শুল্কের দেয়াল ভাঙল তাইওয়ান, ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তি, ৯৯% শুল্ক কমাতে সম্মতি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হল এক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে। ট্রাম্পের প্রশাসন বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, তাইওয়ান তাদের ৯৯ শতাংশ শুল্ক বাধা তুলে নিতে বা কমাতে রাজি হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) এই চুক্তিকে "ঐতিহাসিক অগ্রগতি" বলে উল্লেখ করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি শুধু শুল্ক হ্রাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের অর্থনৈতিক নির্ভরতার সম্পর্ক আরও গভীর হল। বিশেষত সেমিকন্ডাক্টর বা কম্পিউটার চিপ উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্র এখনো অনেকটাই নির্ভরশীল তাইওয়ানের ওপর। ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে তাইওয়ান থেকে চিপ রপ্তানির জেরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় ১২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে মার্কিন সেন্সাস ব্যুরোর তথ্য জানায়।

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে রফতানিকৃত তাইওয়ানের পণ্যে ১৫ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ হবে, যা মার্কিন সরকারের "মোস্ট ফেবারড ন্যাশন " হারের সমান। এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য বাণিজ্য অংশীদার যেমন জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রেও একই হার প্রযোজ্য।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার। অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় আমেরিকান ইনস্টিটিউট ইন তাইওয়ান ও তাপেই ইকোনমিক অ্যান্ড কালচারাল রিপ্রেসেনটিভ অফিস ইন দ্যা ইউনাইটেড স্টেটস এর তত্ত্বাবধানে। তাইওয়ানের উপ প্রধানমন্ত্রী লি চিউন চেং ও মন্ত্রী জেন নি ইয়াংও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, আগামী এপ্রিলে ট্রাম্পের সম্ভাব্য চিন সফরের আগে এই চুক্তি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার বার্তা দিচ্ছে। যদিও তাইওয়ান একটি স্বশাসিত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, চিন একে নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে ও প্রয়োজনে বলপ্রয়োগে সংযুক্ত করার হুমকিও দিয়েছে। বেইজিং বরাবরই তাদের কূটনৈতিক অংশীদার দেশগুলিকে তাইপের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক না রাখার নির্দেশ দিয়ে এসেছে।
চুক্তির অংশ হিসেবে তাইওয়ান যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে, বিশেষ করে কম্পিউটার চিপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও জ্বালানি খাতে। পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়িক সংস্থাগুলিকে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগে সহায়তা করতে আরও ২৫০ বিলিয়ন ডলারের ঋণ গ্যারান্টির প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে তাইপে।
এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গাড়ি, ওষুধ ও খাদ্যপণ্য তাইওয়ানের বাজারে আরও সহজে প্রবেশ করতে পারবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল তাইওয়ানের সংস্থাগুলি যুক্তরাষ্ট্রেই চিপ উৎপাদনে বিনিয়োগ করবে, যা ভবিষ্যতে বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এর ফলেই যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত ৩২ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে।
মার্কিন বাণিজ্য দপ্তরের মতে, এই চুক্তির মাধ্যমে আমেরিকায় "বিশ্বমানের" শিল্পপার্ক গড়ে তোলা হবে, যেখানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন বাড়ানো হবে। বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এটি আমেরিকার সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে দেশে ফিরিয়ে আনার এক বড় পদক্ষেপ।
সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী হিসেবে উঠে আসছে তাইওয়ানের চিপ নির্মাতা সংস্থা টিএসএমসি। তারা ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে ১৬৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট ও একটি বৃহৎ গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র। মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্ট নিবিদিয়া ও এএমডি এর মতো সংস্থাগুলি উন্নতমানের চিপ উৎপাদনের জন্য অনেকাংশেই টিএসএমসি এর ওপর নির্ভরশীল।
এই চুক্তি কেবল শুল্ক হ্রাস নয়, বরং প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও ভূরাজনৈতিক সমীকরণের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে।












Click it and Unblock the Notifications