'সেফ হেভেন' কলকাতা কি সন্ত্রাসের নিশানায়, ২ আনসারুল্লা জঙ্গি গ্রেফতারে প্রশ্ন
কলকাতাকে কি অশান্ত করার ষড়যন্ত্র কষছে জঙ্গিরা? এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে কলকাতাবাসীর মনে। বিশেষ করে গত কয়েক বছরে যে ভাবে বাংলাদেশী জঙ্গিদের কার্যকলাপ কলকাতার বুকে বৃদ্ধি পেয়েছে তাতে এই আতঙ্ক অমলূক নয়।
দেশের একাধিক জায়গায় যতবার জঙ্গি হামলা ঘটেছে তার অধিকাংশতেই নাম জড়িয়েছে কলকাতার। কিন্তু, এখন পর্যন্ত কলকাতার বুকে জঙ্গি হামলা বলতে আমেরিকান সেন্টারে হামলা। এছাড়া স্বাধীনতার পর থেকে কলকাতা বা তার সংলগ্ন এলাকায় জঙ্গি নাশকতার কোনও রেকর্ড এখনও পর্যন্ত নেই। কয়েক বছর আগে খাগড়াগড় বিস্ফোরণকাণ্ড ঘটলেও তা সন্ত্রাস ছিল না। কারণ, জঙ্গিরা খাগড়াগড়ে নিজেদের বিস্ফোরক তৈরির কারখানাতেই বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ফেলেছিল।

আই বি থেকে মিলিটারি গোয়েন্দা বা র'-সকলেরই গোপন রিপোর্টে বারবার জঙ্গিদের 'সেফ হেভেন' বলেই কলকাতাকে চিহ্নিত করেছে। নেপাল বা বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে এই জঙ্গিরা কলকাতায় ঢুকে গা-ঢাকা দিয়েই থাকে বলে দাবি কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের। কারণ, কলকাতার ভৌগলিক অবস্থান, এখানকার জনজীবনে মিশে থাকা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে এই জঙ্গিদের খুঁজে বের করা খুবই কঠিন কাজ। সেই কারণে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বাইরের দেশের জঙ্গিরা এসে সন্ত্রাস চালালেও কলকাতার বুকে তারা কখনও এমন কিছু করেনি।
তবে, কলকাতা যে জঙ্গি নাশকতার হাত থেকে আর বেশিদিন নিরাপদ নয় তা প্রথম বোঝা যায় ঢাকার গুলসনে জঙ্গি হামলার ঘটনার পর। তার আগেই খাগড়াগড় বিস্ফোরণকাণ্ডে সামনে এসেছিল বাংলার বুকে থাকা জামাতের বাহান্নটি স্লিপার সেল-এর তথ্য। এনআইএ তদন্তে সামনে এসেছিল কীভাবে জামাতরা পশ্চিমবঙ্গের একটা অংশ এবং বাংলাদেশকে নিয়ে ইসলামিক রাষ্ট্র তৈরির ষড়যন্ত্র কষছিল সে ব্যাপারটি। গুলসনে বিদেশি রেস্তোরাঁ হোলি আর্টিজান বেকারিতে জামাত জঙ্গিদের আত্মঘাতী হামলা যেন খাগড়াগড় বিস্ফোরণকাণ্ডে পাওয়া তথ্যে সিলমোহর দেয়।

মঙ্গলবার কলকাতা স্টেশন থেকে দুই আনসারুল্লা জঙ্গির গ্রেফতার নতুন আতঙ্ক তৈরি করেছে কলকাতায়। এই জঙ্গির কাছ থেকে যে সব জিনিস বাজেয়াপ্ত হয়েছে তার মধ্যে আছে ইডেন গার্ডেন্সের নাম লেখা একটি চিরকূট। ধর্মতলা বাসস্ট্যান্ড-এর নাম লেখা চিরকূটও নাকি পাওয়া গিয়েছে। এছাড়াও আরও কিছু এমন চিরকূটও নাকি আছে। তবে সেগুলি তে কোন স্থানের নাম লেখা আছে তা জানায়নি এসটিএফ।

ইর্ডেন্স গার্ডেন্স এবং ধর্মতলা-র নাম লেখা চিরকূট-ই সবচেয়ে বেশি করে ভাবনায় ফেলছে কলকাতা পুলিশের এসটিএফ-কে। কারণ, তনবীর ও রিয়াজুল নামে দুই জঙ্গি বেশ কিছুদিন আগেই কলকাতায় পা রেখেছিল। এই সময়ে ইডেন গার্ডেন্সে ভারত-শ্রীলঙ্কা টেস্ট ম্যাচ চলছিল। এই টেস্ট ম্যাচ দেখতে প্রচুর মানুষ সে সময় ইডেনমুখী হয়েছিলেন। তাহলে কি ইডেনের এই ভিড়ে নাশকতার কোনও ছক ছিল আনসারুল্লা জঙ্গিদের? এই প্রশ্নই উঠছে। আবার ধর্মতলা বাসস্ট্যান্ড চত্বরও ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত জম-জমাট থাকে। সুতরাং, জঙ্গিদের কাছে কলকাতার এমন জনবহুল এলাকার নাম থাকা নিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে এসটিএফ-এর।

এখনও পর্যন্ত জেরায় জঙ্গিদের কাছ থেকে এসটিএফ যে তথ্য পেয়েছে, তাতে জানা গিয়েছে তনবীর ও রিয়াজুল বহু বছর আগেই ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পেরিয়ে এদেশে ঢুকেছিল। দু'জনেই হায়দরাবাদে শ্রমিকের কাজ করত। আর সেই শ্রমিক সেজে থাকার আড়ালেই চলত জঙ্গি কার্যকলাপ। তেলেঙ্গানা থেকে শুরু করে বেঙ্গালুরু-রাঁচি-পাটনা-তেও যাতায়াত করেছিল তনবীর ও রিয়াজুল। এই সব স্থানে তারা কোনও রেইকি করেছিল না কারোর সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল তা জানার চেষ্টা চালাচ্ছে এসটিএফ।
জেরায় তনবীর ও রিয়াজুল নাকি স্বীকার করেছে যে তারা ভারতে আনসারুল্লার সংগঠন তৈরির চেষ্টা করছিল। এমনকী মাঝখানে বাংলাদেশের এক মুক্তমনা ব্লগার ফারুক সাদিককেও হত্যার পরিকল্পনা এঁটেছিল। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে কম করেও ৬ জন মুক্তমনা ব্লগার খুন হয়েছেন। আর প্রতি ক্ষেত্রেই নাম জড়িয়েছিল আনসারুল্লা জঙ্গিদের। এসটিএফ সূত্রে খবর, তনবীর বাংলাদেশে থাকাকালীনই আনসারুল্লার অন্যতম শীর্ষনেতা হিসাবে কাজ করেছে। এমনকী, ভারতে আনসারুল্লা জঙ্গিদের কাজ-কর্মের দায়িত্বও মূলত তার কাঁধে।

তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, আনসারুল্লা জঙ্গি তনবীর ও রিয়াজুল কলকাতায় এমনকিছু রাসায়নিকের খোঁজ করেছিল যেগুলি বিস্ফোরক তৈরিতে কাজে লাগে। এসটিএফ ইতিমধ্যেই এইসব দোকানের খোঁজ পেয়েছে যেখানে তনবীর ও রিয়াজুল গিয়েছিল। কিন্তু, কলকাতায় এসে তাদের দেশি পিস্তলের দরকার কেন পড়ল তার কোনও সদুত্তর পাওয়া যায়নি। জানা গিয়েছে, এই দেশি পিস্তলের খোঁজেই বসিরহাটের বেআইনি অস্ত্র ব্যবসায়ী মনতোষ দে-র সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়। তনবীররা কলকাতার বুকেই কোনও নাশকতার জন্য এই দেশি পিস্তল জোগাড়ের চেষ্টায় ছিল কি না তা জানার চেষ্টা করছে এসটিএফ। ইতিমধ্যেই তদন্তের স্বার্থে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে। সূত্রের খবর তনবীর ও রিয়াজুলকে এনআইএ-র আধিকারিকরাও জেরা করতে পারে। জেরা করা হতে পারে বসিরহাটের বেআইনি অস্ত্র বিক্রেতা মনতোষ দে-কেও।












Click it and Unblock the Notifications