প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহে দুর্গা পুজো , জগদ্ধাত্রী আসেন ডাকের সাজে
প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহে দুর্গা পুজো , জগদ্ধাত্রী আসেন ডাকের সাজে
বৌবাজার কেবল মধ্য কলকাতার একটি জনপদীয় কেন্দ্র নয়, এটি কলকাতার প্রাণকেন্দ্র। নাহলে বারো মাসে বাঙালির যা যা পার্বণ চলে, তার সবকটিতে বৌবাজারের মানুষ যে কি করে সমান দক্ষতায় অংশগ্রহণ করতে পারে, তা এ যুগে আমার বিস্ময়ের মনে হয়। কি বনেদি কি বারোয়ারি, রথ থেকে শুরু করে দুর্গাপুজো, কালী পুজো, জগদ্ধাত্রী পুজো হয়ে মায় রাস উৎসব অবধি সমস্ত পার্বণ কী অপূর্ব নিয়ম নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেন বৌবাজারের প্রতিটি মানুষ, তা চোখে না দেখলে অনুভব করা যায় না।

এ অঞ্চলে যতগুলো বনেদী বাড়ি আছে, তাদের মধ্যে ৪৫ নং হিদারাম ব্যানার্জী লেনের নীলমণি দে ঠাকুর বাড়ি অন্যতম ঐতিহ্যশালী ও সুসজ্জিত। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যে সমস্ত বর্ধিষ্ণু সুবর্ণবণিক পরিবার হুগলি জেলার আদিসপ্তগ্রাম থেকে সুতানটীর তীরে বানিজ্য স্থাপনে মনোনিবেশ করতে আসেন, তাঁদের মধ্যে এই নীলমণি দে'র পরিবার ছিল অন্যতম। কলকাতায় প্রথমদিকে এই পরিবারের বসতি ছিল ৪৪ নং হিদারাম ব্যানার্জি লেনের একটি বাড়িতে। এরপর ১৮৯৬ সালে নীলমণি দে তাঁর স্বর্গীয় মায়ের স্বপ্নাদেশ পান একটি, যে আদেশানুসারে প্রথমে তিনি শ্রীশ্রী লক্ষ্মীনারায়ণ এবং শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের মন্দির স্থাপনের সঙ্কল্প নেন এবং তারপর ৪৪ নং এর বাড়িটি ছেড়ে ৪৫ নং হিদারাম ব্যানার্জি লেনে একটি নতুন বসতবাড়ি নির্মাণ করে, সেখানে গড়ে তোলা নতুন দেবালয়ে প্রতিষ্ঠা করেন সকল দেবদেবীদের একে একে।
এর বেশ কিছুকাল পর এ বাড়িতে অধিষ্ঠিত হন অষ্টধাতুর নির্মিত দুর্গামূর্তিটি। প্রতিবছর দুর্গাপুজোয় এখনো এই অষ্টধাতুর মূর্তিটিকেই চিরাচরিত নিয়মানুযায়ী আরাধনা করা হয় এ বাড়িতে, যেটিই এ বাড়ির মূল আকর্ষণ। তবে এই পরিবারে দুর্গাপুজোয় প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহে পুজো করা হয় বলেই বোধহয়, মহামায়ার আরেক রূপকে ডাকের সাজে আবাহন জানানো হয় প্রতিবার। এ বাড়ি আদতে বৈষ্ণব ঠাকুর বাড়ি। কারণ, অষ্টধাতুর দুর্গামূর্তি ছাড়াও এ বাড়িতে রয়েছেন প্রতিষ্ঠিত রাধাগোবিন্দ, যাঁর নিত্যসবার নিয়ম নীতি এখনো পালিত হয়ে আসছে একইভাবে। তাছাড়া রয়েছে কাষ্ঠনির্মিত সুপ্রাচীন একটি রথ, যেটি আজও প্রতিবছর রথযাত্রার সময় পরিক্রমা করানো হয় বৌবাজারের অলিগলি দিয়ে।
সবশেষে বলি জগদ্ধাত্রী পুজোর কথা। যে সমস্ত প্রতিষ্ঠিত বিগ্রহের উপস্থিতির কারণে নীলমণি দে ঠাকুরবাড়ির দালানটিকে আর পাঁচটা বনেদী বাড়ির চেয়ে অন্যরকম দেখতে লাগে, ঠিক সেই একই কারণে এ বাড়িতে যখন শ্বেতশুভ্র জগদ্ধাত্রী দেবী ঠাকুরদালান আলো করে অধিষ্ঠিত হন, তখন মনে হয় বাড়িতে নতুন অতিথি এসেছেন। এই পরিবারে জগদ্ধাত্রী পুজো ১৩৫ বছরেরও বেশী পুরোনো। অন্যন্য সব বাড়ির মতোই এখানেও ষষ্ঠী থেকে নবমীর সমস্ত পূজাপাঠ নবমীর গোটা দিন জুড়ে সাড়ম্বরে পালন করা হয়। এরই মধ্যে অষ্টমীতে চলে ধুনো পোড়ানোর আয়োজন। তবে বৈষ্ণব পরিবারের রীতি অনুযায়ী এখানে মা'কে সম্পূর্ণ নিরামিষ ভোগ প্রদান করা হয়।
দে বাড়ির ঠাকুরদালান দেখলে বঙ্গীয় হিন্দু মন্দিরের স্থাপত্যরীতির বহু মিল লক্ষ্য করা যায়। সাধারণ তিনখিলান বা পাঁচখিলানের বনেদী বাড়ির গতানুগতিক স্থাপত্যের ছাপ, এ বাড়ির কোনো অংশেই লক্ষ্যণীয় হয়না। বরং এ বাড়ি দেখতে বাংলার যে কোনো আদর্শ বৈষ্ণবীয় মন্দিরের মতোই। তবে এ বাড়ির সবচেয়ে যে জিনিসটি আমার চমকপ্রদ লাগে, তা হলো বাড়ির বাইরের দেওয়াল জুড়ে দৃষ্টি আকর্ষন করা একটি বাংলা ডায়ালের ঘড়ি। প্রতি সেকেন্ডে সময়ের কাঁটা ঘুরিয়ে চলেছে বাংলা মতে।












Click it and Unblock the Notifications