রাজবাড়ীতে মহাসমারোহে পালিত বিবেকানন্দের শিকাগো থেকে ফেরার পর প্রথম সভার ১২৫ বছর
রাজবাড়ীতে মহাসমারোহে পালিত বিবেকানন্দের শিকাগো থেকে ফেরার পর প্রথম সভার ১২৫ বছর
১৮৯৭ সালে বিবেকানন্দ শিকাগো বিশ্ব ধর্ম মহাসভা থেকে ফেরার পর তাঁকে এখানেই রাজা বিনয়কৃষ্ণ দেব বাহাদুর আনুষ্ঠানিক ভাবে সম্মানিত করেন।

তিনি ছিলেন একজন 'সৃষ্টিছাড়া' মানুষ। নিজেই বুঝে উঠতে পারেননি কতোটা 'সৃষ্টিছাড়া' ছিলেন তিনি। ঊনচল্লিশে পৌঁছে যখন মানুষ ভাবতে বসে কীভাবে শুরু করতে হবে, তিনি সব পাততাড়ি গুটিয়ে উধাও হয়ে গেলেন কোথায়? কী কী সব করে গেলেন, ইয়ত্তা নেই। দেড়শো বছর পরেও লোকে সেসব নিয়ে ভাবে, কথাবাত্তা কয়।
তাঁর শিকাগো মহাসভা থেকে ফিরে শোভাবাজার রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে প্রথম সভা করেছিলেন এখানেই। তা সাড়ম্বরে পালন হল প্রাঙ্গণে। এসেছিলেন বেলুড় মঠের মহারাজরা। সেই সময় এই সভার বিরুদ্ধে ছিল সমাজ। তবু বিবেকানন্দকে জায়গা দিয়েছিল রাজবাড়ী। সমাজের বাইরে গিয়েই সেই কাজ করেছিলেন তৎকালীন রাজারা। বছর তিনেক আগে বিবেকানন্দের ১৫৫তম জন্মদিন পালন করে শোভাবাজার ছোট রাজবাড়ি আর ঋতবাক।
সক্কালবেলা শোভাযাত্রা দিয়ে শুরু হয়েছিল, তারপর সারাদিন, সন্ধে গড়িয়ে যায় নানা কর্মকাণ্ডে। দুপুর বেলা ফানুস উড়িয়ে অপরাহ্নের অনুষ্ঠান শুরু হয়। রাজা ভট্টাচার্যের স্তোত্রের সঙ্গে নৃত্যপর্ব। সন্ন্যাসী বরুণ মহারাজ প্রদীপ জ্বেলে উদ্বোধন করেছিলেন। মন্ত্রী-সান্ত্রীরাও ছিলেন সেখানে। নানা বুধমণ্ডলী বললেন তাঁদের কথা।
একটি দুর্লভ অবসর তৈরি হলো মঞ্চে তারপর। একসঙ্গে পাশাপাশি বসেছিলেন শঙ্খ ঘোষ, জয় গোস্বামী, শ্রীজাত। কথা বলেন। কবিতা পড়েন। রাজবাড়ির শ্রী স্বপন দেব এবং ঋতবাকের সম্পাদিকা সুস্মিতা বসু সিং নিপুণভাবে নির্মাণ করেছিলেন গোটা আয়োজনটি। সঙ্গে ছিলেন একজন মেধাবী কলমবাজ, চয়ন সমাদ্দার। বিবেকানন্দ বিষয়ে একটি স্মারকগ্রন্থ উন্মোচন করেছিলেন শঙ্খ ঘোষ। মহারাজ নবকৃষ্ণ বিষয়ক গ্রন্থটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয় প্রথম প্রকাশের ছ'মাসের মধ্যে। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি বিরচিত লঘু প্রবন্ধের একটি বইও প্রকাশ পেয়েছিল একসঙ্গে।
তারপর গান হয়। রবীন্দ্রসঙ্গীত গান শ্রাবণী নাগ। ভারি যাকে বলে স্থান মাহাত্ম্য ! ঐ চাতালে বসে একদিন গান গেয়ে গেছেন স্বয়ং নিধুবাবু, হরুঠাকুর, গোপাল উড়ে, রূপচাঁদ পক্ষী বা শ্রীধর কথক।
সুতানুটিতে প্রথম বসতি স্থাপনকারী ছিলেন সপ্তগ্রামের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী শেঠ ও বসাক এবং তাঁরা এই এলাকার বেশিরভাগ জঙ্গল পরিষ্কার করিয়ে ছিলেন। বসাকেদের গৃহদেবতা শ্যাম রায়ের(কৃষ্ণ) নাম অনুসারে পার্শ্ববর্তী এলাকার নাম শ্যামবাজার রাখা হয়। শোভারাম বসাক ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর কলকাতার এক বিশিষ্ট বাঙালি ধনী ব্যবসায়ী । রামচরণ দেব মেদিনীপুর জঙ্গলে বর্গীদের( মারাঠা ডাকাতের) হাতে নিহত হলে তাঁর বিধবা স্ত্রী তিন পুত্র ও পাঁচ কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে তাঁদের গোবিন্দপুরের বাড়িতে ফিরে আসেন। সেই বাড়িটিও হুগলী নদীর গর্ভে যায়। তাঁরা আড়পুলিতে আসেন, সেখান থেকে সুতানুটির শোভাবাজারে।
ছোট ছেলে নবকৃষ্ণ মায়ের উত্সাহে ইংরেজি, ফারসি ও আরবি শিখে ওয়ারেন হেস্টিংসের ফারসি শিক্ষক নিযুক্ত হন। পরে মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব বিখ্যাত ও প্রতিপত্তিশালী হন।
ব্রিটিশদের পলাশীর যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পর তাঁদের গোবিন্দপুরের বুকে নতুন ফোর্ট উইলিয়াম গড়ে তোলার সিদ্ধান্তের পর শোভাবাজারের মহিমান্বিত দিনগুলি শুরু হয়। গ্রামের বাসিন্দাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় এবং তালতলা, কুমোরটুলী ও শোভাবাজার এলাকায় জমি প্রদান করা হয়।
মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব শোভাবাজারে শোভাবাজার রাজবাড়ি (প্রাসাদ) নির্মাণ করেন। অনেকে মনে করেন তিনি শোভারাম বসাকের থেকে এটা নেন এবং জাঁকজমক ও বিশালতার জন্য তাঁর পছন্দ মিলিয়ে এটিকে বাড়িয়ে তৈরী করেন।
তিনি সিরাজউদ্দৌলার মৃত্যুর পর রামচাদ রায়, আমীর বেগ ও মীরজাফরের সঙ্গে গোপন কোষাগার থেকে আট কোটি টাকার মূল্যবান সম্পদ অর্জন করেছিলেন। মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব আপার চিতপুর রোড (এখন রবীন্দ্র সরণি) থেকে আপার সার্কুলার রোড (এখন আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রোড) পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করেন এবং স্বনামে নামকরণ করেছিলেন। যাইহোক, রাস্তার অর্ধেক গ্রে স্ট্রীটের (এখন অরবিন্দ সরণি) সঙ্গে মিলে যায়, অন্য অর্ধেক শোভবাজার স্ট্রিট হয়ে যায়।

এর উত্তরের রাস্তা রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রিট নামকরণ করা হয়। দেব পরিবারের মধ্যে যাঁদের নামে রাস্তা হয়েছিল তাঁরা হলেন: রাজা গোপী মোহন দেব, রাজা স্যার রাধাকান্ত দেব, রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণ, রাজা মহেন্দ্র নারায়ণ, রাজা দেবেন্দ্র নারায়ণ (দত্তক পক্ষ বা বড় তরফ ),রাজা রাজ কৃষ্ণ, রাজা কালী কৃষ্ণদেব বাহাদুর , মহারাজ কমল কৃষ্ণ, মহারাজা বাহাদুর, স্যার নরেন্দ্র কৃষ্ণ, এবং রাজা বাহাদুর হরেন্দ্র কৃষ্ণ (নিজের পক্ষ , বা ছোটো তরফ)।
১৭৫৭ সালে শোভাবাজার রাজবাড়ির মহারাজা নবকৃষ্ণ দেব দুর্গা পূজা শুরু করেন। তিনি পূজার জন্য একটি ধারা তৈরি করেন যা কলকাতার উঠতি বণিক শ্রেণির মধ্যে একটি রেওয়াজ এবং আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে ওঠে।
পারিবারিক দুর্গা পূজায় যোগদানকারী ইংরেজদের সংখ্যা প্রতিপত্তির একটি সূচক হয়ে ওঠে। ধার্মিক সঙ্কোচ দুরে সরিয়ে রাখা হয়। নর্তকীরা বেশিরভাগই মুসলিম ঘরানার থেকে ছিল।
ইংরেজরা নর্তকীদের সাথে নাচে অংশগ্রহণ করতেন, উইলসন হোটেল থেকে আনা গরু এবং শুয়োরের মাংসর সাথে ভোজন করতেন এবং তাঁদের হৃদয়ের তৃপ্তি অনুযায়ী আকণ্ঠ পান করতেন। শোভাবাজার দুর্গা পূজা কাছাকাছি দুটি বাড়ীতে দুই ভাগে বিভক্ত, কিন্তু পূজাগুলি তাদের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্যের সঙ্গে বিরাজমান।
একটি রাজা নবকৃষ্ণ দেবের দত্তক পুত্রের বংশধরদের, অন্যটি তাঁর নিজের বংশধরদের। পুজাদুটি বর্তমানে বড় বাড়ীর পূজা ও ছোট বাড়ীর পূজা নামে বিখ্যাত।এখানে কার্তিক ইংরেজদের মত পাতলুন পরিহিত। বেশীরভাগ দুর্গাপুজায় গণেশ দেবতা প্রথাগত ধুতি চাদর পরিহিত হতেন, কিন্তু শোভাবাজারে তিনি জগৎ শেঠের মারোয়াড়ি পূর্বপুরুষদের দ্বারা পূজিত একটি মূর্তি এবং দুর্গামুর্তি মুঘল বা অবধের নবাবদের শৈলীতে নির্মিত গহনা পরিহিত ছিলেন। আগেকার দিনে নিধু বাবু ও অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি এবং ভোলা ময়রার মত কবিয়ালরা নর্তকী এবং বাইজীদের সঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। শোভাবাজার রাজবাড়ি কলকাতা পৌরসংস্থা দ্বারা ঐতিহ্য ভবন হিসাবে চিহ্নিত করা হয়।
১৭৫৭ সালে সিরাজ উদ দৌলা কে পরাজিত ও হত্যা করে কুচক্রী দল নবাবী কোষাগার লুঠ করে । মীর জাফর , জগৎ শেঠ , উমিচাঁদ , লর্ড ক্লাইভ , নবকিষেন দেব আরো অনেক। এনারা সকলেই সেই বিপুল সম্পদের ভাগীদার হন ।
একপ্রকার বিজয়োৎসব হিসেবেই ১৭৫৭ সালে নবকৃষ্ণ দেব তাঁর বসতবাড়ি ৩৫ নং এ দুর্গাপূজা র গোড়াপত্তন করেন ।
তাঁর নিজের সন্তান না থাকায় তিনি দাদার পুত্র গোপীমোহনকে দত্তক নেন । এই বাড়িতেই ১৭৯০ পর্যন্ত দুর্গাপূজা এককভাবে চলেছে ।তারপর নিজের পুত্রসন্তানের (রাজকৃষ্ণ ) জন্মের পর তিনি ৩৩নং এর গোপীনাথ বাড়ি তৈরি করেন এবং সপরিবারে ঐ বাড়িতে চলে যান ।
আগে র বাড়িটি তিনি ১৭৯০ সালে উইল করে গোপীমোহনকে দান করেন , তখন থেকেই এটি বড় তরফের বাড়ি ।
১৭৯১ সালে ঐ উইল রেজিস্ট্রেশন হয় এবং ৩৩ নং বাড়িতেও দুর্গাপূজা শুরু হয় । অদ্যাবধি এই দুটো পুজোই চালু আছে । প্রথম টি ১৭৫৭ এর বড় তরফ , বাঘ ওয়ালা বাড়ির এবং দ্বিতীয় টি ১৭৯১এ ছোটো তরফ , গোপীনাথ বাড়ির ।
১৭৯৭ সালে ৬০ বৎসর বয়সে রাজা নবকৃষ্ণ দেব বাহাদুর বিপুল সম্পত্তি রেখে ইহলোক ত্যাগ করেন ।বড় তরফের নাতি রাধাকান্ত দেব বাহাদুর ও ছোট তরফের ৮ জন নাতি সবাই স্বনামধন্য ছিলেন । ১৮৯৭ সালের ২৮শে ফেব্রুয়ারি , রাজা বিনয় কৃষ্ণ দেব শিকাগো ফেরত বিবেকানন্দ কে বড়তরফের বাড়ি র নাটমন্দির এ জনসম্বর্ধনা দেন ।
-
ভবানীপুর ও নন্দীগ্রামে উত্তাপ চরমে, শুভেন্দুর বিরুদ্ধে ভয়ের রাজনীতির অভিযোগে মনোনয়ন বাতিলের দাবি তৃণমূলের -
ইডেনে প্রথম জয়ের সন্ধানে কেকেআর-সানরাইজার্স, দুই দলের একাদশ কেমন হতে পারে? -
যুদ্ধ নয়, আলোচনায় সমাধান! হরমুজ ইস্যুতে বৈঠক ডাকল ব্রিটেন, যোগ দিচ্ছে ভারত -
কালিয়াচক কাণ্ডে কড়া বার্তা সুপ্রিম কোর্টের! 'রাজনীতি নয়, বিচারকদের নিরাপত্তাই...', কী কী বলল শীর্ষ আদালত? -
ভোটার তালিকা ইস্যুতে ফের অগ্নিগর্ভ মালদহ, সকালে ফের অবরোধ -
মালদহের ঘটনার তদন্তভার নিল সিবিআই, মমতার তোপে কমিশন -
ভোটের আবহে জলপাইগুড়িতে চাঞ্চল্য, এক্সপ্রেস ট্রেনে জাল নথি সহ ১৪ বাংলাদেশি গ্রেপ্তার, তুঙ্গে রাজনৈতিক তরজা -
'১৫ দিন বাংলায় থাকব', ভবানীপুরে মমতাকে হারানোর ডাক, শাহের চ্যালেঞ্জে তপ্ত রাজনীতি -
কয়লা কেলেঙ্কারির তদন্ত! দেশের বিভিন্ন শহরে আই-প্যাকের দফতর ও ডিরেক্টরের বাসভবনে ইডি তল্লাশি -
কালিয়াচকে প্রশাসনিক গাফিলতি? জেলাশাসক, পুলিশ সুপারকে শোকজ, CBI অথবা NIA তদন্তের নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট -
৫৪ বছর পর চাঁদের পথে মানুষ, ৪ মহাকাশচারী নিয়ে নাসার 'আর্টেমিস ২'-এ ইতিহাসের নতুন অধ্যায় -
'মালদহ কাণ্ডের মাস্টারমাইন্ড' মোফাক্কেরুল ইসলাম গ্রেফতার, পালানোর সময় বাগডোগরা থেকে ধৃত












Click it and Unblock the Notifications