করোনা ভাইরাস: টিকা নেবার পরও লোকে সংক্রমিত হচ্ছে কেন?

করোনাভাইরাসে গুরুতর অসুস্থ হওয়া ঠেকাতে টিকার কার্যকারিতা প্রমাণিত
Getty Images
করোনাভাইরাসে গুরুতর অসুস্থ হওয়া ঠেকাতে টিকার কার্যকারিতা প্রমাণিত

সারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে মানুষকে করোনাভাইরাসের টিকা দেয়া হচ্ছে। কিন্তু তার পরও দেখা যাচ্ছে যে টিকা-নেয়া লোকেরাও আবার ভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছে।

সারা পৃথিবীতে অনেক দেশেই - যেগুলোতে ব্যাপক সংখ্যায় মানুষকে টিকা দেয়া হয়েছে - সেখানেও নতুন করে করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঢেউ দেখা যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল এবং এরকম আরো অনেক দেশে ইদানীং রেকর্ড পরিমাণ করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হচ্ছে।

এর একটা কারণ: ডেল্টা এবং অমিক্রনের মত অতিসংক্রামক করোনাভাইরাসের ধরন।

কেন এভাবে টিকা নেবার পরও সংক্রমণ ঘটছে?

অনেকের মনে হতে পারে যে টিকায় হয়তো কোন কাজ হচ্ছে না। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা ব্যাপারটা বাখ্যা করে বলছেন - কেন কোভিড-১৯এর টিকা নেয়া অত্যন্ত জরুরি।

কোভিড ১৯ টিকা
Getty Images
কোভিড ১৯ টিকা

এসব দেশে বিজ্ঞানী, ডাক্তার এবং পেশাদার স্বাস্থ্যসেবাপ্রদানকারীরা এখনো বিভিন্ন টিকার ওপর নির্ভরতা কমাননি।

এসব টিকা সারা বিশ্বে পরীক্ষিত এবং অনুমোদিত হয়েছে - এবং এটা প্রমাণিত হয়েছে যে এগুলো সংক্রমণের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে পারে।

এখানে আমরা বিশ্লেষণ করে দেখবো কিভাবে এসব টিকা মহামারিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভুমিকা রাখছে।

মিথ্যা ও ভুল বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মত দেশে সংক্রমণ বাড়তে থাকায় সামাজিক মাধ্যমে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন করে আলোচনা।

কিছু দেশে কর্তৃপক্ষ টিকা নেয়াকে উৎসাহিত করতে যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তার সমালোচনা করছেন অনেক সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী। অন্য অনেকে আবার টিকার সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে কথা বলছেন।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্তদের দেহে যেসব উপসর্গ দেখা দেয়

এবছর বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ কোন পথে যেতে পারে

অবিশ্বাস্য গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে অমিক্রন - বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

ইউরোপ-আমেরিকায় অমিক্রনের ঢেউ, রেকর্ড সংখ্যায় সংক্রমণ

করোনাভাইরাস
Getty Images
করোনাভাইরাস

এখন পর্যন্ত প্রধান যেসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে সেগুলো একান্তই মৃদু এবং কয়েকদিনের মধ্যেই এগুলো সেরে যাচ্ছে। এর মধ্যে আছে, টিকার জায়গায় ব্যথা বা লাল হয়ে যাওয়া, জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, মাংসপেশীর ব্যথা, শীতশীত লাগা বা বমির ভাব।

এর চেয়ে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া যেমন এ্যানফাইলেক্সিস, থ্রম্বোসিস (রক্ত জমাট বাঁধা), পেরিকার্ডাইটিস এবং মায়োকার্ডাইটিস (হৃদপিন্ডের প্রদাহ) - এগুলোকে অতি বিরল বলেই মনে করছে বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। তারা বলছেন, টিকা নেয়ার ফলে আপনি যে সুরক্ষা পাবেন তা এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকির চাইতে অনেক বেশি।

বিবিসি এ নিয়ে সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ রেনাটো কেফুরির সাথে কথা বলেছে।

তার কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল - এখন প্রচলিত টিকাগুলোর কার্যকারিতা এবং টিকা নেয়া লোকেরাও কেন ভাইরাসে সংক্রমিত হতে পারেন এবং রোগ ছড়াতে পারেন - সে সম্পর্কে।

রেনাটো কেফুরি বলছেন, প্রথম যে করোনাভাইরাস-রোধী টিকাগুলো বাজারে এসেছিল - যেমন ফাইজার বা এ্যাস্ট্রাজেনেকা ইত্যাদি - এগুলোর লক্ষ্য ছিল কোভিড-১৯এ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমানো, যে পর্যায়ে আক্রান্তদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ও মারা যাবার সম্ভাবনা থাকে।

"আসলে এই টিকাগুলো কোভিডের অধিকতর বিপজ্জনক ধরনগুলোর বিরুদ্ধে অনেক ভালোভাবে সুরক্ষা দিতে পারে - অপেক্ষাকৃত মৃদু বা নিরীহ ধরনগুলোর তুলনায় যেগুলোতে অনেক সময় কোন উপসর্গও থাকে না" - ব্রাজিলের টিকাদান সোসাইটির পরিচালক মি. কেফুরি বলছিলেন - "কোভিড যত গুরুতর হবে টিকার কার্যকারিতাও ততই বেশি হবে।"

অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের জন্ম হলো কীভাবে

অমিক্রন ঢেউএর জন্য সব দেশকে প্রস্তুত থাকতে বলেছে ডাব্লিউএইচও

করোনার অমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট কতটা বিপজ্জনক

অমিক্রন
Getty Images
অমিক্রন

প্রকৃতপক্ষেই এই টিকাদান কর্মসূচির লক্ষ্য কখনোই সংক্রমণ পুরোপুরি প্রতিরোধের জন্য ছিল না। আসল লক্ষ্য ছিল - করোনাভাইরাস শরীরে ঢুকে পড়লেও তার প্রভাব যেন কম ক্ষতিকর হয়, তা নিশ্চিত করা।

পৃথিবীর বহু দেশেই অনেক দশক ধরে ফ্লু-র টিকা দেয়া হচ্ছে । এর পেছনে যুক্তিটাও হুবহু এক।

ফ্লুর টিকা প্রতি বছরই দেয়া হয়। এর লক্ষ্য কিন্তু ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের সংক্রমণ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা নয়। বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে - এই ভাইরাসের কারণে যাদের প্রায়ই সবচেয়ে গুরুতর জটিলতা দেখা দেয় - যেমন শিশু, গর্ভবতী নারী এবং বয়স্ক মানুষেরা - তাদের আক্রান্ত হওয়া ঠেকানো।

এর বৃহত্তর তাৎপর্য হলো - কোভিডে গুরুতর অসুস্থতার বিরুদ্ধে এ সুরক্ষা একটা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। কারণ শ্বাসতন্ত্রের রোগে গুরুতর অসুস্থ রোগীর সংখ্যা কমানো মানেই হচ্ছে হাসপাতালে জরুরি চিকিৎসাপ্রার্থীর ভিড় কমে যাওয়া।

এর ফলে ডাক্তার-নার্সদের পক্ষে প্রতিটি রোগীর যথাযথ চিকিৎসা ও যত্ন নিশ্চিত করার সময় ও সক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়।

করোনাভাইরাসের টিকা ঠিক এ ভুমিকাটাই খুব ভালোভাবে পালন করছে।

ইরানে কোভিড রোগী
Getty Images
ইরানে কোভিড রোগী

যেমন কমনওয়েলথে ফান্ডের এক জরিপ অনুযায়ী - শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই করোনাভাইরাসের টিকার কারণে নভেম্বর ২০২১ পর্যন্ত ১ কোটি ৩ লক্ষ মানুষের হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ঠেকানো গিয়েছে এবং মোট ১১ লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল মিলে এরকম আরেকটি হিসেব করেছে।

এতে দেখা যাচ্ছে, করোনাভাইরাসের টিকা দেয়া শুরু হবার পর থেকে ইউরোপের ৩৩টি দেশে ৬০ বছরের বেশি লোকদের ক্ষেত্রে ৪৭০,০০০ জনের প্রাণ রক্ষা সম্ভব হয়েছে।

তাহলে বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যাটা কি?

এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই যে করোনাভাইরাসে পুনঃসংক্রমিত হওয়া, এবং টিকা নেয়া লোকদের ভাইরাস-পজিটিভ হওয়ার পরিমাণ বেড়েছে।

তিনটি কার্যকারণ দিয়ে এটাকে ব্যাখ্যা করা যায়।

প্রথম কারণটা খুবই সহজ। বড়দিন এবং নতুন বছর উদযাপন করার জন্য মানুষের মধ্যে পরস্পরের সংস্পর্শে আসা বেড়েছে। ফলে করোনাভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনাও বেড়ে গেছে।

টিকা
Getty Images
টিকা

দ্বিতীয় কারণ, পৃথিবীর অনেক দেশেই ভ্যাকসিন দেয়া শুরু করার পর মোটামুটি এক বছর পার হয়েছে। এখন বিশেষজ্ঞরা এটা দেখতে পাচ্ছেন যে টিকা নেবার পরও কোভিডের বিরুদ্ধে সুরক্ষা চিরস্থায়ী হয় না।"

"আমরা দেখেছি যে যত সময় যায়, ততই সুরক্ষার মাত্রা কমে আসে। এই মাত্রা কতটা কমবে - তা ভ্যাকসিনের টাইপ এবং যিনি এটা নিচ্ছেন তার বয়সের ওপর নির্ভর করে," বলেন মি. কেফুরি।

"এর ফলে আমরা তৃতীয় ডোজের প্রয়োজনীয়তা দেখতে পাই। প্রথমতঃ যারা বয়স্ক এবং যাদের রোগপ্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে গেছে তাদের জন্য এবং তার পর দেশের সকল প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য।"

তৃতীয় কারণটি হচ্ছে অমিক্রনের আবির্ভাব। করোনাভাইরাসের এই ধরনটি অনেক বেশি সহজে ছড়াতে পারে এবং এর বিরুদ্ধে কোভিডের টিকা বা আগেকার সংক্রমণ থেকে পাওয়া সুরক্ষা দৃশ্যতঃ কম কার্যকর।

কেফুরি বলছেন, "দেখা যাচ্ছে, টিকা-নেয়া লোকেরা যে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছেন তা আসলে খুবই স্বাভাবিক এবং আমাদের এ পরিস্থিতি মেনে নিয়েই চলতে হবে।"

অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের খবরে বহু দেশের বিমনাবন্দরে জারি হয়েছে নতুন সতর্কতা।
Getty Images
অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টের খবরে বহু দেশের বিমনাবন্দরে জারি হয়েছে নতুন সতর্কতা।

"সৌভাগ্যক্রমে, এখন ক্রমবর্ধমান কোভিড কেসগুলো বাড়ছে - তাতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ও মৃত্যুর হার কম - বিশেষ করে তাদের মধ্যে যারা ইতোমধ্যেই টিকা নিয়েছেন" - বলেন তিনি।

ডা. কেফুরির সিদ্ধান্ত, ভ্যাকসিন এখনো কোভিডের সবচেয়ে গুরুতর রূপের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়ে চলেছে।

নিউইয়র্ক শহরের স্বাস্থ্য সেবা চার্ট থেকে স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে যে - টিকার কার্যকারিতা কতখানি।

এতে দেখা যাচ্ছে টিকা নেয়া এবং না-নেয়াদের মধ্যে সংক্রমণ, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং মৃত্যুর অনুপাত অনেক অনেক কম।

এতে দেখা যায়, ডিসেম্বরের শুরুতে টিকা-না-নেয়া লোকদের মধ্যে সংক্রমণ, হাসপাতালে ভর্তি এবং মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুতগতিতে বেড়েছে। সে তুলনায় টিকা-নেয়া লোকদের মধ্যে এ হার অনেক স্থিতিশীল।

যুক্তরাষ্ট্রে জাতীয় পর্যায়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ দফতরের (সিডিসি) চালানো জরিপেও একই রকম তথ্য পাওয়া গেছে।

ব্রিটেনের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এজেন্সিও একই রকম সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।

করোনাভাইরাস
Getty Images
করোনাভাইরাস

তাদের এক নিবন্ধে ব্যবহৃত যুক্তরাজ্যের ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, যারা করোনাভাইরাসের তিনটি ডোজই নিয়েছেন - তাদের ক্ষেত্রে অমিক্রন ভ্যারিয়েন্টে সংক্রমিত হলে হাসপাতালে ভর্তি হবার সম্ভাবনা ৮১ শতাংশ কম।

এই এজেন্সির নিজস্ব বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিন ডোজ টিকা নেবার পরের কার্যকারিতা ৮৮ শতাংশ। তবে এ সুরক্ষা কতদিন স্থায়ী হয় এবং আগামী দিনগুলোতে আরো বুস্টার টিকা নিতে হবে কিনা - তা এখনো জানা যায়নি।

তবে ডা. কেফুরি বলছেন, এই সমস্ত তথ্যপ্রমাণ থেকে আসলে টিকা নেয়ার গুরুত্বই প্রমাণিত হচ্ছে - বিশেষ করে অমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট এবং নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে।

"কেউ যদি মনে করেন যে টিকা নেবার কোন দরকারই নেই, কারণ সবাই শেষ পর্যন্ত অসুস্থ হবেই - তাহলে তা হবে চরম ভুল," বলছেন তিনি।

"এই টিকা করোনাভাইরাসকে একটি অপেক্ষাকৃত সরল রোগে পরিণত করতে সফল হচ্ছে - যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ঘরে থেকেই চিকিৎসা করা সম্ভব।"

এই বিশেষজ্ঞ বলছেন, "এই মহামারি থেকে আমরা বেরিয়ে আসতে পারি শুধু একভাবে - সেটা হলো শিশুরাসহ দেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীকে উচ্চহারে টিকা দেয়া এবং মাস্ক পরা, হাত ধোয়া, ও মানুষের ভিড় ঠেকানোর মত নিয়মগুলো মেনে চলা।"

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+