দশমীর দিন মায়ের পাতে পড়ে জ্যান্ত পুঁটি মাছ, দেড়শো বছরের পুজোর রীতি এমনটাই
দশমীর দিন মায়ের পাতে পড়ে জ্যান্ত পুঁটি মাছ, দেড়শো বছরের পুজোর রীতি এমনটাই
দশমীতে যে কোনও পুজোতে দেবী দুর্গার জন্য বিশেষ ভোগ কিছু হয় না। দধিকর্মাই প্রচলিত রীতি কিন্তু এই বাড়ি বনেদি। সেখানে রীতি অন্যরকম। মা'কে দশমীতে দেওয়া হয় মাছ। এমনই রীতি বালিগঞ্জের পাল পরিবারের।

কলকাতার বালিগঞ্জ পাল বাড়ির পুজোর সূচনা হয়েছিল ১২৮২ বঙ্গাব্দে। এই পাল দুর্গাবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা স্বর্গীয় শ্রী হরিপ্রিয় পাল. আগে প্রতিমা বাড়িতে তৈরী হলেও এখন প্রতিমা আনা হয় পালপাড়া থেকে। একচালা প্রতিমার মুখ হয় বাংলা মুখের আদলে। পঞ্চমীর সন্ধ্যায় অস্ত্রোদানের পর মায়ের নাকে পড়ানো হয় সোনার নথ। মাকে সাজানো হয় ডাকের সাজে। বৃহৎনন্দীকেশ্বর পুরাণ মতে পাল বাড়ির দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।
পঞ্চমীর সন্ধ্যাবেলায় বোধন বসে ঠাকুরদালানের একপাশে এবং মায়ের আমন্ত্রণ ও অধিবাস সম্পন্ন হয় ষষ্ঠীর সন্ধ্যায়| সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা স্নান হয় ঠাকুরদালানেই। দেবীর ঘটস্থাপনের পর ঠাকুরদালানে প্রবেশ করেন রুপোর গৃহলক্ষ্মী। প্রাণপ্রতিষ্ঠা ও চক্ষুদান বিধির পর হয় মায়ের প্রতিষ্ঠা আরতি। এরপর মায়ের সপ্তমীবিহিত ষোড়শ উপচার পুজো এবং সপ্তমীর পুজো আরতি।
সন্ধ্যায় হয় মায়ের সান্ধ্যকালীন আরতি আর সান্ধ্যকালীন ভোগ হিসেবে থাকে ঘি এর লুচি, সন্দেশ, ফল এবং নাড়ু। সপ্তমীর সন্ধ্যায় বাড়ির কুলাচার মেনে রাখা হয় রুপোর নবগ্রহের ঘট ও আলাদা আলাদা পতাকা। এরপর অষ্টমীর সকালে মায়ের অষ্টমী বিহিত পুজো ও আরতি। অষ্টমীর দিন আগে কুমারী পুজো এবং ধুনা পোড়ানোর চলন ছিল। বর্তমানে নিয়ম রক্ষার্থে মাকে উৎসর্গ করা হয় একটি বিশেষ ডালা যেটিতে থাকে কুমারী মায়ের পুজোর সামগ্রী।
গুপ্ত প্রেস পঞ্জিকার সন্ধির নির্ধারিত সময় অনুসারে অষ্টমীর ও নবমীর সন্ধিক্ষণে মায়ের সামনে প্রজ্জ্বলন করা হয় ১০৭ রুপোর প্রদীপের সঙ্গে একটি সোনার প্রদীপ এবং সঙ্গে নিবেদিত হয় ১০৮ লাল পদ্ম। সপ্তমীপুজো এবং সন্ধিপুজোতে বলি দেওয়া হয় একটি করে চালকুমড়ো নবমী পুজোতে চালকুমড়ো ছাড়াও কাঁঠালি কলা এবং জোড়া আখ বলি দেওয়ার রীতি রয়েছে এই পরিবারে। নবমীর সকালে নবমী বিহিত পুজো এবং হোমানুষ্ঠান এর মাধ্যমে পুজোর পূর্ণাহুতি করে দেবী ও পুরোহিতদের দক্ষিণান্ত করা হয়, এরপর সন্ধ্যায় যথারীতি নবমীর আরতি। এই পরিবারের রীতি অনুযায়ী দশমীর দিন মাকে নিবেদন করা হয় জ্যান্ত পুঁটি মাছ।
সকালে পুজো আরতি সম্পূর্ণ হলে একটি পিতলের গামলায় দুধ আলতা জলে দেবীর দৰ্পণ বিসর্জনের পর পরিবারের সকলে একসঙ্গে মাকে ছুঁয়ে বলেন "পুনরায় গমনায় চ " অর্থাৎ পুনরায় যেন মা পরের বছর আবার তাঁদের বাড়িতে পুজো নিতে আসেন, এটিকে বলা হয় পুনরাগমনীয় অনুষ্ঠান। পরিবারের সবাই মিলে মায়ের মুখের প্রতিচ্ছবি দর্শন করেন দৰ্পণে। এরপর বাড়ির সদস্য সদস্যারা অপরাজিতা গুল্ম হাতে বেঁধে অপরাজিতা পুজোর বিধি পালন করা হয়ে থাকেন। বিকালে বরণ অনুষ্ঠান ও সিঁদুর দানের পর বাবুঘাটের গঙ্গায় হয় প্রতিমা নিরঞ্জন |
পাল বাড়িতে কোনোরকম রান্না করা ভোগ দেবার চলন নেই সমস্ত ভোগ এইবাড়িতে দেওয়া হয় কাঁচা আমান্ন ভোগ হিসাবে। মাকে নানা মিঠাই নাড়ু দিয়েও ভোগ দেওয়া হয় সঙ্গে থাকে ফলমূল, সিধা ও ভোজ্য। প্রতিদিন পুজো সম্পূর্ণ হলে ও সন্ধ্যায় মায়ের আরতি করা হয়ে থাকে। এই বাড়ির আরেকটি রীতি হলো পুজোর কদিন গৃহলক্ষ্মী ঠাকুরদালানেই থাকলেও বিসর্জনের সুতো কাটার আগেই ফিরে যান বাড়ির ঠাকুর ঘরে এবং কোজাগরী পূর্ণিমার দিন আবার দুর্গাদালানেই তাঁর লক্ষ্মীপূজা বিহিত পুজো অনুষ্ঠিত হয়।












Click it and Unblock the Notifications