ঢাকায় নাটকীয় শেষ প্রহরে কী ঘটেছিল শেখ হাসিনার সঙ্গে, কেনই বা বাংলাদেশ ছাড়তে মাত্র ৪৫ মিনিট সময় দিল সেনাবাহিনী
আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ দাবি করেছিল। সোমবার দুপুরে পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন টানা পনেরো বছর প্রধানমন্ত্রী থাকা শেখ হাসিনা। তারপরেও হিংসায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশে। জ্বলছে আওয়ামি লিগের নেতা-মন্ত্রী থেকে শুরু করে সংখ্যালঘুদের ঘরবাড়ি।
সংকট তৈরি হয়েছিল আগেই। কিন্তু তা ঘনীভূত হয় সোমবার সকালে। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে থাকে। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করে লাখো উন্মত্ত জনতা ঢাকার দিকে এগোতে থাকে। যাদের লক্ষ্য প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন, গণভবন।

- দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তই বেছে নেন হাসিনা
বিক্ষোভকারীরা গণভবনের দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেনা আধিকারিকরা বাসভবন থেকে বেরিয়ে যেতে মাত্র ৪৫ মিনিট সময় দেন। তিনি কি দেশের মধ্যেই পরামর্শ করতে চাইছেন, নিরাপত্তা বাহিনীর ওপরে শক্তি প্রয়োগে বিরত থাকতে বলবেন, নাকি দেশ ছাড়বেন? গত ১৫ বছর টানা প্রধানমন্ত্রী থাকা শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্তই বেছে নেন। কেননা তার আগেই তিনি প্রাণহানির আশঙ্কা করেছিলেন ভারতের রাষ্ট্রদূতের কাছে, এমনটাই খবর সূত্রের।
- সকাল থেকে শেষ চেষ্টার শুরু
দুপুরে দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সোমবার সকাল থেকে চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন শেখ হাসিনা। সেনাবাহিনীর সঙ্গে বৈঠক থেকে এদিক-ওদিক ফোন। বাংলাদেশের প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সোমবার সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ প্রায় একঘন্টা ধরে আইন প্রয়োগকারী ও সেনাবাহিনীর শীর্ষকর্তাদেরও পরে চাপ দেন হাসিনা। কিন্তু তার মধ্যে গণভবনের দিকে যাওয়া রাস্তাগুলি জনপ্লাবিত হয়েছে।
ক্ষমতা ধরে রাখতে গেলে বল প্রয়োগ করতেই হবে, এছাড়া আর কোনও উপায় ছিল না শেখ হাসিনার সামনে। কিন্তু বলপ্রয়োগ করাবেন কাকে দিয়ে। সেনাবাহিনীর একটা অংশ জনগণের ওপরে বলপ্রয়োগ করতে অস্বীকার করে। তার আগেই পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে। আওয়ামি লিগের ছাত্র সংগঠন ছাত্র লিগকে দিয়ে প্রথমের দিকে আন্দোলন রোখার চেষ্টা হলেও, পরবর্তী সময়ে তা ব্যর্থ হয়।
- দলের নেতাদের পরামর্শ মানেনি
বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে আওয়ামি লিগের শীর্ষ নেতৃত্ব, যাঁরা শেখ হাসিনার গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা, তাঁদের মধ্যে একজন রবিবার রাতে সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য রাজি করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু সেই পরামর্শ মানতে চাননি শেখ হাসিনা। বদলে শেখ হাসিনা সোমবার সকাল থেকে কারফিউ জারির আদেস দেন এবং ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধের আদেশ দেন।
- নির্দেশ মানার কেউ ছিল না
- কিন্তু এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনও কাজই করেনি। কারফিউ বলবত হওয়ার পরেই বিক্ষোভকারী সকাল নটা নাগাদ তা অমান্য করতে শুরু করে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে ঢাকার রাজপথে লাখো মানুষের জমায়েত হয়ে যায়।
- প্রধানমন্ত্রীর তলবে সকাল সাড়ে দশটা নাগাদ গণভবনে যান তিন বাহিনীর প্রধানরা এবং পুলিশের মহানির্দেশক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রেণে বাহিনীর অক্ষমতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। কেন কঠোর হাতে আন্দোলনকারীদের দমন করা হচ্ছে না, সেই প্রশ্ন তোলেন। তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্বাস করেছিলেন বলেই, এইসব অফিসারদের শীর্ষ পদে নিয়োগ করেছিলেন।
- সেই সময় প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা শেখ হাসিনাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, শুধু বলপ্রয়োগ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।
- বোন ও ছেলের ফোনে রাজি হন হাসিনা
পরিস্থিতি বোঝাতে প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্তা শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার সঙ্গে আলাদা ঘরে দেখা করেন। পরিস্থিতি বোঝাতে তিনি (বোন রেহানা) যেন হাসিনাকে বোঝান, সেই অনুরোধও করেন তাঁরা। শেখ হাসিনা সেই সময়ও আত্মবিশ্বাসী। সেই সময় প্রশাসনের এক শীর্ষ আধিকারিক বিদেশে থাকা হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর জয় তাঁর মা হাসিনার সঙ্গে কথা বলে পদত্যাগে রাজি করান।
- হাতে মাত্র ৪৫ মিনিট সময়
সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে ওঠার আগে শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে সম্প্রচারের জন্য বিদায়ী ভাষণ রেকর্ড করার ইচ্ছা প্রকাশ করছিলেন, যদিও সেনাবাহিনী তাঁকে সেই সময় দিতে রাজি হয়নি। কারণ গোয়েন্দারা জানিয়েছিল শাহবাগ ও উত্তরার দিক থেকে আন্দোলনকারীরা গণভবনের দিকে মিছিল করে এগোচ্ছে। ৪৫ মিনিটের মধ্যে তারা গণভবনে পৌঁছে যেতে পারে, সেই কারণে ভাষণ রেকর্ড করার সময় পর্যন্ত ছিল না। বদলে সেনাবাহিনী দেশ ছাড়ার জন্য় তৈরি হতে ৪৫ মিনিট সময় দেয়।
সেই সময় শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগ পত্র দিয়ে তাঁর বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে সরকারি বাসভবনের সংলগ্ন তেজগাঁও বিমানঘাঁটির হেলিপ্যাডে পৌঁছন। হেলিকপ্টার আগরতলায় বিএসএফের হেলিপ্যাডে অবতরণ করে। এরপর শেখ হাসিনা ও তাঁর বোন রেহানা ভারতীয় বায়ুসেনার বিমানে বিকেল ৫.৩৬-এ গাজিয়াবাদের হিন্দন এয়ারবেসে পৌঁছন।












Click it and Unblock the Notifications