মর্ত্যে এসে এই বাড়িতে গয়না পরেন দেবী দুর্গা
মর্ত্যে এসে এই বাড়িতে গয়না পরেন দেবী দুর্গা
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে বর্ধমানের সাতগাছিয়া থেকে কলকাতায় আসেন এই পরিবারের গোকুলচন্দ্র দাঁ। জোড়াসাঁকো এলাকায় বাড়ি তৈরি করেন তিনি।
গোকুলচন্দ্র দাঁ-এর মতোই দত্তকপুত্র শিবকৃ্ষ্ণও ছিলেন সেই সময়কার নামকরা ব্যবসায়ী। গন্ধক, লোহা, কাঠকয়লার ব্যবসায় সুনাম ও প্রতিপত্তি ছিল তাঁর। পারিবারিক ব্যবসাকে আরও বিস্তৃত করেন তিনি।

তাঁর আমলে ১৮৪০ সালে পুজোর শুরু হয়। ১২ শিবকৃষ্ণ দাঁ লেনে এখনও সেই পুজো চলে আসছে।
সেকালে পুরনো কলকাতায় প্রবাদ ছিল, 'দেবী মর্ত্যে এসে গয়না পরেন জোড়াসাঁকোর শিবকৃষ্ণ দাঁয়ের বাড়িতে'।
এবং ভোজন করেন শোভাবাজার রাজবাড়িতে ।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, এক সময়ে দুর্গা প্রতিমাকে সাজানোর জন্য প্যারিস এবং জার্মানি থেকে হিরে আর চুনি বসানো গয়না আমদানি করাতেন শিবকৃষ্ণ।
গোকুলচন্দ্রের ছিল অভিনয়ের শখ। তাই তাঁর আমলে তৈরি ঠাকুরদালানের চেহারাটি সে যুগের আর পাঁচটা দালানের থেকে খানিকটা আলাদা। উপবৃত্তাকার উঠোনের এক প্রান্তে দু'দালান বিশিষ্ট ঠাকুরদালান। ভিতরের দালানটি তিনটি খিলানে বিভক্ত। কিন্তু সামনের দালানটিতে রয়েছে একটি বড় খিলান।
নাটকের মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হত ওই অংশটি। এক সময়ে দুর্গাদালানের ওই সামনের অংশে নাটক বা যাত্রা মঞ্চস্থ হত।
সামনের দিকে একটি দরজা থাকলেও মূল সদর দরজা ঠাকুরদালানের সোজাসুজি। সেখান দিয়ে ঢুকে দু'পাশের চওড়া দালান থেকে দোতলার বারন্দায় ওঠার সিঁড়ি। বারন্দার সামনের অংশগুলি অর্ধবৃত্তাকার, অনেকটা প্রাচীন ইউরোপীয় অপেরা হাউসের 'ব্যালকনি'র মতো।
একচালা ডাকের সাজের বাংলা শৈলীর মহিষাসুরমর্দিনী প্রতিমা। আধুনিক রূপের সাদা সিংহ
সাবেকি একচালা ডাকের সাজের বাংলা শৈলীর মহিষাসুরমর্দিনী প্রতিমা। আধুনিক রূপের সাদা সিংহ।
এই কারুকার্যখচিত ছাতায় আড়াল করে 'নবপত্রিকা' স্নান করাতে নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গায়
প্রতিপদাদিকল্পে পুজো, অর্থাৎ মহালয়ার পরের দিন থেকে আরম্ভ হয় বোধন।
কোনও পশুবলি হয় না। অব্রাহ্মণ পরিবার, তাই অন্নভোগের প্রচলন নেই। পরিবর্তে চাল, ডাল, বিভিন্ন ফল ও মিষ্টান্ন দেওয়া হয় নৈবেদ্য হিসেবে।
এই বাড়ির পুজোর উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল 'কলাবউ-এর ছাতা'। সপ্তমীর দিন ভোরে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে শোভাযাত্রা-সহ বিরাট এক কারুকার্যখচিত ছাতায় আড়াল করে 'নবপত্রিকা' স্নান করাতে নিয়ে যাওয়া হয় গঙ্গায়।
আগেকার দিনে কলকাতার বনেদি পরিবারগুলিতে গৃহদেবতার এক শরিকের বাড়ি থেকে অন্য শরিকের বাড়ি স্থানান্তরের সময়ে বড় আকারের বিভিন্ন রকম ছাতা ব্যবহার করা হত। ইংল্যান্ড বা তাইল্যান্ড থেকে আমদানি করা হত সে সব ছাতা। তার পর ঢাকা বা বারাণসী থেকে আসা দক্ষ কারিগরেরা সেই ছাতার উপরে সরু সোনা ও রুপোর তার দিয়ে নকশা তৈরি করতেন।

দাঁ-বাড়িতে এখনও সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকাকে স্নান করাতে যাবার সময়ে সেই রকম ভেলভেটের উপরে সোনা-রুপোর তারের কাজ করা বড় ছাতা ব্যবহার করা হয়।
১৯৪২ সাল পর্যন্ত বিদেশ থেকে আনা ডাকের সাজ আনার রীতি প্রচলন ছিল। সেই ডাকের সাজের কিছুটা এখনও চালচিত্রের তবক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তামা আর পিতলের সংমিশ্রণে তৈরি এই তবক এখনও সাদা জলে সামান্য ধুয়ে নিলেই একেবারে নতুন ধাতুর মতোই চকচক করে। এখনও দাঁ বাড়ির পুজো ধুমধাম করেই হয়।
পুজোয় কলাবউ-এর ছাতার ঐতিহ্য এখনও ধরে রেখেছে জোড়াসাঁকোর দাঁ বাড়ি ।
শিবকৃষ্ণের আমলে দাঁ বাড়ির পুজোর সঙ্গে রেষারেষি ছিল প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের পুজোর। সেই সময়ে দাঁ বাড়ি থেকে বিসর্জনের জন্য প্রতিমা নিয়ে বেরিয়ে চিৎপুরের দিকে যেতে হলে জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া ছাড়া পথ ছিল না। তাতে এই রেষারেষি আরও ইন্ধন পেত।
ঠাকুর বাড়ির সামনে দিয়ে আরও দুপাক বেশী ঘোরানো হোতো ও আরো জোরদার করে বাদ্যি বাজনা বাজানো হোতো যাতে ঠাকুর বাড়ির ছেলেপিলেরা বুঝতে পারে দাঁ বাড়ি র ঠাকুর বিসর্জনে চলেছেন ।
সাবেকি একচালা ডাকের সাজের মহিষাসুরমর্দিনী প্রতিমা। স্বাভাবিক রীতির সাদা সিংহ।
দাঁ বাড়িতে পুজো হয় বৈষ্ণব রীতি মেনে। যদিও দুর্গার বাহন সিংহের মুখ ঘোড়ার আদলে নয়।
মহালয়ার পরের দিন থেকে হয় বোধন। বৈষ্ণবীয় রীতি অনুসরণের কারণেই পশুবলি বা প্রতীকী বলির প্রচলন নেই। পুজোতে অন্নভোগ হয় না। লুচি, গজা, খাজা ইত্যাদি দিয়ে ভোগ প্রস্তুত করা হয়।












Click it and Unblock the Notifications