৪০ বছর ধরে কলকাতার 'আগুন' নিভিয়ে চলেছেন এই মানুষটি!
১২ বছর বয়সে বিপিন গনত্রা তাঁর দাদা নরেন্দ্রকে দীপাবলীর দিন আগুনে পুড়ে মরতে দেখেছিল। কিশোর বিপিনের মনে ঘটনা গভীর ক্ষত তৈরি করে। সেইবয়সেই সে ঠিক করে, আর কাউকে আগুনে পুড়ে মরতে দেবে না। সেই থেকে নিজে প্রাণে ঝুঁকি নিয়ে আগুনে ঝাঁপিয়ে লোকের প্রাণ বাঁচিয়ে চলেছেন বিপিন।
তিল দেখেই বলে দেওয়া যায় কেমন মানুষ আপনি
ছোট্ট বিপিন আজ ৫৯ বছরের প্রৌঢ়। আজ চারদশক হয়ে গেল শুধুমাত্র মানুষকে সাহায্য করার টানে এই কাজ করে চলেছেন তিনি। দাদা যখন মারা যায়, বিপিনবাবু তারপরে স্কুল ছেড়ে দেয়। তারপরে আর বেশি পড়াশোনা হয়নি। এমনটি দমকলের কোনও প্রথাগত প্রশিক্ষণও নেননি বিপিনবাবু। তবুও শুধুমাত্র কলকাতা শহরেই অন্তত শতাধিক ভয়ানক আগুন লাগার ঘটনায় নিজের প্রাণ লড়িয়ে লোককে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে এনেছেন তিনি।

বিপিনবাবু ছোট্ট একটি ফ্ল্যাটে থাকেন। দিনরাত সজাগ দৃষ্টি রাখেন টিভিতে সংবাদ চ্যানেলে অথবা রেডিওতে। শহরের কোথাও কোনও আগুন লাগার খবর পেয়েছেন কি, সঙ্গে সঙ্গে ট্যাক্সি ধরে ছুটে যান সেখানে। মাঝে মাঝে খবর জানতে সটান ফোন করে নেন কলকাতার দমকলের সদর দফতরেও।
উচ্চবর্ণের লোকেরা স্ত্রীকে জল দেয়নি, স্ত্রীর সম্মানে ৪০ দিনে কুয়ো খুড়লেন দলিত ব্যক্তি
কখনও কখনও তিনি নিজে খবর পেয়ে দমকলে খবর দিয়ে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে যান দমকলবাহিনী পৌঁছনোর অনেক আগে। তারপর সকলে এলে ঝাঁপিয়ে পড়েন আগুন লাগানোর কাজে। কখনও এমনও হয়েছে, প্রথাগত জ্ঞান না থাকলেও শুধুমাত্র মনের জোরে আগুন নেভাতে গিয়ে অগ্নিদগ্ধ বাড়ির ভিতরে ঢুকে গিয়েছেন বিপিনবাবু। দমকলের লোকেরাই জোর করে তাঁকে বের করে এনেছে।
৭০ বছরের বৃদ্ধা জন্ম দিলেন প্রথম সন্তানের, স্বামীর বয়স ৭৯
একেবারে ছোটবেলায় দমকলের গাড়ি দেখলেই, তাঁর আওয়াজ শুনলেই পিছনে পিছনে দৌড় লাগাতেন বিপিনবাবু। ঘটনাস্থলে পৌঁছে কিছু করতে পারতেন না ঠিকই তবে কীভাবে দমকল কাজ করে সেই দক্ষতা দেখে দেখে রপ্ত করেন। এরপরে ১৯৭৮ সালে প্রথম এমন কোনও আগুন লাগার ঘটনায় হাত লাগান তিনি। তারপর থেকে প্রায় চারদশক হয়ে গেল, এইকাজই করে চলেছেন বিপিন গনত্রা।
১০১ বছর বয়সে কর্মজীবনে অবসর জাপানি বৃদ্ধের
বউবাজার বিস্ফোরণ , কলকাতার স্ট্র্যান্ড রোডের আগুন লাগার ঘটনা, নন্দরাম মার্কেটে আগুন অথবা আমরি হাসপাতালে আগুন, বিপিন গনত্র সবজায়গাতেই পরিত্রাতা হয়ে পৌঁছে বহু লোকের প্রাণ উদ্ধার করেছেন। আর সবই করেছেন স্বেচ্ছ্বায়, মানবতার খাতিরে।
প্রসঙ্গত, কলকাতার এলাকাগুলি বরবারই অগ্নিকাণ্ডপ্রবণ। ২০১৪ সালে তিলোত্তমায় ২ হাজারটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৩৪৭ জন মারা গিয়েছেন এবং আহত ১৭৪৯ জন। ২০১৫ সালে ১৬০০টি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে, মারা গিয়েছেন ১৪৩ জন এবং আহত হন ৯৭৪ জন। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে বিপিন গনত্রার মতো মানুষের আত্মত্যাগকে কুর্নিশ না জানিয়ে কোনও উপায় নেই।
বিপিনবাবুর খোঁজ নিলে জানা যায়, সামান্য ইলেকট্রিকের কাজ করেন তিনি। মাসে রোজগার মাত্র ১ হাজার টাকা। তবে কিছু স্বহৃদয় বন্ধু রয়েছেন যারা মাসে ২৫০০ টাকা করে সাহায্য করেন। কখনও কখনও বিপিনবাবু জানেনও না এর পরের বেল কি খাবেন! কিন্তু তা সত্ত্বেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বিপিনবাবু। আসলে তাঁর লড়াইটা বেঁচে থাকার নয়, মানবিকতা, মনুষ্যত্বকে বাঁচিয়ে রাখার। তাইতো তিনি এই বয়সেও সুপারফিট।












Click it and Unblock the Notifications