বিশ্ব মধ্যস্থতাকারী হিসাবে উত্থান: ব্রিকস ও জি৭ দুইয়েরই স্বার্থের কথা ভেবে সমতা রাখছে ভারত
বিশ্বের রাজনীতিতে ভারত যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গা করে নিয়েছে ব্রিকস সামিটে ভারতের ভূমিকা তারই প্রমাণ। পাশ্চাত্যের দেশগুলির সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার পরও চিন এবং রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে ভারত যেভাবে সু-কৌশলে সম্পর্ক স্থাপন করেছে তা খুবই উল্লেখযোগ্য। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এইসব দেশগুলির সঙ্গে ভারত আলাপ আলোচনা করলেও পশ্চিমের সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয় না সেভাবে। আসলে ভারত বিশ্বের কূটনীতিতে একটি সেতুর ভূমিকায় থাকে সবসময়। যা ভারতের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলেছে বিশ্বের মঞ্চে।
সম্প্রতি রাশিয়ার কাজানে যে ব্রিকস সম্মেলন হয়ে গেল, সেখানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং'য়ের মুখোমুখি হয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। ভারত যে বিশ্ব শান্তির পথে যেতে চায় সে কথাই এবার বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে ওই সম্মেলনে। ফলে বিশ্বের দরবারে ভারতের গুরুত্ব বেড়েছে অনেকটা। গ্লোবাল পলিটিকাল এক্সপার্ট আইয়ান ব্রেমার ভারতের এই ভূমিকার উল্লেখযোগ্য ভাবে প্রশংসা করেছেন।

এই কাজান সফরে গিয়ে চিন-রাশিয়া বাদেও একাধিক রাষ্ট্রনেতার সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তবে তার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হলো চিনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ। কারণ বিগত চার বছর ধরে ভারত এবং চিনের সম্পর্কের যেভাবে অবনতি ঘটে, এবারের বৈঠকে সেই বরফ গলেছে বলেই মনে করছেন কূটনীতিকরা। পাশাপাশি চিনের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা লাগাতার ভারত চালিয়ে যাচ্ছে।
ভারত ও চিনের মধ্যে যে সামরিক সংঘাত চার বছর ধরে চলছে, তার সমাধান করার জন্য অন্তত ৩০ বার বৈঠক হয়েছে দুই দেশের মিলিটারি কমান্ডারদের মধ্যে। তারপরও সমস্যা সমাধান হয়নি। সম্পর্কের বরফ গলানোটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিকমহল। এদিকে রাশিয়া এবং ইউক্রেন উভয় দেশের সমর্থকরাই যুদ্ধ পরিস্থিতি সমাধানের জন্য দিল্লির দিকে তাকিয়ে আছে। নরেন্দ্র মোদী সম্ভবত একমাত্র রাষ্ট্রনেতা যিনি রাশিয়া এবং ইউক্রেন উভয় দেশের সমান সম্মান পেয়েছেন।
এবারের ব্রিকস সম্মেলনে গিয়ে নরেন্দ্র মোদী ইরানের মাসুদ পিজেশ কিয়ানের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। বিশ্ব শান্তি নিয়ে কথা বলেন সেখানে। এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওই বৈঠকে সন্ত্রাসবাদ নিয়ে বার্তা দিয়েছেন। যেসব দেশ পাকিস্তানকে সমর্থন করে তাদেরও কড়া সমালোচনা করেছেন তিনি।

বিশ্বের অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত কতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছে তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে এই ব্রিকস সম্মেলনে। এর ফলে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারত একটা বড় প্রভাব ফেলতে পারবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে পাশ্চাত্যের দেশ এবং রাশিয়ার সঙ্গে একইভাবে ভারত যে সুসম্পর্ক রেখে চলেছে তাতে ভবিষ্যতে ভারত আরও বড় ভূমিকা নিতে পারবে।
রাশিয়া ইউক্রেন সংঘাতের মাঝে অনেক দেশই তাদের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়ে ভাবনা চিন্তা করছে, আর ঠিক সেই রকম একটি সময়েই রাশিয়ায় সফর করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। যা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মত। এই সম্মেলনে সন্ত্রাস দমন ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সন্ত্রাস দমন করার জন্য সহযোগিতার আহ্বানও করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। এদিকে সম্প্রতি খালিস্তানি জঙ্গি হারদীপ সিং নিজ্জারের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কানাডার সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের কিছুটা অবনতি হয়েছে।

তার প্রভাব পড়েছে বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও। তবে কানাডায় বাদ দিয়ে জি সেভেন (G 7) দেশগুলির মধ্যে বাকিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে ভারত। তবে বিশ্বের যে কোন সংঘাতের পরিস্থিতির ক্ষেত্রে ভারত অত্যন্ত বুদ্ধি দিয়ে সবদিক বিচার করছে। গাজা কনফ্লিক্ট থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রেই শান্তির বার্তা দিয়ে চলেছে ভারত। ভারতের স্পষ্ট বক্তব্য হল, কথাবার্তা এবং আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সমস্যার সমাধান করতে হবে।
একদিকে প্যালেস্টাইনের প্রতি সমর্থন অন্যদিকে ইজরায়েলের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক, সবদিক যেভাবে বজায় রাখছে ভারত, তাতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্ব আরও বাড়ছে। তৈরি হচ্ছে ভরসার জায়গা। তবে ব্রিকস সামিট শেষে এটা বলতেই হয় যে, রাশিয়া এবং চিনের মতো দেশগুলির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও জি সেভেন দেশগুলির সঙ্গে যেভাবে সুসম্পর্ক অটুট রেখেছে ভারত তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
বলে রাখা প্রয়োজন, চলতি মাস অর্থাৎ অক্টোবরের ২২ থেকে ২৪ তারিখ পর্যন্ত রাশিয়ার কাজানে হয় এবারের ব্রিকস সামিট।












Click it and Unblock the Notifications