ওষুধের দাম এবং বাজার ধরতে ছাড়ের লড়াইয়ে নাজেহাল সাধারণ মানুষ, একগুচ্ছ দাবি নিয়ে সরব পরিবেশবিদ
ওষুধের দাম এবং বাজার ধরতে ছাড়ের লড়াইয়ে নাজেহাল সাধারণ মানুষ, একগুচ্ছ দাবি নিয়ে সরব পরিবেশবিদ
দিনের পর দিন বাড়ছে ওষুধের দাম। আবার অপর দিকে লাফিয়ে বাড়ছে ছাড় দেওয়ার পাল্লা। যে যেভাবে পারছে বাজার ধরতে চাইছে। তা নিয়ে সরব হয়েছেন পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত। আদতে পরিবেশবিদ হলেও তিনি নানা সময়ে যখনই কোনও কিছু অন্যায় বলে তাঁর মনে হয়েছে তিনি তা নিয়ে সুর চড়িয়েছেন। এবার যেমন তিনি সুর চড়ালেন ওষুধের দাম এবং ছাড় দেওয়ার লড়াই নিয়ে।

হরলালকা
তিনি বলেছেন, ওষুধ খেয়ে মরতে নয়, বরং আমরা বাঁচতেই চাই। প্রায় ৫০ বছর আগের একটা বিষয় বর্তমানে আমাকে খুবই ভাবিয়ে তুলেছে। "হরলালকা" নামে এক বস্ত্র - বিপনী সত্তরের দশকে প্রচুর ডিসকাউন্টে (৫০%) পণ্য বিক্রি করতো। ঠকে গিয়ে পরে আমরা জানলাম এবং বুঝলাম যে ১০০% দাম বাড়িয়ে তাতে ৫০% ছাড় দেওয়া হোত। ক্রেতারা বেশি দামে বাজে জিনিস কিনতেন। "হরলালকা" আজ উঠে গেছে কিন্তু ওষুধ ব্যবসায় এই ডিসকাউন্ট ব্যাপারটা এমনভাবে জাকিয়ে বসেছে যে আমি চিন্তিত। কেউ দিচ্ছে ১০%, তো অন্য দোকান দিচ্ছে ১৫%, আবার কখনও বলা হচ্ছে যে ২০% ডিসকাউন্ট। এটা যদিও ঠিক হরলালকা কেস নয় - তবুও মনে হচ্ছে এই ডিসকাউন্ট দেওয়ার ব্যাপারটায় একটা ঘাপলা রয়েছে। খোঁজখবর নেওয়া শুরু করলাম।

ড্রাগ প্রাইস
তাঁর কথায়, দেশে National Pharmaceutical Pricing Authority (NPPA) নামে সংস্থাটি ওষুধের দাম ঠিক করে এবং তার ভিত্তিতে Drug Price Control Order (DPCO) বের হয়। বিভিন্ন শিল্পে দ্রব্যের দাম নির্ধারণের (Pricing) বিষয়ে অনেক বছর ধরে করেছি। সেই অভিজ্ঞতায় মনে হচ্ছে - ভারতে ওষুধের দাম ঠিক করার ক্ষেত্রে কোন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নেওয়া হয়না এবং এতে স্বচ্ছতা কেমন তাও বুঝিনা। NPPA কি জানে যে প্রাইসিং এর একটি পদ্ধতি আছে? যার নাম - "Cost Plus" অর্থাৎ যাতে উৎপাদন ব্যায়ের উপর নির্দিষ্ট মাত্রায় লাভ ধরে বিক্রয়মূল্য ঠিক করা হয়।

শুধুই পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাসের দাম নিয়ে সোচ্চার
পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাসের দাম নিয়ে সমাজ খুবই সোচ্চার কিন্তু ওষুধের দাম নিয়ে আমরা কোনও খোঁজই প্রায় রাখিনা। শুধু ওষুধের দামই নয় - ডাইগোনিস্টিক/প্যাথলজিক্যাল টেস্ট, ডাক্তারদের ফিস ও চিকিৎসার অন্যান্য আনুসঙ্গিক খরচাপাতি বিগত কয়েক বছরে প্রায় ২০০% থেকে ৩০০% বেড়েছে। ভারতে ওষুধ প্রস্তুতকারীরা খুবই স্ট্রং। এই দাম নির্ধারণে ওদের অদৃশ্য হাত কাজ করে বলেই আমার ধারণা। দেশে ১৩৬ লক্ষ কোটি (১.৩৬ ট্রিলিয়ন) টাকার ওষুধের ব্যবসাটা খুবই লাভজনক। এর মধ্যে উৎপাদনকারী, হোলসেলার ও রিটেলাররা আছেন। অতি প্রয়োজনীয় ওষুধ (essential medicine) ও ততটা প্রয়োজনীয় নয় ( non-essential ) এমন ওষুধের তালিকা সরকার তৈরি করে। Essential medicine এর ক্ষেত্রে রিটেল মার্জিন ১৬% ঠিক করা হলেও - অন্য ওষুধের বেলায় তা নেই।

সাধারন ক্রেতাদের ব্যায় ক্ষমতা
যারা ওষুধের দাম ঠিক করে - অর্থাৎ NPPA তারা কেমিক্যাল ও ফার্টিলাইজার দপ্তরের অধীন। স্বাস্থ্য ও ওষুধের প্রয়োজনীয়তা তারা ঠিক কতটা বোঝেন তা জানিনা। সাধারন ক্রেতাদের ব্যায় ক্ষমতা কতটুকু, তা দেখার কোনও ব্যবস্থাই নেই। বর্তমানে নীতি আয়োগের সুপারিশে প্রয়োজনীয় ওষুধ কোনটা হবে তা বিবেচনা করা হয়। কিন্তু কেউই দেখার নেই ঠিক কি দামে ক্রেতাদের কাছে ফাইনালি ওষুধগুলো পৌছাচ্ছে। তাইতো ডিসকাউন্ট এর নামে চলছে এই "হরলালকা" মার্কা প্রহসন। এই ওষুধ যখন বেসরকারি নার্সিংহোমগুলোর হাতে পৌঁছায় কোন মূল্যে যে ওরা তখন বিল ধরান - তা আমরা জানিও না এবং বুঝিও না।
সারা বিশ্ব আজ অবগত যে ভারতে ২০% ওষুধ নাকি জাল। নিষিদ্ধ ও মেয়াদ উত্তীর্ণ কত ওষুধ যে আমরা খাচ্ছি তা হিসেবের বাইরে। এখানেও একটা র্যাকেট কাজ করে। Expired ওষুধের ব্যাপারটা দেখার কেউই নেই। দ্রব্যের গুণগত মান অর্থাৎ quality বিচার করার ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। ভেজালের স্বর্গরাজ্য ভারতে ভেজালকারীরা প্রকৃতই স্বাধীন। ভেজাল ওষুধ ২০% শুধু নয়, হয়তো আরও বেশী।
বিভাজনের অভিযোগ রাজনীতির আঙিনায় প্রায়ই শুনি। কিন্তু ওষুধের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যমে essential ও non-essential ভাবে চিহ্নিত করে দামের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়টিকে একেবারেই ছাড় দেওয়াটা কি ঠিক? ওষুধ মানেই হচ্ছে আবশ্যকীয়।

দাবি
প্রত্যেকটি ওষুধের দাম সরকারকেই ঠিক করতে হবে।
• গরীব মানুষের জন্য কম মূল্যের ওষুধের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
• ওষুধের দোকান থেকে স্যাম্পেল নিয়ে তার গুণগত মান পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা দরকার।
• ক্রস সাবসিডি প্রদান করে সরকারকে ওষুধের দামে সাম্যতা আনতে হবে।
• স্বাস্থ্য পরিষেবা বেসরকারি হাতে রাখা চলবে না।
• Intellectual Property Act ও পেটেন্ট আইন ওষুধ শিল্পের ক্ষেত্রে কিছুটা শিথিল করা দরকার।
• উৎপাদন ব্যায়ের ওপর শতকরা ১০ টাকা লাভে ওষুধ বিক্রি করার ব্যবস্থা করতে হবে অর্থাৎ Cost plus।
• ওষুধ তৈরি থেকে বিক্রি সমস্ত পর্যায়ে নজরদারি আরও বাড়াতে হবে।
মানুষ আজ বাঁচতে চায়, ঠকতে নয় এবং ওষুধ খেয়ে মরতে তো একেবারেই নয়।












Click it and Unblock the Notifications