যুদ্ধের দামামা, বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৈরি হল ব্রিজ
যুদ্ধের দামামা, বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তৈরি হল ব্রিজ
যুদ্ধ কত রকমের বাধা হয়ে দাঁড়ায় মানব জীবনে। বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি হাওড়া ব্রিজ তৈরির ক্ষেত্রে। বিশ্ব যখন মত্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে। তখনই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছিল হাওড়া ব্রিজ। জাপানি বোমার অন্যতম টার্গেটও ছিল নতুন নির্মীয়মাণ হাওড়া ব্রিজ। কঠিন সময়ে তৈরি হওয়ার জন্যই হয়তো এতটা ভিত শক্ত হাওড়া ব্রিজের। এবং কোনও পিলার নাটবোল্ট ছাড়াই।

৭৫ বছর পেরিয়েও হাওড়া ব্রিজ একইরকম ভাবে বয়ে চলেছে গঙ্গার দুই পাড়ের শহরের ভার। ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে কোনও কিছু তৈরি করতে হলে শুধু কাঁচামাল নয়, পুরো রেডিমেড জিনিষটি জাহাজে চাপিয়ে ভারতে আনা হতো। তারপর এখানে শুধু সেঁটে দেওয়ার কাজটি হতো।
অনেকটা এখনকার কলকাতায় দুর্গা পুজোয় হওয়া থিম পুজোর মণ্ডপের মতো। শিল্পী তাঁর স্টুডিওতে বেশিরভাগ কাজটাই করে ফেলেন। সময় মতো জথা স্থানে এনে শুধু জুড়ে দেন। হাওড়া ব্রিজের ক্ষেত্রেও সেরকমই কিছু হওয়ার কথা ছিল। সরঞ্জাম ইংল্যান্ড থেকে কলকাতা আসার কথা ছিল। প্রয়োজন ছিল ২৬ হাজার টন স্টিল।

তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলায় সেই জাহাজ ঘুরিয়ে নেওয়া হয়। মাত্র তিন হাজার টন কাঁচামাল ইংল্যান্ড থেকে আনা সম্ভব হয়েছিল। বাকি ২৩ হাজার টন কাঁচামাল সরবরাহ করেছিল ভারতের টাটা স্টিল কোম্পানি। এমনকী নতুন ব্রিজ তৈরির সময়ে কোনও বিদেশী নয়, স্থানীয় ইঞ্জিনিয়ারদের সাহায্যেই কাজ হয়েছিল।

কলকাতা তখন ধীরে ধীরে কল্লোলিনী হয়ে উঠছে। গাড়ি ঘোড়া বাড়ছে। মানুষের চাপ বাড়ছে। অন্যদিকে হাওড়া তৎকালীন ভারী শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র। গঙ্গাপাড়ের দুই শহরকে ব্যবসার জন্য জুড়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কারণ কাঠের প্লটুন ব্রিজের এই ক্ষমতা নেওয়া সম্ভব হবে না বলে মনে হয়েছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়রদের। ১৯০৬ সালে হাওড়া স্টেশন তৈরি হওয়ার পরে সেই চাহিদা আরও বেড়ে যায়। তাই নতুন ব্রিজ তৈরির জন্য পরিকল্পনা শুরু হয়ে যায়।
কলকাতা বিশেষজ্ঞ পল্লব মিত্র বলেন, '১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরে পুরনো পুন্টুন ব্রিজ সারাই হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝেই ১৯৪২ সালে হাওড়া ব্রিজ তৈরির কাজ শেষ হয়েছিল। শেষপর্যন্ত ১৯৪৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে নতুন হাওড়া ব্রিজের পথ চলা শুরু হয়। বিশ্বযুদ্ধের কারণে বারবার থমকে গিয়েছিল ব্রিজ তৈরির কাজ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাজ সম্পূর্ণ হয়েছিল এবং যথেষ্ট ভালো ভাবে।'

পুরনো কলকাতার গল্পের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্বর্ণালী চট্টোপাধ্যায় বলেন, 'তবে কোনও উদ্বোধন বা জাঁকজমক করে অনুষ্ঠান করা হয়নি। কারণওই সময়্যে জাপান পার্ল হারবারে বোমা ফেলেছিল। এই ব্রিজের কথা জানলে যদি এটিকেও টার্গেট করা হয়, সেই ভেবেই ঘটা করে উদ্বোধন না করে শুধু জনগণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ব্রিজ তৈরি হওয়ার পর প্রথম যুগে কলকাতা ও হাওড়ার দুদিক থেকেই লোককে পার করার জন্য ট্রাম ব্রিজের উপরে চলাচল করত'। ট্রাফিকের চাপে ১৯৯৩ সালে ট্রাম চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়।দৈর্ঘ্যে ব্রিজটি ৭০৫ মিটার লম্বা ও চওড়ায় ৭১ ফুট। সঙ্গে পথচারীদের জন্য ১৪ ফুট চওড়া ফুটপাথ দুদিকে।












Click it and Unblock the Notifications