চা শ্রমিক: 'সাত সদস্যের পরিবার চালাতে হয় ১২০ টাকার মজুরীতে'

চা শ্রমিকদের ন্যুনতম দৈনিক মজুরী নির্ধারণ করে বিভিন্ন সুপারিশ রবিবার একটি গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে নিম্নতম মজুরী বোর্ড। তবে এই সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করেছে চা শ্রমিক সংগঠনগুলো।

বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬৭টি নিবন্ধিত চা বাগান ও টি এস্টেট রয়েছে বলে জানিয়েছে চা বোর্ড।
Getty Images
বর্তমানে বাংলাদেশে ১৬৭টি নিবন্ধিত চা বাগান ও টি এস্টেট রয়েছে বলে জানিয়েছে চা বোর্ড।

মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আলীনগর চা বাগানের শ্রমিক বিশ্বনাথ রবিদাশ। মা-বাবা, কাকা, নিজের স্ত্রী আর দুই ছেলে-মেয়ে। সব মিলিয়ে পরিবারের সদস্য সংখ্যা সাত জন।

চা শ্রমিক হিসেবে কাজ করে মি. রবিদাশ দৈনিক পান ১২০ টাকা। সপ্তাহে ৬ দিন কাজ করতে হয় তাকে। সপ্তাহ শেষে বিল পান ৬২০ টাকা। তার একার এই আয়েই পুরো পরিবারের ভরণ-পোষণ করতে হয় তাকে।

এত কম আয়ে কিভাবে চলে- এমন প্রশ্নের উত্তরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে মি. রবিদাশ বলেন, দৈনিক ১২০ টাকায় সংসার চালানো বেশ কঠিন।

"বর্তমানে যে দর(দ্রব্যমূল্য), ৪০ টাকা চালের কেজি, তিন বেলার খাবার কিভাবে যে জোটানো যায়! খুবই কষ্ট হয় আরকি" বলেন তিনি।

আক্ষেপের সুরে মি. রবিদাশ বলেন, "মুখ ফুটে কী আর বলি, আমার মতো আরো অনেকেই আছে। বললে, চোখের জল চলে আসে। অনেক কষ্টের মধ্যে বসবাস করি।"

তিনি জানান, ছেলেমেয়েদের পড়াশুনা আর অন্য খরচ যোগাতে হলে চা বাগানের বাইরে অন্য কাজের খোঁজে থাকতে হয়। এমন পরিস্থিতির জন্যও নিজের ভাগ্যকেই দোষারোপ করেন বিশ্বনাথ রবিদাশ।

তিনি বলেন, "কী করবো, বাগানের মধ্যেই জন্ম নিয়েছি, অনেক কষ্টে থাকতে হয়।"

নতুন দৈনিক বেতন

এই শ্রমিকদের ন্যুনতম দৈনিক মজুরী নির্ধারণ করে বিভিন্ন সুপারিশ রবিবার একটি গেজেটে প্রকাশ করেছে বাংলাদেশের নিম্নতম মজুরী বোর্ড।

এতে বলা হয়, বাগানের শ্রেণীবিভাগ ভেদে চা শ্রমিকদের দৈনিক বেতন হবে ১১৭ থেকে ১২০ টাকা করে, যার বিরোধিতা করছেন শ্রমিক নেতারা।

চা শ্রমিক নেতারা বলছেন, প্রতিবছর মজুরী বাড়ানোর নিয়ম থাকলেও খসড়া গেজেটে মজুরী তো বাড়েই-নি, উল্টো অনেক ক্ষেত্রে মজুরী কমেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিক পক্ষের দুর্বল অবস্থান ছাড়াও চা শ্রমিকদের ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থানও তাদের মজুরী নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

বোর্ডের সুপারিশে বাইরে বসবাসের সুযোগ, কম মূল্যে চাল বা আটা, বছরে দুটি উৎসব ভাতাসহ অন্য সুযোগ-সুবিধা থাকবে।

আরো পড়ুন:

বাগান থেকে চা তুলে কারখানার দিকে যাচ্ছেন চা শ্রমিকরা।
Getty Images
বাগান থেকে চা তুলে কারখানার দিকে যাচ্ছেন চা শ্রমিকরা।

ব্রিটিশ ভারতের বাংলাদেশ অংশে প্রথম বাণিজ্যিক-ভিত্তিতে চা চাষ শুরু হয় সিলেটের মালনীছড়া চা বাগানে ১৮৫৪ সালে।

বাংলাদেশ চা উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, দেশে চা বাগান রয়েছে ১৬৭টি। আর এসব বাগানে শ্রমিক রয়েছে এক লাখ ৪০ হাজারের মতো।

তাদেরই একজন জেসমিন আক্তার।

কম বেতনের কষ্ট

মৌলভীবাজারের রামনগর থানার ইটা চা বাগানে কাজ করেন জেসমিন আক্তার। স্বামীর নির্দিষ্ট কোন আয় নেই।

তিন ছেলে-মেয়ে আর শ্বশুর-শাশুড়ি মিলে পুরো পরিবারই নির্ভর করে তার একার আয়ের উপর।

জেসমিন আক্তার জানান, এতো কম আয়ে কখনো কখনো তিন বেলার আহার যোগাড় করতেই কষ্ট করতে হয় তার।

"কখনো খেতে হয়, কখনো না খেয়ে একটু থাকতে হয়। এর মধ্যে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাইতেছি, ওদেরওতো দিতে হয়, স্কুলের বেতন, কষ্ট হয় চলতে," বলেন তিনি।

মজুরী বৃদ্ধির দাবী

শ্রমিকদের পক্ষে মৌলভীবাজার জেলা চা শ্রমিক সংঘ খসড়া এই গেজেটে সই করা থেকে বিরত থাকার কথা জানিয়েছে।

তারা দাবি তুলেছেন, ১২০ টাকার পরিবর্তে দৈনিক ৩০০ টাকা করে মজুরী দিতে হবে। দুই মাসের বেতনের সমান বার্ষিক দুটি বোনাস দিতে হবে। বৈশাখের বোনাস হিসেবে দিতে হবে ১০ হাজার টাকা।

সংগঠনটির সভাপতি রাম ভজন কৈরি অভিযোগ করে বলেন, খসড়া গেজেটে শিক্ষানবিশ বলে একটি পদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু চা শিল্পে যারা কাজ করেন তারা পারিবারিক ভাবেই এই পেশার সাথে যুক্ত থাকেন।

তাই ছোট বেলা থেকেই চা শিল্পের সব কাজের সাথে পরিচয়ই শুধু থাকে না বরং প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকরা এতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

সে কারণে এই পেশায় শিক্ষানবিশ হওয়ার সুযোগ নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি।

শ্রমিক নেতারা দাবি করেছেন, খসড়া গেজেটে মজুরী তো বাড়েইনি, উল্টো কমেছে।
Getty Images
শ্রমিক নেতারা দাবি করেছেন, খসড়া গেজেটে মজুরী তো বাড়েইনি, উল্টো কমেছে।

মি. কৈরি অভিযোগ তোলেন, প্রতিবছর মজুরী বাড়ানোর নিয়ম থাকলেও খসড়া গেজেটে মজুরী তো বাড়েই-নি, উল্টো অনেক ক্ষেত্রে মজুরী কমেছে।

তার দাবি, খসড়ায় যে মজুরীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা গত আড়াই বছর ধরেই ভোগ করছেন তারা। ফলে এবছর কোন মজুরী বাড়েনি। বরং মালিক পক্ষের সাথে আড়াই বছর আগের করা চুক্তিই আবার নতুন করে তাদের সামনে আনা হয়েছে।

তার দাবি, ২০২০ সালের ৩১শে ডিসেম্বর ওই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।

মালিক পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণ

তিনি জানান, চা শ্রমিকরা তাদের সংগঠনের মাধ্যমে মালিক পক্ষের সাথে আলোচনার ভিত্তিতে প্রতি দুই বছর পর পর মজুরী বাড়িয়ে নতুন চুক্তি করে থাকেন।

চা শ্রমিকদের নেতা মি. কৈরি অভিযোগ করেন, বর্তমান মজুরী বোর্ড যে সুপারিশ দিয়েছে তা শ্রমিকদের স্বার্থে নয় বরং মালিক পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণ করছে।

কম মজুরীর বিষয়ে চা বাগান মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশীয় চা সংসদ- সিলেট শাখার চেয়ারম্যান জি এম শিবলি বলেন, শ্রমিকদের দৈনিক মজুরী কম হলেও তাদের অন্যান্য সুবিধা যেমন আবাসন, রেশন, চিকিৎসার মতো সুবিধা চা বাগানের মালিকরাই করে থাকেন যা টাকার অংকে পরিমাপ করা হয় না।

যার কারণে আপাত দৃষ্টিতে মজুরী কম মনে হয়।

মি. শিবলি বলেন, মজুরী ও সব সুযোগ সুবিধা ধরা মাসে তাদের বেতন ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকার মতোই হয়।

এদিকে, শ্রমিক সংগঠনগুলো বোর্ডের বিরুদ্ধে মালিক পক্ষের স্বার্থ সংরক্ষণের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা অস্বীকার করেছে মজুরী বোর্ড।

বোর্ড বলছেন, শ্রমিক ও মালিক পক্ষের সাথে এর আগে করা চুক্তি বিবেচনায় নিয়েই মজুরী নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

নিম্নতম মজুরী বোর্ডের সচিব রাইসা আফরোজ বলেন, খসড়া যে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে তা সংশোধনের জন্য ১৪ দিন সময় রয়েছে।

এই সময়ের মধ্যে যেকোন ধরণের অভিযোগ মজুরী বোর্ডকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চা শ্রমিকদের ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থানও তাদের মজুরী নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।
Getty Images
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চা শ্রমিকদের ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থানও তাদের মজুরী নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

কোন অভিযোগ পেলে তা ১৪ দিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বৈঠকে উপস্থাপন ও আলোচনা করা হবে এবং সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েই চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ করা হবে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শ্রমিক পক্ষের দুর্বল অবস্থান ছাড়াও চা শ্রমিকদের ধর্মীয় ও সামাজিক অবস্থানও তাদের মজুরী নির্ধারণে ভূমিকা রাখে।

চা বাগানের শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।

শ্রমিকদের দুর্বল অবস্থান

তিনি বলেন, চা শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর শক্ত অবস্থান না থাকা, মালিক পক্ষের সাথে দুর্বল সমঝোতা এবং মালিক পক্ষের শক্তিশালী অবস্থানের মতো নানা কারণে চা শ্রমিকদের মজুরীর বিষয়টি নিয়ে কোন স্থায়ী সমাধানে আসা সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, "মজুরী নির্ধারণের বিষয়টি পুরোটাই সমঝোতার একটি বিষয়। সেখানে সরকারের যে ভূমিকা শ্রমিক পক্ষ আশা করে তা তারা পায়না। নিজেরাও শক্তভাবে দাঁড়াতে পারে না।"

তিনি বলেন, ধর্মীয় ও গোষ্ঠী হিসেবেও স্থানীয়ভাবে চা শ্রমিকদের একটা দুর্বল অবস্থান রয়েছে। যা স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

"সব কিছু মিলিয়ে এর একটা দুর্বল রিফ্লেকশন আমরা চা শ্রমিকদের জীবন-জীবিকায় দেখি আমরা," মি. খন্দকার বলেন।

এদিকে চা শ্রমিক সংঘের সভাপতি রাম ভজন কৈরি জানান, মজুরী বোর্ডের কাছে খুব শিগগিরই নিজেদের দাবি-দাওয়া ও অভিযোগ লিখিত আকারে জানাবেন তারা।

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+