ধর্মের নামে বজ্জাতি-তে কি বদলে গেল কলকাতা! ফিকে হয়ে গেল দুই দশকের নাড়ির টান
পুলওয়ামায় আত্মঘাতী জঙ্গি হামলায় শহিদ ৪০ জওয়ানের জন্য কাঁদছে দেশ। দেশের অন্যস্থানের মতো কলকাতার অলি-গলিতে রোজই প্রতিবাদ জানিয়ে হচ্ছে মিছিল।
পুলওয়ামায় আত্মঘাতী জঙ্গি হামলায় শহিদ ৪০ জওয়ানের জন্য কাঁদছে দেশ। দেশের অন্যস্থানের মতো কলকাতার অলি-গলিতে রোজই প্রতিবাদ জানিয়ে হচ্ছে মিছিল। কে নেই সেই দলে বাচ্চা থেকে শুরু করে তরুণ প্রজন্ম, এমনকী প্রবীণরাও। কিন্তু, এহেন পরিস্থিতি-তে এখন কলকাতা ছাড়ার মুখে এক কাশ্মীরি পরিবার। দু'দশক ধরে যে শহর তাঁদের আপন করে রেখেছিল এখন সেই বাসস্থান ছেড়ে অজানার উদ্দেশে পাড়ি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন এরা।

দুই দশক আগে যে শহরে পেশার তাগিদে আসা, সেটাই এখন ভালোবাসার ঘরের ঠিকানা। কোনও দিনই শহরটা-কে একবারের জন্য পর মনে হয়নি বছর চল্লিশের এই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞর। এই শহরে শিকড়় গড়ার সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে পরিবার। এক মেয়ে ক্লাস সিক্স, অন্যজন নাইন। কিন্তু, সবকিছুই এখন এলোমেলো ঠেকছে এই পরিবারের কাছে। দুষ্কৃতীদের হুমকি, পড়শিদের মুখ ঘুড়িয়ে নেওয়া। এমনকী, স্কুলের পুলকারেও বয়কটের মুখে এই কাশ্মীরি চিকিৎসকের মেয়েরা। এক লহমায় যেন সুখের তালটাই কেটে গিয়েছে।
১৫ ফেব্রুয়ারি ও ১৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় দুষ্কৃতীদের বাড়িতে ঢুকে হুমকি। তারপর থেকেই সব যেন বদলে গিয়েছে এই কাশ্মীরি পরিবারের কাছে। সরকারের নিরাপত্তার আশ্বাস, কলকাতা পুলিশের তৎপরতা- সবই রয়েছে। বন্ধুরা পর্যন্ত আপাতত তাঁদের বাড়িতে এসে থাকার জন্য এই পরিবারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কিন্তু, সুরের তারটা ছিঁড়ে গেলে যেমন তাল কেটে যায়, তেমনই এক অসহনীয় মনকষ্ঠে এই পরিবার।
২২ বছর ধরে চিকিৎসকের পেশায় ধর্মের কোনও ভেদাভেদ মাথায় আনেননি। সেবা-কেই পরধর্ম বলে মেনে নিয়ে কাজ করেছেন। কিন্তু, একটা জঙ্গি হামলার ঘটনা যেন এই পুরো পরিবারটাকে শহরে থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। হিন্দুত্বের বেশ ধরে আসা সেই দুষ্কৃতীদের খোঁজ চলছে, কিন্তু পুলিশ এখনও তাদের ধরার মতো কোনও সূত্র পায়নি। কী ভাবে সেই দুষ্কৃতী দল এই কাশ্মীরি পরিবারে খোঁজ পেল তা নিয়ে সকলেই ধন্ধে। এই চিকিৎসকের কিছু বন্ধুর মতে ঘটনার পিছনে পরিচিতরাই রয়েছে।
এতকিছুর পরও সেই চিকিৎসক কিন্তু ভুলতে পারছেন না হিন্দুত্বের বেশধারী সেই দুষ্কৃতীদের রক্তচক্ষু। যারা তাঁকে শহর ছাড়ার শাসানি দিয়ে এসেছিল। কথার অন্য়থা করলে দুই মেয়ের প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। এক সর্বভারতীয় ইংরাজি সংবাদমাধ্যমে এই খবর প্রকাশ হওয়ার পর থেকে নড়েচড়ে বসেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। যারা ধর্মের নামে শহরকে অশান্ত করার চেষ্টা করছে তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
দুষ্কৃতীদের দৌরাত্ম তাও মানা যায়, কিন্তু ঘটনার প্রেক্ষিতে যে ভাবে পড়শিরাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন তা মন থেকে মেনে নিতে পারছেন এই কাশ্মীরি চিকিৎসক। রাতারাতি তাঁর মেয়েদের সঙ্গে খেলা বন্ধ করে দিয়েছে অন্য বাচ্চারা। কারণ, ওই কাশ্মীরি পরিবারের মেয়েদের সঙ্গে খেলা করলে অন্যদের বিপদ বাড়তে পারে। একই অবস্থা স্কুলের পুলকারেও। যে পুলকারে এই কাশ্মীরি চিকিৎসকের মেয়ে যাতায়াত করে সেই পুলকারের একটি বাচ্চার আর দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ, সেই বাচ্চার মা-বাবা তাকে অন্য একটি পুলকারে দিয়েছেন। হঠাৎ করে বদলে যাওয়া এই পরিস্থিতি নিয়ে সমানে জিজ্ঞাসা করে চলেছে মেয়েরা। কাশ্মিরী চিকিৎসক জানিয়েছেন, এর কোনও জবাব তিনি বা তাঁর স্ত্রী দিতে পারছেন না। এই পরিস্থিতি বদলাবে না বলেই মনে করছেন তিনি। তাই শহর ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনও গতি নেই বলেই মনে হচ্ছে তাঁর। সব ধর্ম-কে আপন করে নেওয়া এই শহরকে একদিন রঙিন বলে বোধ হয়েছিল, কিন্তু এখন সেই রঙটা যেন ফিকে হয়ে গিয়েছে এই কাশ্মীরি চিকিৎসকের পরিবারের কাছে।












Click it and Unblock the Notifications