শ্রীলংকা : সরকার পতনের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের পেছনে গভীর যেসব বিভেদ
"দেখুন এখানে মুসলিমরা রয়েছে, হিন্দুরা রয়েছে, ক্যাথলিকরা রয়েছে। তাদের সবার শরীরে এক রক্ত। এটাই প্রকৃত শ্রীলংকা।"
রাজধানী কলম্বোর সাগর তীরে গল ফেস গ্রিন চত্বরের দিকে হাত দেখিয়ে বললেন লাকশান ওয়াত্তুহেওয়া। বিশাল সবুজ ঐ চত্বরে সেসময় কয়েক হাজার মানুষের বিক্ষোভ-সমাবেশ চলছিল।
মি. ওয়াত্তুহেওয়ার আশা - নজিরবিহীন অর্থনৈতিক দুর্দশার জেরে যে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ শুরু হয়েছে তাতে শ্রীলংকায় কয়েক দশকে ধরে চলা ধর্মীয় এবং জাতিগত বিভেদ, বৈষম্য, সহিংসতা দূর হওয়ার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
পাশে দাঁড়ানো একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু মি. ওয়াত্তুহেওয়ার কথার সাথে একমত হয়ে মাথা নাড়লেন। "মানুষ সম্প্রদায় এবং ধর্ম বিভেদ ভুলে আন্দোলনে যোগ দিচ্ছে। শ্রীলংকা এখন এক এবং ঐক্যবদ্ধ দেশ।"
এই দুজনই শ্রীলংকার সংখ্যাগরিষ্ঠ বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ যারা এ দেশের জনসংখ্যার ৭৫ শতাংশ। বাকি ২৫ শতাংশ হচ্ছে মুসলিম, তামিল হিন্দু এবং খ্রিষ্টান।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে পুরো শ্রীলংকা জুড়ে মানুষজন রাস্তায় নেমে একটি স্লোগানই দিচ্ছে: "গোটা বাড়ি চলে যাও।" গোটা হচ্ছেন গোটাবায়া রাজাপাক্সা, শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট।
২০১৯ সালে ইস্টারের সময় ইসলামি একটি জঙ্গি সংগঠনের সন্ত্রাসী হামলার পর মাথাচাড়া দেওয়া কট্টর সিংহলি জাতীয়তাবাদী চেতনার ওপর ভর করে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে নির্বাচনে জিতেছিলেন তিনি।
কিন্তু এখন তার সমর্থন তলানিতে ঠেকেছে। যারা তিনবছর আগে তাকে ভোট দিয়েছিলেন, কঠিন অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে তারাও এখন তার পদত্যাগের জন্য মরিয়া।
অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ছাড়াও, রাজাপাক্সা সরকারের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতা ও বর্ণবাদের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।
কতটা উদ্বেগে পড়েছেন শ্রীলঙ্কার মুসলিমরা
সরকার-বিরোধী বিক্ষোভে উত্তাল কলম্বো, রাজাপাক্সার পদত্যাগ দাবি
শ্রীলংকায় তুমুল বিক্ষোভের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালো সরকার
সমালোচকরা বলছেন মি রাজাপাক্সা তার রাজনৈতিক স্বার্থে শ্রীলংকার দীর্ঘদিন ধরে চলা ধর্মীয় ও জাতিগত বিভেদ এবং উত্তেজনাকে আরো উস্কে দিয়েছেন। তিনি নিজের মুখেই বলেছিলেন, "আমি জানতাম, শুধু সিংহলিদের ভোটেই আমি এই নির্বাচন জিততে পারি।"
সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার রাজনীতি শ্রীলংকায় নতুন কিছু নয়। ঐতিহাসিকভাবে এই রাজনীতির প্রধান টার্গেট হয়েছে তামিল হিন্দু সম্প্রদায়।
শ্রীলংকায় ২০০৯ সালে যখন তামিল টাইগার বা এলটিটিই'র কয়েক দশকের সশস্ত্র বিদ্রোহ নৃশংসভাবে দমন করা হয়, তখন গোটাবায়া রাজাপাক্সা ছিলেন দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী।
সিংহলি জনগোষ্ঠীর অনেকেই সেসময় তাকে জাতির নায়ক বলে বন্দনা করেছে। যদিও যুদ্ধের সময় তার বিরুদ্ধে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু অভিযোগ উঠেছে।
তার সমালোচকরা বলেন, বিদ্রোহ দমনের পরও তিনি দেশের সংখ্যালঘু তামিল সম্প্রদায়কে আস্থায় নেয়ার কোনো চেষ্টা করেননি। বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতীয়তাবাদ এবং অহংকে উসকে দিয়েছেন তাতে তামিলরা নিজেদেরকে দ্বিতীয়-শ্রেণীর নাগরিক হিসাবে মনে করতে শুরু করে।
তারপর ২০১৯ সালে ইস্টারের সময় সন্ত্রাসী হামলার পর মুসলিম জনগোষ্ঠীও সিংহলি জাতীয়তাবাদের রোষানলে পড়ে যায়। দুর্বিসহ হয়ে পড়ে তাদের জীবন।
"মুসলিমদের বাড়িঘর, জীবিকা টার্গেট করে ব্যাপকহারে হামলা হয়েছে। মুসলিমদের পক্ষে মোৗলিক অধিকার নিয়ে টিকে থাকা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়," বলেন শিরিন সারুর, সুপরিচিত মুসলিম অধিকার আন্দোলনকারী।
সিংহলি বৌদ্ধ নেতারা মুসলমানদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বয়কটের ডাক দিয়েছেন। প্রকাশ্যে মুসলিমদের ওপর হামলার উস্কানি দেয়া হয়েছে এবং অনেক হামলা হয়েছে।
"এ ছাড়াও মুসলিম বিদ্বেষ যে এখন কতটা প্রাতিষ্ঠানিক তা কোভিড প্যানডেমিকের সময় নেওয়া সরকারের নীতিতে প্রকাশ হয়ে পড়ে", বলছেন শিরিন সারুর।
"মরদেহ পোড়ানো মুসলিম ধর্মে নিষিদ্ধ জেনেও জবরদস্তি করে কোভিডে মৃত মুসলিমদেরও দাহ করা হয়েছে। "
ফলে, কলম্বোর গল ফেস গ্রিনের সমাবেশে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী এবং সম্প্রদায়ের লোকজনের যে উপস্থিতি চোখে পড়েছে তা প্রেসিডেন্ট রাজাপাক্সার বিভেদের রাজনীতি প্রত্যাখ্যানের একটি প্রতিফলনও বটে।
কিন্তু অনেক বিশ্লেষক সতর্ক করছেন যে ব্যাপারটি অত সোজাসাপ্টা নয়।
"কোনো সন্দেহ নেই যে ব্যতিক্রমী একটি সময়ের ভেতরে দিয়ে যাচ্ছে শ্রীলংকা," বলেন কলম্বোতে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি অল্টারনেটিভসের সিনিয়র গবেষক ভবানি ফনসেকা।
"কিন্তু এখন যা দেখা যাচ্ছে তা যে সমাজে একটি সত্যিকারের একটি অগ্রগতির সূচনা করবে সে কথা এখনই বলা যাবেনা। কিছুদিন আগেও এই সরকারের যারা কট্টর সমর্থক ছিলেন তাদের অনেকেই এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। এটা নিয়ে সংখ্যালঘুরা নিশ্চিতভাবে কিছুটা সন্দিহান।"
রাজধানী কলম্বোর মত কসমোপলিটান নগরীতে সরকার বিরোধী এই বিক্ষোভ এখনও শান্তিপূর্ণভাবেই হচ্ছে। অনেকসময় তাতে উৎসবের ছোঁয়া।
কিন্তু তামিল অধ্যুষিত উত্তর এবং পূর্বে বিক্ষোভের চিত্র অনেকটাই ভিন্ন। ঐ সব এলাকায় সরকার বিরোধী মনোভাব আরো অনেক তীব্র হলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো বিক্ষোভ সমাবেশ দেখা যাচ্ছেনা।
তামিল অধিকার কর্মীরা বলছেন ঐ অঞ্চলের মানুষজন ভয় পাচ্ছেন কলম্বোতে নিরাপত্তা বাহিনী এসব সরকার বিরোধী সমাবেশ নিয়ে যতটা সংযম দেখাচ্ছে, তামিলদের এলাকায় তা হয়ত দেখাবে না।
"এখানে কোনো বিক্ষোভ আয়োজন করলেই নিরাপত্তা বাহিনী সবসময় কঠোর হাতে তা দমন করে," বলেন উত্তরাঞ্চলীয় জাফনায় একজন তামিল অধিকার কর্মী আনুশানি আলাগারাজা।
"বিক্ষোভের বেলাতেও সবসময় বৈষম্য হয়। নির্ভর করে কে বা কারা এই বিক্ষোভ করছে, কোথায় করছে।"
এখন পর্যন্ত সরকার বিরোধী বিক্ষোভে একজন মারা গেছে। এটি ঘটেছে শ্রীলংকার মধ্যাঞ্চলীয় ছোটো শহর রামবুক্কানায়। বিক্ষোভে পুলিশ গুলি চালালে ১৪ জন জখম হয় এবং একজন সিংহলি বৌদ্ধ মারা যায়।
আলাগারাজা বলেন, এই ধরনের ট্রাজেডি দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর চোখ খুলে দিতে পারে, তারা হয়ত এখন বুঝতে পারবে দশকের পর দশক ধরে সংখ্যালঘুদের কতটা অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে।
গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও বহু তামিল এখনও নিখোঁজ। কিন্তু শ্রীলংকার একের পর এক সরকার যুদ্ধের সময় ঘটা যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ তদন্ত করার চেষ্টায় বাধা দিয়েছে।
নিহত তামিল যোদ্ধাদের স্মরণে কোনো অনুষ্ঠান নিষিদ্ধ। এমন আয়োজন জবরদস্তি করে বানচাল করা হয়। এমন অনুষ্ঠান আয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট তামিল রাজনীতিকদের আটকও করা হয়েছে। যেমন, গত বছর জাফনার মেয়রকে আটক করা হয়।
"এমন অবস্থায় আমরা যদি সুবিচার এবং জবাবদিহিতার দাবিতে প্রতিবাদ শুরু করি, তাহলে কি আমরা নিরাপদ থাকবো?"
বৈষম্য নির্যাতনের প্রসঙ্গে আলাগারাজা বলেন, সম্প্রতি দেশের উত্তর-পূর্বে একটি হিন্দু মন্দির ভেঙ্গে সেই জায়গায় বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতীক এবং পতাকা টাঙ্গিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এরপরও যেসব হিন্দু পূজারি ঐ জায়গায় যান, তাদের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি করা হয়। এমনকি বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরুরা ধর্ম-পরিচয় তুলে তাদের গালিগালাজ করে।
"কলোম্বোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও এখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য বিক্ষোভ করছেন। কিন্তু মাত্র কদিন আগেও একটি মন্দিরে যাওয়ার সময় ভিক্ষুরা হিন্দু পুণ্যার্থিদের বাধা দিয়েছেন," বলেন আলাগারাজা।
শ্রীলংকায় এখন যে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ হচ্ছে তার পেছনে সংগঠিত কোনো নেতৃত্ব নেই। অনেক মানুষ - যাদের সাথে হয়তো কোনো রাজনৈতিক দলের যোগাযোগ নেই - স্বতঃ:ফূর্তভাবে এসব বিক্ষোভ-সমাবেশ আয়োজন করছেন।
বিবিসি বাংলার আরো কিছু খবর:
টিটিইকে বরখাস্ত করা হয় রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর টেলিফোনের পর
প্রবল পরাক্রমশালী অটোমান সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল যেভাবে
স্ত্রী ও দুই কন্যাকে হত্যার পর সড়কের পাশে শুয়ে ছিল অভিযুক্ত
তাদের একজন অমালিনি ডি সায়রা। তিনি বলেন, এখন যা দেখা যাচ্ছে তার ভেতর "ভালো অনেক কিছু চোখে পড়ছে", কিন্তু সমাজে সত্যিকারের সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য অনেক কিছু করতে হবে, বিশেষ করে তার নিজের সিংহলি সম্প্রদায়কে অনেক কিছু করতে হবে।
"এটি খুবই একটি ইতিবাচক ঘটনা যে আমরা এবার একসাথে তামিল এবং সিংহলি নববর্ষ উদযাপন করেছি। আমরা বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মুসলিমদের সাথে গণ-ইফতার করেছি।"
তবে, তিনি মনে করেন, সমাজে "অর্থপূর্ণ এবং দীর্ঘস্থায়ী" একটি ঐক্য তৈরিতে আরো অনেকদূর যেতে হবে।
"আমি আশা করি আমরা রাজাপাক্সা পরবর্তী যে শ্রীলংকার আশা করছি, সেখানে তামিল এবং মুসলিমরা আর দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক থাকবে না।"
কলম্বোর সাগর তীরে যোগ দেওয়া বিক্ষোভকারী লাকশান ওয়াত্তুহেওয়া বলেন, অধিকাংশ মানুষের সামনে এখন অভিন্ন সমস্যা : সবাই তাদের পরিবারের জন্য খাদ্য, জ্বালানি এবং ওষুধ নিশ্চিত করার চিন্তায় অস্থির।
পেশায় স্ক্রিপ্ট লেখক মি ওয়াত্তাহেওয়া শ্রীলংকার জন্য "নতুন এক পর্বের" অপেক্ষায় রয়েছেন।
"এদেশে ৩০ বছর ধরে যুদ্ধ চলেছে এবং আমরা অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছি। অনেক হয়েছে। আমরা এখন একটি শান্তিপূর্ণ দেশ চাই।"
















Click it and Unblock the Notifications