আরজি কর নিয়ে বড় ধাক্কা সুপ্রিম কোর্টে, যে কয়েকটি ভুল মমতার সরকার ও কলকাতা পুলিশ করেছে
দু'হাজার এগারোয় ক্ষমতায় আসার পর থেকে তেরো বছর অতিক্রান্ত। সম্ভবত এই প্রথমবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মা-মাটি-মানুষের সরকার আরজি করের ঘটনা নিয়ে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। গত তেরো বছরে রাজপথে কিংবা খেলার মাঠে এমন স্বতস্ফূর্ত প্রতিবাদ দেখা যায়নি, এমনটাই বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
নয় অগাস্ট ভোটে আরজি করে মহিলা চিকিৎসককে নৃশংসভাবে হত্যার পর থেকে এগারোদিন পার হয়ে গেলেও শুধু রাজ্যেই নয়, সারা দেশে প্রতিবাদ এখনও চলছে। সব থেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল, সুপ্রিম কোর্ট এদিন নয় অগাস্ট এবং ১৪ অগাস্ট আরজি করের ঘটনা নিয়ে রাজ্য সরকারকে তিরস্কার করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নয় অগাস্টের চিকিৎসককে নির্মম হত্যার পর থেকে রাজ্য সরকার একটা ভুল ঢাকতে গিয়ে পরের ভুল করে বসছে। যে কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে এবং তৃণমূলের অন্দরমহলে সুখেন্দু শেখর রায় কিংবা শান্তনু সেনের মতো নেতারা কার্যত বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। যা নিয়ে বিড়ম্বনা তৈরি হয়েছে সমর্থকদের মধ্যে।
- ধর্ষণ-হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টা
অপরাধ সংগঠিত হওয়ার প্রথমদিন থেকেই সত্যকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। আরজিকর হাসপাতালের তৎকালীন অধ্যক্ষ ধর্ষণ-হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে নির্যাতিতা চিকিৎসকের শরীরে একাধিক আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। সেখান থেকে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই ব্যক্তি কখনও নাক চেপে ধরার সঙ্গে গলা টিপে ধরতে পারে না, কিন্তু এক্ষেত্রে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে তাই রয়েছে।
- এফআইআর দায়েরে বিলম্ব
ঘটনা ঘটেছিল ৯ অগাস্ট ভোরে। বাড়ির লোকের হাতে দেহ তুলে দেওয়ার পরে শেষকৃত্য হয়ে যায় রাত আটটা-সাড়ে আটটার মধ্যে। তারপরে এফআইআর দায়ের করা হয় রাত ১১.৪৫-এ। যে নিয়ে এদিন সুপ্রিম কোর্টও প্রশ্ন তুলেছে।
- তাড়াহুড়ো করে শেষকৃত্য
নির্যাতিতার বাবা-মা অভিযোগ করেছেন, পুলিশ তাড়াহুড়ো করে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেছে। শ্মশানে আগে থেকে মৃতদেহ থাকলেও পুলিশ দেহ নিয়ে গিয়ে আগে দাহ করার বন্দোবস্ত করেছে। কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে তাঁদেরকে দেহ দেখতে তিনঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। নির্যাতিতা চিকিৎসকের পরিবারের তরফে কলকাতার পুলিশ কমিশনার এবং সমগ্র পুলিশ-প্রশাসনের বিরুদ্ধে সহযোগিতা না করার অভিযোগ তুলেছেন। পাশাপাশি তাঁরা চাপ দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন।
- পুলিশের বিরুদ্ধে প্রমাণ নষ্টের অভিযোগ
পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রমাণ নষ্টের অভিযোগ উঠেছে। নির্যাতিতার বাবার অভিযোগ মেয়ের ডায়েরির পাতা ছেঁড়া। এছাড়াও যেখানে নির্যাতিতার দেহ পাওয়া গিয়েছিল, তার পাশেই হঠাৎ করেই সংস্কার কাজ শুরু করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। সেই সময় ও কাজ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
- ক্ষতিপূরণের জন্য ১০ লক্ষ টাকা
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, নির্যাতিতার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ১০ লক্ষ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব করেছিলেন। কিন্তু বাবা-মা সঙ্গে সঙ্গে তা নিতে অস্বীকার করেন এবং বলেন তাঁরা বিচার চাইছেন, ক্ষতিপূরণ নয়।
- মুখ্যমন্ত্রীর দ্বিচারিতা
নির্যাতিতার বাবা-মা বলছেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মেয়ের জন্য ন্যায়বিচারের দাবিতে রাস্তায় হেঁটেছেন। আবার তিনিই তাঁর মেয়ের জন্য বিচার চাইতে যাঁরা রাস্তায় নামছেন, তাঁদেরকে পুলিশ দিয়ে বাধা দিচ্ছেন। কেন এই দ্বিচারিতা তিনি করছেন?
- অধ্যক্ষের পদত্যাগ ও ফের পোস্টিং
যে অধ্যক্ষ ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালাতে চেয়েছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে রাজ্য সরকার কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। উপরন্তু পদত্যাগের কয়েকঘন্টার মধ্যেই তাঁকে ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ করা হয়।
- ১৪ অগাস্ট পুলিশের ব্যর্থতা
১৪ অগাস্ট মহিলারা আগে থেকেই কর্মসূচি নিয়েছিল। পাশাপাশি কর্মসূচি ছিল বিজেপি ও সিপিআইএমের যুব সংগঠনের। সেই রাতেই আরজি কর হাসাপাতালে তাণ্ডব চলে। সেই সময় কলকাতা পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, প্রাণ বাঁচাতে পুলিশকর্মীরা হাসপাতালের ওয়ার্ডে আশ্রয় নেন।
- ডার্বি বাতিল
প্রতিবাদকারীরা আগেই জানিয়েছিল যুবভারতীতে ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগানের ডার্বি চলার সময় প্রতিবাদ জানানো হবে। কিন্তু নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেই ম্যাচ বাতিল করে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে যুবভারতীর আশপাশে প্রতিবাদকারীদের বাধা দিতে প্রচুর পুলিশ নামানো হয়। প্রতিবাদকারীদের মধ্যে ইস্টবেঙ্গল কিংবা মোহনবাগানের সমর্থকরাই নন মহমেডানের সমর্থকরাও ছিলেন। জনগণের ক্ষোভ দমাতে সরকারের চেষ্টার বিরুদ্ধে সবাই সোচ্চার হয়ে ওঠেন।
- যত দোষ মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ার
পুলিশ ঘটনার পরবর্তী উত্তেজনা নিয়ে মিডিয়া ও সোশ্যাল মিডিয়াকে দায়ী করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়ো খবর ও ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগ করা হয় পুলিশের তরফে। যে কারণে বিশিষ্ট চিকিৎসক কুণাল সরকার-সুবর্ণ গোস্বামী, তৃণমূল সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়কে ডেকে পাঠায় লালবাজার। চিকিৎসকদের ডেকে পাঠানোয় তীব্র প্রতিবাদ নেমে আসে রাজপথে।
- মমতার বিরুদ্ধেই মমতার প্রতিবাদ
ক্ষমতায় রয়েছে তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্বরাষ্ট্র ও স্বাস্থ্যদফতরও তাঁর হাতে। সেই পরিস্থিতিতে তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়়িতদের মৃত্যুদণ্ডের দাবি করে পথে নামেন। যা নিয়ে তীব্র কটাক্ষে সামিল হয় সাধারণ মানুষ।












Click it and Unblock the Notifications