্বাদ করেছেন, এই বিশ্বাসেই আনন্দের মধ্যেও সুমিতের মনে মায়ের জন্য হাহাকার। হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী মনোহরলাল খট্টরের ঘোষণামতো ২.৫ কোটি টাকা রাজ্য সরকারের থেকে পাবেন সুমিত। আরও পুরস্কার আছে। এমনকী রাজ্য সরকার সামান্য মূল্যে জমিও দেবে দলিত পরিবারের সুমিতকে। কোটিপতি সুমিতের আজ সবই রয়েছে। কিন্তু সেই পাওনা পূর্ণতা পেত যদি মা বেঁচে থাকতেন! বাবা-মায়ের নিরলস শ্রম ছাড়া তো এমন দিনের সাক্ষী সুমিত নাও হতে পারতেন।

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+