'শিক্ষারত্ন' দিয়েছিলেন মমতা, অথচ সেই শিক্ষকের দুর্নীতিতে এবার স্কুলবাড়ি ভেঙে পড়ার শঙ্কা
২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঘটা করে 'শিক্ষারত্ন' সম্মান পেয়েছিলেন বরাহনগরের শরৎচন্দ্র ধর বিদ্যামন্দিরের প্রাথমিক বিভাগের প্রধানশিক্ষক মণীশকুমার নেজ।
২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ঘটা করে 'শিক্ষারত্ন' সম্মান পেয়েছিলেন বরাহনগরের শরৎচন্দ্র ধর বিদ্যামন্দিরের প্রাথমিক বিভাগের প্রধানশিক্ষক মণীশকুমার নেজ। শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মণীশকুমার নেজ-এর হাতে সেই বিশিষ্ট সম্মান তুলে দিয়েছিলেন। অথচ, 'শিক্ষারত্ন' পাওয়া সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধে এখন 'কাটমানি' নেওয়ার অভিযোগ। এক স্টিং অপারেশনে এই পর্দাফাঁস করেছেন কিশোর ভার্মা নামে এক ঠিকাদার।

কীভাবে মণীশকুমার নেজের কাছ থেকে স্কুলের কাজের কনট্রাক্ট আসে? কীভাবে আসল খরচের থেকেও বেশি বিল বানানো হয়? এবং কীভাবে সেই বাড়তি অর্থ মণীশকুমার নেজের হাতে চলে আসে? সমস্তকিছুই খোলসা করেছেন কিশোর ভার্মা। বছর খানেক আগে চলা এক স্টিং-অপারেশন-এ এই সমস্তই কেলেঙ্কারি ফাঁস করে দিয়েছেন ঠিকাদার কিশোর ভার্মা।
দীর্ঘদিন ধরেই বরাহনগর শরৎচন্দ্র ধর বিদ্যামন্দিরের প্রাথমিক বিভাগের প্রধানশিক্ষক মণীশকুমার নেজের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। কিন্তু, তারপরও তাঁকে ২০১৭ সালে 'শিক্ষারত্ন' সম্মান দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শুধু দুর্নীতি করেই থামেনি মণীশকুমার নেজ। অভিযোগ, তাঁর এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যখনই কেউ প্রতিবাদে সরব হয়েছেন তখন ক্ষমতাবলে অথবা নানাভাবে ফাঁসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন মণীশকুমার।
একটা সময় বরাহনগর এলাকায় তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাথমিক শিক্ষকদের সংগঠনের প্রেসিডেন্ট পদে ছিলেন মণীশকুমার। অভিযোগ, সেই পদের ক্ষমতায় স্কুলকে ঘিরে এক দুর্নীতির জাল বুনে ফেলেছেন তিনি। আপাতত, তৃণমূলের সেই শিক্ষক সংগঠনের শীর্ষ পদে না থাকলেও প্রভাব-প্রতিপত্তি বজায় রেখেছেন বলেই অভিযোগ।

গোপন ক্যামেরার সামনে ঠিকাদার কিশোর ভার্মা একে একে ব্যক্ত করেছেন কী ভাবে স্কুলের অর্থ নয়ছয় করা হচ্ছে? স্কুলের কোনও নির্মাণকাজে কীভাবে কারচুপি হয় তার খুল্লাম-খুল্লা বলে দিয়েছেন এই ঠিকাদার। বছর কয়েক আগে এই স্কুলে একটি নির্মাণকাজ চলার সময় এক শ্রমিক গুরুতর আহত হন। তারপর সেই ঠিকাদারকে সরিয়ে কিশোর ভার্মার ঠিকাদার সংস্থার প্রবেশ ঘটেছিলে মণীশকুমার নেজের স্কুলে। সেই ঠিকাদারের আমলেও মণীশকুমার কারচুপি করতেন বলে অভিযোগ। শ্রমিক জখম হওয়ার ঘটনার পিছনেও ছিল অসতর্কতা। অভিযোগ, এই ধরনের নির্মাণকাজে যে সতর্কতা নিতে হয় তা ঠিকাদার নেননি। কারণ, ঠিকাদার ও প্রধানশিক্ষক মণীশকুমার নেজ নিজেদের পাওনাগণ্ডাটা বুঝে নিতে চেয়েছিলেন বলে অভিযোগ। ফলে, সতর্কতা অবলম্বনের পিছনে যে অর্থ খরচ করার দরকার ছিল তা হয়নি।
বরাহনগরের শরৎচন্দ্র ধর বিদ্যামন্দির-এর বর্তমান ঠিকাদার কিশোর ভার্মা গোপন ক্যামেরায় চলা স্টিং-অপারেশনে দাবি করেছেন, বিল্ডার্স-এর কাছ থেকেও আলাদা করে অতিরিক্ত বিল বানানো হয়। তাঁকেও আসল খরচকে লুকিয়ে বিলে বাড়তি অঙ্ক লিখতে বলা হয়। কিশোর ভার্মার দাবি, মাস্টাররোলেও কারচুপি করতে হয় এরজন্য। যে ক্য়াশমেমো তিনি দেন তাতেও ওই কারচুপির অর্থ লেখা থাকে। এমনকী, প্রয়োজনে প্রধানশিক্ষক মণীশকুমার নেজ নিজেই কারচুপির বিল বানিয়ে জমা করে দেন।

কিশোর ভার্মার দাবি, ধরা যাক কোনও কাজে খরচ হয়েছে ৫০ হাজার টাকার। বরাহনগর শরৎচন্দ্র ধর বিদ্যামন্দিরের শিক্ষক মণীশকুমার নেজ তাঁকে ৭০ হাজার টাকা বিল বানাতে বলে দিলেন। এই কারচুপিওয়ালা বিল জমা করার পর কিশোরের কাছে ৭০ হাজার টাকা চলে যাবে। কিন্তু, তার আগে বাড়তি ২০ হাজার টাকা মণীশকুমার নেজ-কে দিয়ে দিতে হয়। সাধারণত ১ লক্ষ টাকার কাজে এই ধরনের কারচুপিতে ১০% অর্থ মেরে দেওয়া যায় বলেও দাবি করেছেন কিশোর ভার্মা। তবে, কাজ করার অঙ্ক যত বেশি হবে ততই এই কারচুপির অঙ্ক বৃদ্ধি পাবে বলেও জানিয়েছেন কিশোর। সেই সঙ্গে আরও একটি তথ্য সামনে এসেছে। সেটি হল কিশোর ভার্মা কাজ করলেও অর্থ নেন কিসুন মাহাতো নামে একজনের নামে।
কিশোর ভার্মার মতো ঠিকাদারকে গোপন ক্যামেরার সামনে আনতে দেওয়া হয়েছিল টোপ। তাঁকে বলা হয়েছিল অন্য একটি স্কুলের নির্মাণ কাজের কথা। মণীশকুমার নেজ যে ভাবে বিলে অর্থ কারচুপি করেন ঠিক সেভাবেই সেই স্কুলে কাজ করতে হবে। এমনটাই বলে দেওয়া হয়েছিল কিশোরকে। প্রথমে ইতস্ত করলেও আস্তে আস্তে কথার জালে মণীশকুমার নেজের দুর্নীতির যাবতীয় তথ্য ফাঁস করে দেন কিশোর ভার্মা। স্কুলের উন্নয়নের জন্য আসা অর্থ শুধু নয়ছয় করা নয় মণীশকুমার এই দুর্নীতির বেড়াজালে তাঁকে দিয়ে বাড়ির বিভিন্ন কাজও করিয়ে নিয়েছেন বলে স্টিং-অপারেশনে গোপন ক্যামেরার সামনে জানিয়েছেন কিশোর।
ন
সবকিছুকে অবশ্য ছাপিয়ে গিয়েছে কিশোর ভার্মার একটি মারাত্মক তথ্য। এতে কিশোর ভার্মা জানিয়েছেন, অর্থ কারচুপির অঙ্ক বাড়াতে কাজের মানও খারাপ করে দেওয়া হয়। গাঁথনি পাতলা করে দেওয়া থেকে শুরু করে সিমেন্ট ও বালি-র ভাগ মিশ্রণেও কারচুপি করতে হয়। তবে এর জন্য দেখে মনে হবে না যে নির্মাণে কোনও ফাঁক আছে। এক দুর্নীতিবাজ ঠিকাদারের এই কথা কতটা যে মারাত্মক তা সকলেই বুঝতে পারবেন। কাজের মান খারাপ হলে কী হয় তা গত কয়েক বছর ধরে কলাকাতার মানুষ একাধিকবার দেখেছেন। পোস্তার ব্রিজ ভেঙে পড়া থেকে ফ্ল্যাট-বাড়ি ভেঙে পড়া- একাধিক উদাহরণ রয়েছে। অথচ একটি স্কুলের শিক্ষক দুর্নীতির অর্থ আয়-এর জন্য এমন খেলায় মত্ত হয়েছেন যে তাতে একটা আস্ত স্কুলবাড়ির মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই স্কুলবাড়িতে রোজ অতন্তত কয়েক'শ ছাত্র-ছাত্রী আসে। এরসঙ্গে রয়েছেন স্কুলের কর্মীরা। এদের নিরাপত্তাকে কি তাহলে জলাজ্ঞলি দিয়েই এভাবে দুর্নীতি করে যাচ্ছেন মণীশ কুমার নেজ! সত্যিকারেরই প্রশ্ন জাগে এই সমাজ ব্যবস্থার উপরে। এমন এক দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত শিক্ষের 'শিক্ষারত্ন' পাওয়াটাও আটকে যায় না। মণীশকুমার নেজের মতো লোকেরাই কি তাহলে সমাজের 'রত্ন'? প্রশ্ন এবার কিন্তু ক্রমাগত উঠবে।












Click it and Unblock the Notifications