যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউরোপের সামরিক জোট নেটো কি আদৌ টিকবে?

সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঠেকাতে তৈরি হয়েছিল নেটো জোট। এখনো রাশিয়ার হুমকি মোকাবেলায় এই সামরিক জোট খুবই জরুরী বলে মনে করেন অনেকে। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি নেটোকে ভাঙ্গনের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন?

রাশিয়ার হুমকি মোকাবেলায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রয়েছে হাজার হাজার মার্কিন সেনা
Getty Images
রাশিয়ার হুমকি মোকাবেলায় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রয়েছে হাজার হাজার মার্কিন সেনা

নেটো জোটের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে এসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার মিত্রদের সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন, তাতে জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে আবারও শংকা তৈরি হয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জোটের অন্যতম সদস্য দেশ জার্মানির তীব্র সমালোচনা করে বলেন, জার্মানিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করে রাশিয়া। তিনি বলেন, গ্যাস চুক্তি করে জার্মানি রাশিয়াকে শত শত কোটি ডলার দিচ্ছে, অথচ নেটোর সদস্য হিসেবে প্রতিরক্ষা খাতে জার্মানির যা খরচ করার কথা, তার অর্ধেকও তারা করে না।

যেভাবে ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রদের ফারাক বেড়েই চলেছে, তাতে এই প্রতিরক্ষা জোট কি আদৌ টিকবে? বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা জোনাথান মার্কাসের বিশ্লেষণ:

নেটো জোট কিসের জন্য

মূলত তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের যে কোন ধরনের আক্রমণ প্রতিরোধের জন্যই গঠন করা হয়েছিল নেটো জোট। কিন্তু স্নায়ু যুদ্ধ যখন থেমে গেল, নেটো জোটের উদ্দেশ্যও কিছুটা বদলে গেল। ইউরোপে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার জন্য নেটো জোটে অন্তর্ভুক্ত করা হলো নতুন অনেক দেশকে। অন্য অনেক দেশের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তোলা হলো।

এই পর্যায়ে নেটো জোট কোন কোন দেশের যুদ্ধ-বিগ্রহ বা গণহত্যা থামাতে সরাসরি হস্তক্ষেপও করলো। যেমন বলকান যুদ্ধ।

তবে নেটো জোটকে কেবলমাত্র একটি সামরিক প্রতিরক্ষা জোট ভাবলে ভুল করা হবে। এটি আসলে তার চেয়ে বেশি কিছু।

১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা দেশগুলো বাকী বিশ্বকে যেসব আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে, নেটো ছিল তার অন্যতম। আটলান্টিকের দু্ই তীরের দেশগুলোর অভিনা্ন মূল্যবোধ এবং ঐক্যের প্রতীক আসলে এটি। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর এটির সেই গুরুত্ব যেন মারাত্মকভাবে খর্ব হতে চলেছে।

আটলান্টিকের বন্ধন কি ছিন্ন হতে চলেছে?

বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নেটো জোটের বিভিন্ন সদস্য দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে, তা বুঝি নেটো জোটে কে কী পরিমাণ অর্থ দেয় তা নিয়ে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নেটো জোটকে কতটা গুরুত্ব দেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
Getty Images
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নেটো জোটকে কতটা গুরুত্ব দেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

এটা সত্যি যে, নেটোর যে বিশাল ব্যয়ভার, সেটা কে কতটা বহন করবে তা নিয়ে বহু বছর ধরেই বিতর্ক চলছে।

এটি নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পই প্রথম প্রশ্ন তুলছেন, ব্যাপারটা এমন নয়।

কিন্তু যে ভঙ্গীতে এবং কায়দায় মিস্টার ট্রাম্প এটির সমাধান করতে চাইছেন, সেটা একেবারেই নতুন।

নেটোর সদস্য দেশগুলো একমত হয়েছিল যে, ২০২৪ সাল নাগাদ প্রত্যেক দেশ তাদের জিডিপির মোট দুই শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করবে।

প্রতিরক্ষা খাতে অনেক দেশই এরপর তাদের ব্যয় বাড়াচ্ছে। কিন্তু অনেক দেশই তাদের টার্গেট থেকে বেশ পেছনে আছে।

আরও পড়ুন: পশ্চিমা জোট নেটোর সাথে রাশিয়ার বিরোধের কারণ কী?

নেটোর জন্য রাশিয়া হুমকি নয়: পুতিন

নেটোর ইতিহাসে সবচাইতে বড় যৌথ সামরিক মহড়া

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দৃষ্টিতে এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পিছিয়ে আছে জার্মানি।

এ মাসের শুরুতে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেলকে উদ্দেশ্য করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছিলেন, "আমি জানিনা জার্মানিকে সুরক্ষা দিয়ে আমেরিকা নিজে কতটা সুরক্ষা পায়।"

জার্মানির সঙ্গে রাশিয়ার গ্যাস চুক্তির কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেছিলেন, "জার্মানি রাশিয়াকে শত শত কোটি ডলার দেয়। আর আমরা কিনা (নেটো জোটের) পুরো খরচ টানছি।"

যুক্তরাষ্ট্র নিজেই যখন নেটো জোটের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, তখন তা ওয়াশিংটনের অনেক ইউরোপীয় মিত্রকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

পুতিনের রাশিয়াকে নতুন হুমকি বলে বিবেচনা করছে ইউরোপের অনেক দেশ
Getty Images
পুতিনের রাশিয়াকে নতুন হুমকি বলে বিবেচনা করছে ইউরোপের অনেক দেশ

কিন্তু রাশিয়া আসলে কত বড় হুমকি?

নেটো জোট বিগত বছরগুলিতে যে ধরনের কৌশলগত হুমকির মোকাবেলা করেছে, তা এখন বদলে যাচ্ছে।

আগের হুমকির ধরণটা ছিল স্পষ্ট। কিন্তু এখন তা অনেক বেশি জটিল।

রাশিয়ার পুনরুত্থান থেকে শুরু করে সাইবার যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ থেকে ব্যাপক অভিবাসন- এরকম নানা ধরণের হুমকির মুখে নেটো।

এমনকি রাশিয়ার হুমকিও একেবারেই ভিন্ন প্রকৃতির। এটি সেই পুরনো আমলের সোভিয়েত ইউনিয়ন নয়।

রাশিয়ার বিশাল সেনাবাহিনী ট্যাংক নিয়ে পশ্চিমের দেশগুলোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে-দৃশ্যটা ঠিক এরকম নয়। বরং এই হুমকি সাইবার হামলা থেকে শুরু করে, প্রচার যুদ্ধ, যার মাধ্যমে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা যায়।

পশ্চিমা দেশগুলো স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করে, রাশিয়া দরকার হলে কাউকে হত্যার জন্য আততায়ী পর্যন্ত পাঠাতে পারে। ২০০৬ সালে লন্ডনে আলেক্সান্ডার লিটভিনেনকো হত্যাকান্ড কিংবা এ বছর এক সাবেক রুশ গুপ্তচর সের্গেই স্ক্রিপাল এবং তার মেয়ের ওপর নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগের উদাহারণ টানছেন তারা।

রাশিয়া তুলনামূলকভাবে দুর্বল দেশ। কিন্তু দরকার হলে সামরিক শক্তি প্রয়োগে রাশিয়া পিছপা হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। জর্জিয়া এবং ইউক্রেনে গত কয়েক বছরে যা ঘটেছে, সেটা অন্তত তাই বলে।

আর নেটো যে নতুন নতুন দেশকে সদস্য করার মাধ্যমে তার সীমানা বাড়াচ্ছে, সেটা তো অবশ্যই রাশিয়াকে নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

ট্রাম্পের আমলে নেটো কি টিকবে?

পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে নেটোর সম্প্রসারণকে হুমকি বলে মনে করে রাশিয়া
Getty Images
পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে নেটোর সম্প্রসারণকে হুমকি বলে মনে করে রাশিয়া

ডোনাল্ড ট্রাম্প সবকিছুতে যেভাবে মুখের ওপর কথা বলেন, সেটা বিশ্বরাজনীতিতে একেবারেই নতুন।

যুক্তরাষ্ট্র এমন এক পরাশক্তি, যাদের সারা দুনিয়া জুড়ে নান ধরনের কৌশলগত স্বার্থ আচ্ছে।

অন্যদিকে রাশিয়ার দিক থেকে হুমকির ধরণটা এখন ভিন্ন। এই হুমকি আগের কায়দায় ব্যাপক সৈন্যসমাবেশ ঘটিয়ে মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।

ইউরোপ হয়তো নিজের প্রতিরক্ষায় আরও বেশি অর্থ খরচ করতে সক্ষম হবে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প মুখে যত কথাই বলুন, যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু এখন সামরিকভাবে ইউরোপে আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয়।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও নেটো জোটের একনিষ্ঠ সমর্থক। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী জেমস ম্যাটিস তাদের একজন।

কিন্তু আটলান্টিকের দুই তীরের এই মৈত্রীকে মিস্টার ট্রাম্প নিজে কতটা গুরুত্ব দেন?

অনেকেই বলছেন, তিনি এটাকে মোটেই গুরুত্ব দেন না।

নেটো জোট যে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা কি তিনি আদৌ বোঝেন?

উত্তরে অনেকেই বলবেন, মোটেই না।

নেটো জোটের এই শীর্ষ সম্মেলন শেষে মিস্টার ট্রাম্প যাবেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। এটি নিয়ে বিরাট ধাঁধাঁয় আছে নেটোর মিত্ররা।

সেখানে গিয়ে কি ছাড় দেবেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প? নেটোর ভেতর এই টানাপোড়েন থেকে মস্কো কি বার্তা পাবে?

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নেটো জোট যে টানাপোড়েনের মধ্যে পড়েছে, তাতে রীতিমত হাল ছেড়ে দিয়েছেন জোটের কূটনীতিকরা। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হয়ে হোয়াইট হাউসে ফিরে আসেন, তখন কী হবে?

কূটনীতিকদের আশংকা, নেটো জোট তখন হয়তো একেবারেই গুরুত্বহীন হয়ে পড়বে এবং আটলান্টিকের দুই তীরের মৈত্রী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে।

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+