রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধ: ইজিয়ামের পাইন বনে গণকবরে বহু মানুষের ধ্বংসাবশেষ

ঘটনাস্থলে গিয়েছেন বিবিসির সংবাদদাতা ওরলা গেরিন। তিনি বলছেন সেখানে শত শত কবর নিয়ে এখন ইউক্রেনীয়রা কাজ করছে।

জরুরি কর্মীদের একাংশ যারা গণকবর গুলোতে কাজ করছেন।
Reuters
জরুরি কর্মীদের একাংশ যারা গণকবর গুলোতে কাজ করছেন।

ইউক্রেনের ইজিয়ামের একটি পাইন বনে গণকবরে মানুষের দেহাবশেষ পাওয়া যাচ্ছে এবং দুর্গন্ধে সেখানকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে।

ইউক্রেনের কর্মকর্তাদের বিশ্বাস যে সেখানে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে যার তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহে তারা এখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

অস্থায়ী কবরগুলো খুঁড়তে কাজ করে যাচ্ছে ইউক্রেনের জরুরি সার্ভিসের প্রায় একশ কর্মী।

যারা রেইনকোটের মতো নীল রংয়ের প্লাস্টিক গায়ে চড়িয়ে সেখানে কাজ করছে।

শহরের শেষ প্রান্তে বন এলাকায় শত শত মানুষকে যে কবর দেয়া হয়েছে তাদের কীভাবে মৃত্যু হয়েছিলো সেটি বের করার চেষ্টা করছে তারা।

ইজিয়াম এপ্রিলে দখল করে নিয়েছিলো রাশিয়া। শহরটিকে তারা সামরিক ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছিলো। বিশেষ করে পূর্ব দিক থেকে সৈন্য সরবরাহের জন্য।

শহরটি সম্প্রতি ইউক্রেনের বাহিনী পুনর্দখল করে নিয়েছে।

এখন সেখানকার গণকবর থেকে মানুষের দেহাবশেষ বের করতে নীরবে কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পুলিশ ও প্রসিকিউটররা সেগুলো দেখছেন।

এর মধ্যেই একজন অফিসারকে দেখা গেলো মাথায় হাত দিতে। আরেকজন হেঁটে চলে গেলেন।

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুনঃ

ইউক্রেন রণাঙ্গনে কতটা বিপদে পড়েছে রাশিয়া? পুতিনের সামনে উপায় কী?

রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ করতে ইউক্রেনকে কী কী অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে

গুরুত্বপূর্ণ শহর দখল করছে ইউক্রেন, পিছু হটছে রুশ সৈন্যরা

কবর
BBC
কবর

খারকিভের আঞ্চলিক প্রসিকিউটর ওলেক্সান্দার ইলিয়েনকভ বলছেন, সেখানে যে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা নিয়ে তাদের কোন সন্দেহই নাই।

"প্রথম কবরটিতে একজন বেসামরিক নাগরিকের গলায় রশি পাওয়া গেছে। অর্থাৎ আমরা নির্যাতনের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছি," বিবিসিকে বলছিলেন তিনি।

তার দাবি সেখানকার প্রায় সবারই মৃত্যু হয়েছে রুশ সৈন্যদের হাতে।

"কেউ খুন হয়েছেন। কেউ নির্যাতিত হয়েছে। আর কেউ মারা গেছেন বিমান ও পদাতিক বাহিনীর অভিযানে"।

আর এ চিত্র বিশ্বকে দেখাতে মরিয়া ইউক্রেন। সে কারণেই সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের একটি দলকে সেখানে নিয়ে যায় তারা।

যেখানে গণকবর পাওয়া গেছে সেখানে দেখা গেছে সারি সারি কবর, কাঠের ক্রুশ দিয়ে চিহ্নিত।

কয়েকটিতে নাম লেখা আছে। কিন্তু বেশিরভাগই চিহ্নিত করা শুধু সংখ্যা দিয়ে।

রাশিয়ানরা যখন এলাকাটির নিয়ন্ত্রণে ছিলো তখনই এদের কবর দেয়া হয়েছে সেখানে।

ইউক্রেনের পুলিশ বলছে, সেখানে ৪৪৫টি নতুন কবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে কিছু কবরে একাধিক মৃতদেহ রাখা হয়েছে।

তবে এটা পরিষ্কার নয় যে ঠিক তাদের সবার মৃত্যু কিভাবে হয়েছে।

এই ব্যক্তি এসেছিলেন স্ত্রীর কবর দেখতে।
BBC
এই ব্যক্তি এসেছিলেন স্ত্রীর কবর দেখতে।

এর মধ্যে অনেক বেসামরিক নাগরিক ছাড়াও নারী ও শিশুও আছে।

প্রসিকিউটররা বলছেন, সেখানকার কারও কারও মৃত্যু হয়েছে রাশিয়ানদের গোলাবর্ষণে। আর অন্যরা গত মার্চে অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকে রাশিয়ানদের গোলাবর্ষণের শিকার। ওই ঘটনায় ৪৭ জন নিহত হয়েছিলো।

কর্মকর্তারা বলছেন, একটি কবরে প্রায় বিশ জন সৈন্যকে সমাহিত করা হয়েছে। তাদের কারও হাত বাধা, আবার কারও গলায় রশি।

সামরিক পোশাক পরা একটি দেহাবশেষ রাখা হয়েছিলো একটি লাশ বহনকারী ব্যাগে।

যেখানে গণকবর শনাক্ত হয়েছে তার আশেপাশে বিচ্ছিন্ন বিস্ফোরণ হচ্ছিলো কারণ নিরাপত্তা কর্মীরা সেখানকার মাইন অপসারণে কাজ করছিলো।

বাহাত্তর বছর বয়স্ক এক ব্যক্তি এসেছিলেন সেখানে তার স্ত্রী লুদমিলার কবর দেখতে। তিনি জানান যে তার স্ত্রী নিহত হয়েছিলো গত সাতই মার্চে ইজিয়ামে ব্যাপক গোলাবর্ষণের সময়।

প্রথমে বাড়ির আঙ্গিনাতেই তাকে কবর দিতে বাধ্য হয়েছিলেন এই ব্যক্তি। পরে অগাস্টে আবার কবর দেয়া হয়। এখন আবার সেই মৃতদেহ তোলা হচ্ছে।

তবে যেহেতু রাশিয়ানরা সরে গেছে সেজন্য এখন ইউক্রেনে বিস্তারিত তদন্ত করতে পারছে যে কতজনকে দখলদার বাহিনী এভাবে ফেলে গেছে।

ওই বনের উল্টো দিকে বাস করে এমন একজন নারী বলছিলেন যে রুশ সৈন্যরা স্থানীয়দের কবরস্থান থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিলো।

ম্যাক্সিম নামে এক ব্যক্তি এসে সাংবাদিকদের বলছিলেন যে তাকে নির্যাতনের ঘটনাটি রেকর্ড করার জন্য।

তিনি জানান যে, গত সেপ্টেম্বরে তাকে আটক করেছিলো রুশরা। পরে ইউক্রেন বাহিনী ইজিয়াম পুনর্দখলের পর দশই সেপ্টেম্বর তিনি মুক্তি পান।

রাশিয়ানদের চলে যাওয়ার পর একটি এলাকার দৃশ্য।
Getty Images
রাশিয়ানদের চলে যাওয়ার পর একটি এলাকার দৃশ্য।

তিনি তার শরীরে বৈদ্যুতিক শক দেয়ার চিহ্ন দেখান।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির একজন সিনিয়র উপদেষ্টা বিবিসিকে বলেছেন যে, ইউক্রেনের পুনর্দখলের পর কিছু এলাকায় নির্যাতনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

"আমরা খুব ভীতসন্ত্রস্ত মানুষকে পেয়েছি যাদের আলোর বাইরে খাদ্য, পানি ও বিচারের অধিকার থেকে দূরে রাখা হয়েছিলো", মিখাইলো পদলিয়াক বলছিলেন।

খারকিভের প্রসিকিউটর মিস্টার ইলিয়েনকভ বলছিলেন, একই ধরণের আরও কয়েকটি কবরের সন্ধান মিলেছে ওই এলাকায়।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা মুখপাত্র জন কিরবি বলেছেন, ইজিয়াম থেকে গণকবরের যেসব খবর আসছে তা ভয়ঙ্কর, কিন্তু রাশিয়ানরা কি ধরণের নিষ্ঠুরতা দেখিয়েছে তারই প্রমাণ এগুলোতে তারা রেখে গেছে।

তারা রাশিয়ার বাহিনীর নিষ্ঠুরতা ও যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ সংগ্রহকে সক্রিয় সমর্থন করেন এবং এজন্য রুশদের জবাবদিহি করতে সহায়তা করবেন বলেও জানান।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাঁক্রও ইজিয়ামে নিষ্ঠুরতার নিন্দা জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ ব্রিটিশ আইনজীবী নাইজেল পভোয়াস বিবিসি নিউজ আওয়ারকে বলেছেন, কবর খুঁড়ে যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ পেলে তিনি অবাক হবেন না।

"মনে হয় কিছু লক্ষণ পাওয়া গেছে। তবে এখনই বলা ঠিক হবে না যে যাদের কবর দেয়া হয়েছে তারা কি গোলাবর্ষণে নাকি অপুষ্টিতে নাকি স্বাস্থ্যসেবার অভাবে মারা গেছে" - বলছিলেন তিনি।

তবে দখলকৃত অঞ্চলে যা হয়েছে তার ধরণ দেখে তিনি মনে করছেন যে নির্যাতন ও খুনের প্রমাণ পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

ইউক্রেন-রাশিয়ার যুদ্ধে ছয় মাসে যা ঘটেছে, এরপর কী ঘটতে পারে

যুদ্ধের মধ্যে স্বাধীনতা দিবস পালন করছে ইউক্রেন

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রভাব ফেলছে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+