ঐতিহাসিক পদক জয় থেকে অনন্য রেকর্ড, অলিম্পিক ডে-তে নজরে লিয়েন্ডারের কীর্তি

ভারতীয়দের মধ্যে অলিম্পিকে সবচেয়ে বেশি ৭ বার প্রতিনিধিত্ব করেছেন লিয়েন্ডার পেজ। ১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিকে ব্রোঞ্জ জেতেন। এটিই তাঁর জীবনের সবচেয়ে গৌরবের দিন। বাংলার গর্ব, বাঙালির গর্ব পেজ পরিবারে রয়েছে অলিম্পিকের জোড়া পদক। অলিম্পিক ডে-তে চোখ রাখা যাক লিয়েন্ডার পেজের সোনালি সফরের দিকে।

বাংলার গর্ব

বাংলার গর্ব

লিয়েন্ডার পেজের জন্ম কলকাতায়। ১৯৭৩ সালের ১৭ জুন। ভারতীয় টেনিস জগতের কিংবদন্তি লিয়েন্ডার পেজের পিতা ভেস পেজ, যিনি স্পোর্টস মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও। সবচেয়ে বড় কথা, পেজ পরিবারে রয়েছে অলিম্পিকের দুটি পদক। ১৯৭২ সালে ভারতীয় দল মিউনিখ অলিম্পিকে হকিতে ব্রোঞ্জ জিতেছিল। সেই দলের মিডফিল্ডার ছিলেন ভেস পেজ। তাঁর পুত্র লিয়েন্ডার অলিম্পিকে ব্যক্তিগত বিভাগে ভারতের দীর্ঘ বছরের পদকের খরা মেটান ১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিকে। ১৯৫২ সালে হেলসিঙ্কি অলিম্পিকে কুস্তিতে ব্রোঞ্জ জিতেছিলেন কে ডি যাদব। তাঁর পর লিয়েন্ডারের হাত ধরেই ব্যক্তিগত বিভাগে ভারতের পদক আসে।

লক্ষ্যপূরণে অবিচল

লক্ষ্যপূরণে অবিচল

লিয়েন্ডার পেজ বারবারই বলেন, তাঁর জীবনে সবচেয়ে গর্বের দিন আটলান্টা অলিম্পিকের পদক জয়ই। ১৯৯২ সাল থেকে টানা চার বছর অলিম্পিকের জন্যই নিজেকে প্রস্তুত করেছিলেন লিয়েন্ডার। আটলান্টার উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ট্যুরে না নেমে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচু অনেক জায়গায় হার্ড কোর্ট ইভেন্টে খেলেছেন। অলিম্পিকে পুরুষদের সিঙ্গলসের প্রথম রাউন্ডে তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন পিট সাম্প্রাস। তখন অনেকেই ভেবেছিলেন লিয়েন্ডারের আশা বোধ হয় শেষ। কিন্তু সাম্প্রাস শেষ মুহূর্তে সরে দাঁড়ান। এরপর এক একেকটি ধাপ পেরিয়ে লি পৌঁছে যান সেমিফাইনালে।

সবচেয়ে গর্বের দিন

সবচেয়ে গর্বের দিন

ফাইনালে উঠতে পারেননি আন্দ্রে আগাসির কাছে হেরে। ব্রোঞ্জ জয়ের ম্যাচে ব্রাজিলের ফার্নান্দো মেলিজেনির কাছে প্রথম সেট ৩-৬ ব্যবধানে হেরে গিয়েও দুরন্ত কামব্যাক করেন। পরের দুটি সেট ৬-২, ৬-৪ ব্যবধানে কীভাবে তিনি জিতেছিলেন সেই অনুভূতি এখনও বর্ণনা করে উঠতে পারেন না লিয়েন্ডার। আটলান্টা অলিম্পিকে ভারতের জয়ধ্বজা উড়িয়ে লিয়েন্ডার গর্বিত করেছিলেন বাংলাকে, বাঙালিদেরও।

অলিম্পিকে রেকর্ড

অলিম্পিকে রেকর্ড

১৯৯২ সাল থেকে ২০১৬ সাল অবধি টানা অলিম্পিকে অংশ নিয়ে অনন্য নজির নিজের দখলে রেখেছেন লিয়েন্ডার পেজ। টেনিসে তো নয়ই, ভারতের কোনও ক্রীড়াবিদেরই সাতটি অলিম্পিক খেলার অভিজ্ঞতা নেই। ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিক খেলেই অবসর নিতে চান বলে ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। এবার অলিম্পিক হলেও লিয়েন্ডারের ডাবলস ব্যৃাঙ্কিং অনেক নীচে নেমে গিয়েছে। ফলে এবার টোকিওতে তাঁর নামার সম্ভাবনা কার্যত নেই। সানিয়া মির্জা ও অঙ্কিতা রায়না জুটি বাঁধবেন। রোহন বোপান্না ও দ্বিভিজ শরণ জুটি টোকিওর টিকিট পাবে কিনা তা স্পষ্ট হবে কয়েক দিনেই। ২০০৪ সালের এথেন্স অলিম্পিকে অবশ্য মহেশ ভূপতির সঙ্গে জুটি বেঁধে পদকের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন লিয়েন্ডার। ক্রোয়েশিয়ার প্রতিপক্ষের কাছে প্রথম সেটে হেরে গিয়েও দ্বিতীয় সেট জিতেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। তবে টাইব্রেকারে ১৪-১৬ ব্যবধানে হেরে ব্রোঞ্জ হাতছাড়া হয় লি-হেশের। ২০০৮ সালের বেজিং অলিম্পিকে লি-হেশ জুটি পরাজিত হয় রজার ফেডারার ও স্তান ওয়াওরিঙ্কার কাছে। কোয়ার্টার ফাইনালে। পরে ফেডেরাররা সোনাও জিতেছিলেন। বহু বিতর্ক পেরিয়ে ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে রোহন বোপান্নাকে নিয়ে নামলেও ডাবলসের প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নেন পোল্যান্ডের প্রতিপক্ষের কাছে পরাজিত হয়ে।

গ্র্যান্ড স্ল্যামে

গ্র্যান্ড স্ল্যামে

১৯৯১ থেকে ২০০১ অবধি দশ বছরে সিঙ্গলসে বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি লিয়েন্ডার। ১৯৯৬ সালে ইউএস ওপেনের দ্বিতীয় রাউন্ড অবধি গিয়েছিলেন। ১৯৯৭ সালে পৌঁছান তৃতীয় রাউন্ডে। আর ২০০১ সালে উইম্বলডনের দ্বিতীয় রাউন্ড। ফলে এরপর থেকেই ডাবলসে জোর দেন লিয়েন্ডার। গ্র্যান্ড স্ল্যাম কেরিয়ারে আটটি ডাবলস ও ১০টি মিক্সড ডাবলস খেতাব জিতেছেন। ডাবলস ও মিক্সড ডাবলসে কেরিয়ার গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ের অধিকারীও লিয়েন্ডার। রড লেভার ছাড়া আর কারও লিয়েন্ডারের মতো তিন দশক ধরে উইম্বলডন খেতাব জেতার নজিরও নেই। ১৯৯৯ সালে উইম্বলডনে প্রথম খেতাব জেতেন, লেভারের কীর্তি স্পর্শ করেন মিক্সড ডাবলস খেতাব জিতে। লিয়েন্ডার কেরিয়ারে গ্র্যান্ড স্ল্যাম ফাইনাল খেলেছেন ১৬টি, জিতেছেন ৮টিতে। ২০১২ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতে ডাবলসে কেরিয়ার গ্র্যান্ড স্ল্যাম পূর্ণ করেন। মিক্সড ডাবলসে গ্র্যান্ড স্ল্যামের ফাইনাল খেলেছেন ১৮টি। জিতেছেন ১০টিতে। ২০১৬ সালে মিক্সড ডাবলসে কেরিয়ার গ্র্যান্ড স্ল্যাম সম্পূর্ণ করেন মার্টিনা হিঙ্গিসকে নিয়ে ফরাসি ওপেন জিতে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

বিতর্ক থাকলেও ডাবলসে লিয়েন্ডারের সাফল্য সবচেয়ে বেশি মহেশ ভূপতিকে নিয়েই। বিশ্বের বিভিন্ন সেরা জুটি হার মেনেছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস নামে পরিচিত লি-হেশের কাছে। ৩০৩টি ম্যাচে জিতেছেন, হেরেছেন ১০৩টিতে। ডেভিস কাপে টানা ২৪টি ম্যাচ জেতার রেকর্ডও রয়েছে লি-হেশের। ডেভিস কাপে ৪৩টি খেতাব জিতেছেন লিয়েন্ডার। এটিও রেকর্ড। ১৯৯৮ সালে লি-হেশ জুটি অস্ট্রেলিয়ান ওপেন, ফরাসি ওপেন ও ইউএস এপেনের ফাইনাল খেলেছিল। ১৯৯৯ সালে চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যামেরই ফাইনালে উঠেছিল ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। জেতেন উইম্বলডন ও ফরাসি ওপেন খেতাব।

পার্টনার বদল

পার্টনার বদল

লিয়েন্ডারের মতো আরেকটি নজির খুঁজে পাওয়া কঠিন টেনিস মহলে। ডাবলসে তিনি শতাধিক খেলোয়াড়ের সঙ্গে জুটি বেঁধে খেলেছেন। ১৯৯০ সালে জিশান আলিকে নিয়ে শুরু। ডাবলস কেরিয়ারে ১৩১ জনের সঙ্গে জুটি বাঁধার পাশাপাশি মিক্সড ডাবলস খেলেছেন ২৬ জনের সঙ্গে জুটি বেঁধে। তাতে যেমন রয়েছেন মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা, মার্টিনা হিঙ্গিস, তেমনই রয়েছেন সানিয়া মির্জাও। ২০০৬ সালে দোহা এশিয়ান গেমসে ভূপতি ও সানিয়ার সঙ্গে জুটি বেঁধে ডাবলস ও মিক্সড ডাবলসে দেশকে সোনা এনে দেন লিয়েন্ডার। ২০০৫ থেকে ২০০৭ অবধি বিশ্বে ডাবলস ক্রমতালিকায় প্রথম কুড়িতে নিজেকে রেখেছিলেন লিয়েন্ডার।

সাফল্যের সরণি

সাফল্যের সরণি

ওয়ার্ল্ড টিম টেনিসে লিয়েন্ডার খেলেছেন ওয়াশিংটন ক্যাসেলসের হয়ে। ২০০৯ এবং ২০১১ থেকে ২০১৫ অবধি। ২০০৯ ও ২০১১ সালে মোস্ট ভ্যালুয়েবল পুরুষ টেনিস খেলোয়াড়ের সম্মান পান। এটিপি কেরিয়ার ফাইনালে সিঙ্গলসে একমাত্র খেতাবটি লিয়েন্ডার জেতেন নিউ কোর্টে গ্রাস কোর্ট ইভেন্টে। নেভিল গডউইনকে হারিয়েছিলেন ৬-৩, ৬-২ ব্যবধানে। ডাবলস কেরিয়ারে মোট ৯৮ বার ফাইনাল খেলেছেন। জিতেছেন ৫৫টি খেতাব। এটিপি চ্যালেঞ্জার ও আইটিএফ ফিউচারস ফাইনালসে সিঙ্গলস ফাইনাল খেলেছেন ১৪টি, জিতেছেন ১১টিতে। ডাবলসে ৪৪টি ফাইনালে জিতেছেন ২৬টিতে। নিউ হাভেন এটিপি ইভেন্টে সিঙ্গলসে পিট সাম্প্রাসকে ৬-৩, ৬-৪ ব্যবধানে হারিয়েছিলেন লিয়েন্ডার। তাঁর খেলার স্টাইল আশ্চর্য রকমের বলে মন্তব্য করেন খোদ আন্দ্রে আগাসি।

মুকুটে পালক

মুকুটে পালক

১৯৯৬-৯৭ সালে দেশের সর্বোচ্চ ক্রীড়া সম্মান রাজীব গান্ধী খেলরত্নে ভূষিত হন লিয়েন্ডার পেজ। ১৯৯০ সালে হন অর্জুন। ২০০১ সালে পদ্মশ্রী ও ২০১৪ সালে ভূষিত হন পদ্মবিভূষণে। লিয়েন্ডারকে স্পোর্টস অ্যাম্বাসাডর করেছে হরিয়ানা সরকার।

ছবি- লিয়েন্ডার পেজের সোশ্যাল মিডিয়া

Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+