কলকাতায় আজও রয়েছে সেই সব 'পাতালঘর', হয়ে উঠেছিল জাপানি বোমা থেকে বাঁচার আশ্রয়স্থল
রাস্তায় যেতে যেতে হঠাৎ চোখে পড়বে কতগুলো ইট দেওয়া অংশ। চমকে যেতে হয়। এগুলো আবার কী? বাড়ির এবং এলাকার মানুষের কাছে জানতে গিয়েই জানা গেল এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। এগুলো নাকি পাতালঘর। ওই ইট দেওয়া অংশগুলি অক্সিজেন যাতায়াতের অংশ, সোজা কথায় ঘুলঘুলি। এই পাতালঘরগুলি হয়ে উঠেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বহু মানুষের বাঁচার আশ্রয়স্থল।

অঞ্চলটি ফার্ন রোড। এখানকার ৮ ও ৯ নং প্লেটে কিছু বাড়ি সম্পর্কে বলতে চাই সেখানে মাটির নীচে ঘর আছে নিশ্চয়ই কিন্তু সে বাড়িগুলো বিশ্বযুদ্ধের সময় তৈরি হয়েছিল। এগুলি তৈরি হয়েছিল জাপানি বোমারু বিমান আক্রমণ থেকে নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য । ওই বাড়িগুলো তৈরির আগে ওই জমি ইম্পিরিয়াল ব্যাংক-এর মালিকানাধীন ছিল। ফার্ন রোড হল বালিগঞ্জ অঞ্চলে। বালিগঞ্জ ফাঁড়ি অঞ্চলটা তখন মূলত ছিল ইউরোপিয়ান কোয়াটার্স। ছবির মতো সুন্দর একটা জায়গা। বড় বড় বাংলো বাড়ি, লালমুখো সাহেবরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের বাগানে তেল চুকচুকে ঘোড়াদের হ্রেষা আর খুরের ধ্বনি। ভেতর থেকে পিয়ানোর টুংটাং আওয়াজ আর বিলিয়ার্ড খেলার খটাস খটাস শব্দ ভেসে আসত। সেসব বাড়ির একটা কি দুটো এখনো রয়ে গেছে। আইটিআই-এর সামনে যে বাড়িটা তাতে জাপানিরা থাকত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে। তখনো কলকাতায় জাপানি বোমার আতঙ্ক শুরু হয়নি। এরা অন্যান্য পেশায় যুক্ত ছিলেন। যুদ্ধ শুরুর আগেই ওখানে বহু বাড়িতে ওই পাতালঘর তৈরি হয়েছিল। যা আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল যুদ্ধ শুরু হতে।
এখানকার ম্যান্ডিভিল গার্ডেনস আগের থেকেই বেশ ডেভলপড ছিল। ওখানে ওয়েল-টু-ডু লোকজনের বাড়ি বা ভিলা ছিল। লোকের মুখে মুখে ওটা ম্যান্ডেভিলা হয়ে যায়। নামটার মধ্যে ওইসব ভিলার পরশ লুকিয়ে থাকতে পারে। এখন যেখানে মুক্তি ওয়ার্ল্ড মাল্টিপ্লেক্স হয়েছে তার পাশের রাস্তাটা রুস্তমজি স্ট্রিট। ওখানে একসময় কিছুদিনের জন্য রাস্কিন বন্ড থাকতেন। অনেক পরে দ্য টেলিগ্রাফে উনি একটা রেগুলার কলাম লিখতেন। তাতে এসব বর্ণনা কিছু কিছু আছে। গড়িয়াহাটের থেকে অনেক প্রাচীন, উন্নত ও সমৃদ্ধ ছিল ঢাকুরিয়া ও কসবা। আজকের অর্থে এই জায়গাগুলো ঠিক নগর বা শহর ছিল না। ছিল বর্ধিষ্ণু লোকালয়। ঢাকুরিয়া স্টেশন রোডে যে পাবলিক লাইব্রেরি আছে সেটার বয়স একশো বছরের বেশি। আপনি বলুন না এত পুরনো লাইব্রেরি এ চত্বরে আর আছে? লাইব্রেরি কোথায় থাকে? যেখানে বসতি থাকে, বই পড়ার মতো এগিয়ে থাকা মানুষ থাকে। এর থেকে বোঝা যায় ঢাকুরিয়ার তৎকালীন চরিত্র। থার্টিজ-এ কলকাতায় সাতাশটা ওয়ার্ড ছিল। বালিগঞ্জ ওয়াজ দ্য টোয়েন্টি সেভেন্থ ওয়ার্ড। ঢাকুরিয়া বা কসবা বর্ধিষ্ণু হলেও ছিল টালিগঞ্জ মিউনিসিপ্যালিটির আন্ডারে।'
বালিগঞ্জ ফাঁড়ি রেভিনিউ ডিসট্রিক্ট হিসেবে এ অঞ্চলের কয়েকটা প্রাচীন নাম মেলে। একটা আমিনাবাদ পরগণা। দুটো ডিহি মেলে ইতিহাস থেকে। একটা ডিহি পঞ্চাননতলা বা ডিহি পঞ্চাননগ্রাম। কারণ ঢাকুরিয়া ব্রিজের গায়ে পঞ্চাননতলা রোড নামে একটা রাস্তা রয়ে গেছে। আর একটা ডিহি শ্রীরামপুর। বালিগঞ্জ প্লেস ইস্টের আগে নাম ছিল ডিহি শ্রীরামপুর লেন। ডিহি শ্রীরামপুর রোডও একটা ছিল যেটার পরে নাম হয় রামেশ্বর শ রোড। এরকম পরিবর্তনের মধ্যে কর্পোরেশনের ইতিহাস চেতনার অভাব প্রকাশ পেয়েছে বলে থাঙ্কাপ্পন নায়ার ওঁর বইতে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। ১৭১৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট ফারুকশায়ারের থেকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আটত্রিশটি অঞ্চলের জমিদারি প্রার্থনা করে। তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ডিহি শ্রীরামপুর। শ্রীরামপুরের মধ্যে যে গ্রামগুলো ছিল তা হল বন্দেল, উলুবেড়িয়া, বেদেডাঙ্গা, পূর্ণনগর এবং ঘুঘুডাঙা। ব্রড স্ট্রিটে ঘুঘু ডাঙ্গা নামে একটা বাজার এখনও আছে। একটা অঞ্চলের নামের মধ্যে অনেক ইতিহাস থাকে। সেটা কর্পোরেশন চিরতরে মুছে দিয়েছে। ফার্ন রোডে বেশির ভাগটা ছিল নাবাল জমি। কোনো কাজে লাগে না বলে ওরা বিক্রি করে দিয়ে চলে যান। অর্থাৎ আজ যা হচ্ছে সেদিনও তাই হয়েছে। প্রান্তিক মানুষ মাইগ্রেট করেছে আর তার উপর গড়ে উঠেছে মধ্যবিত্তের শহর।
আগে বালিগঞ্জ স্টেশনের দিকে খুব কম বাড়ি ছিল। সবই ইউরোপিয়ানদের। আস্তে আস্তে যে কয়েকজন বাঙালি সাহস করে ওদিকে বাড়ি করতে শুরু করলেন তাঁরা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মচারী। তখনকার দিনের বিসিএস মানে আজকের মতো নয়। তাদের প্রতিপত্তি ছিল চমকে দেওয়ার মতো। আজকের আইএএসরাও অত ক্ষমতা ভোগ করেন না।
তথ্যসূত্র - 'সুগত সিংহ ও বালিগঞ্জের স্মৃতিকথা'












Click it and Unblock the Notifications