বাবা চাননি মেয়ে বক্সার হোক, সেই পূজা রানিই অলিম্পিক অভিষেকে পৌঁছে গেলেন শেষ আটে
লাভলিনা বরগোঁহাইয়ের পর আরও এক মহিলা ভারতীয় বক্সার পৌঁছে গেলেন টোকিও অলিম্পিকের শেষ আটে। ৭৫ কেজি বিভাগের রাউন্ড অব সিক্সটিনের বাউটে হরিয়ানার পূজা রানি বোরা দাপটের সঙ্গে উড়িয়ে দিলেন আলজেরিয়ার ইচরাক চাইবকে।

শেষ আটে পূজা
পূজা রানি ও আচরিকা চাইব দুজনের কাছেই এটি প্রথম অলিম্পিক। মিডলওয়েট বক্সিংয়ে এদিন তাঁদের ছিল প্রথম বাউট। ৩০ বছরের পূজার চেয়ে চাইব বছর দশেকের ছোট। দু-বারের এশীয় চ্যাম্পিয়ন পূজা এদিন আগাগোড়া আধিপত্য বজায় রেখে লড়ে গেলেন। তিনটি রাউন্ডেই তিনি এগিয়ে রইলেন প্রতিপক্ষের চেয়ে। চাইব জোরালোভাবে পাঞ্চ করতে চাইছিলেন, কিন্তু অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পূজা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখায় চাইব সুবিধা করতে পারেননি। বরং পূজার কাউন্টার অ্যাটাক সামলাতে বারবারই বেগ পেতে হল চাইবকে। শেষে ৫-০ ব্যবধানে জিতে অলিম্পিকের শেষ আটে পৌঁছে গেলেন পূজা। কোয়ার্টার ফাইনালে শনিবার ভারতীয় সময় বিকেল ৩টে ৩৬ মিনিটে তাঁর সামনে চিনের লি কিয়ান।

বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বক্সিংয়ে
হরিয়ানার ভিওয়ানি জেলার নিমড়িওয়ালি গ্রাম থেকে উঠে এসেছেন পূজা রানি। বাবাকে না জানিয়েই ভর্তি হন হাওয়া সিং বক্সিং আকাদেমিতে। কারণ, তিনি জানতেন পুলিশ অফিসার বাবা কখনোই বক্সার হওয়ার অনুমতি দেবেন না। পূজা আগে জানিয়েছেন, তাঁরা বাবা চাননি তিনি বক্সার হোন। বাবা বলতেন, আচ্ছে বাচ্চে বক্সিং নেহি খেলতে। মার লাগ জায়েগি। অর্থাৎ ভালো বাচ্চারা বক্সিংয়ে অংশ নেয় না, এই খেলায় চোট লাগবে! পূজার বাবার ধারণা ছিল, যাঁরা খুব আগ্রাসী মনোভাবসম্পন্ন তাঁদের জন্যই বক্সিং, কিন্তু পূজার মতে মেয়েদের জন্য নয়। কিন্তু পূজা তাঁর বাবা-মাকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন, তিনি বক্সিংয়ে ভালো করবেন এবং দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন। বক্সিং রিংয়ে চোট পেলেও বাবা যাতে বুঝতে না পারেন, সে কারণে চোট না সারা অবধি বন্ধুর বাড়িতেও কাটিয়েছেন। বিশেষ করে বাবাকে রাজি করাতে না পারায় পেশাদার বক্সিংয়ে নামার জন্য প্রস্তুত হয়েও পূজাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে মাস ছয়েক! কিন্তু দেশের প্রতিনিধিত্ব করার স্বপ্ন যে আকাশকুসুম কল্পনা ছিল না সেটা পূজা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।

আস্থা অর্জন করে অগ্রগমন
পরিবারের আস্থা পূজা অর্জন করেছিলেন ২০০৯ সালে ৬০ কেজি বিভাগে জাতীয় যুব বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপে রুপো জয়ের পর। এর দুই মাস পর হরিয়ানার নামি বক্সার প্রীতি বেনিওয়ালকে হারিয়ে দেন পূজা। এই জয়ের পর আর তাঁকে বক্সিং নিয়েই এগিয়ে যেতে পরিবার বাধা দেয়নি। হরিয়ানা সরকারের আয়কর অফিসারের চাকরিও পান পূজা। ২০১২ ও ২০১৫ সালে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে যথাক্রমে রুপো ও ব্রোঞ্জ জেতেন মিডলওয়েটে। ২০১৪ সালের ইনচেয়ন এশিয়ান গেমসে জেতেন ব্রোঞ্জ। ২০১৯ সালে ব্যাঙ্ককে এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে লাইট হেভিওয়েটে সোনা জেতার পর চলতি বছর দুবাইয়ে মিডলওয়েটেই সোনা জেতেন।

অনেক বাধা পেরিয়ে
তবে অলিম্পিকে আসার যাত্রাপথটা একেবারেই মসৃণ ছিল না। ২০১৭ সালে দিওয়ালির সময় হাত পুড়ে যায়, তখনও ছয় মাস বক্সিং অনুশীলন চালাতে পারেননি। এই সময় নষ্টের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ট্রেনিংয়ে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কাঁধে মারাত্মক চোট পান, যা তাঁর কেরিয়ার শেষ করে দিতে পারত। রানির ইচ্ছা ছিল ৮১ কেজি বিভাগে খেলা চালিয়ে যাওয়ার। কিন্তু পরবর্তীতে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেন অলিম্পিকে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার লক্ষ্যে। অলিম্পিকে নেমে পদক জয়ের লক্ষ্যে আপাতত পেরোলেন প্রথম বাধা। অভিজ্ঞতা, অদম্য মানসিকতা আর কৌশলের মেলবন্ধন ঘটিয়ে দেশের হয়ে পদক আনুন পূজা রানি, এটাই এখন সকলের প্রত্যাশা।












Click it and Unblock the Notifications