অভিনব প্রতারণা: মহাকাশ সংস্থা নাসার কাছে কোটি টাকায় মুদ্রা বা কয়েন বিক্রির লোভ দেখিয়ে দেড় কোটি টাকা বেহাত

পুরনো ধাতব মুদ্রা উচ্চ দামে বিক্রির লোভ দেখিয়ে প্রতারণা করছে বাংলাদেশের একটি চক্র।
Getty Images
পুরনো ধাতব মুদ্রা উচ্চ দামে বিক্রির লোভ দেখিয়ে প্রতারণা করছে বাংলাদেশের একটি চক্র।

মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার কাছে কোটি কোটি টাকায় পুরানো ধাতব মুদ্রা বিক্রির লোভ দেখিয়ে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বাংলাদেশের একটি প্রতারক চক্র।

সম্প্রতি এই চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। সকালে রাজধানী ঢাকার ধানমন্ডিতে পিবিআই এর সদরদপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়।

এ সম্পর্কিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই প্রতারক চক্রের সদস্যরা পুরাতন ধাতব মুদ্রা, টক্কর (এক প্রকার গিরগিটি) এবং সীমান্ত পিলারকে মূল্যবান বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করে সেগুলো বিক্রির নাম করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিতো।

তাদের লক্ষ্য ছিলে ধনী ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা।

প্রতারক চক্র দাবি করতো যে পুরনো এসব ধাতব পদার্থ নাসায় গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন দেশ থেকে ধাতব মুদ্রা চড়া দামে নাসা কিনে নেয় এবং এগুলো বিক্রি করে কয়েক মিলিয়ন ডলার পাওয়া সম্ভব।

আর এই ফাঁদেই পা দিতো অনেকে।

বিজ্ঞপ্তিতে ঘটনার বর্ণনায় বলা হয়, প্রতারণার যে ঘটনাটি তদন্ত করা হয়েছে, সেটি গত বছর অর্থাৎ ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ঘটে। এর প্রায় বছর খানেক আগে প্রতারক চক্রের এক সদস্যের সাথে পরিচয় হয় আনন্দ গ্রুপ নামে একটি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের সাথে।

ওই ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে নিয়ে এসে আনন্দ গ্রুপের চেয়ারম্যানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়, যার পরিচয় হিসেবে বলা হয় যে তিনি সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ান। বর্তমানে তিনি সিঙ্গাপুর থেকে তার ব্যবসা পরিচালনা করেন।

এছাড়া ব্যবসায়িক কাজে তিনি কুয়েত, স্পেন, দুবাই, মালয়েশিয়া, লন্ডন - এসব জায়গায় ঘুরে বেড়ান বলেও দাবি করা হয়।

বিবিসি বাংলায় আর পড়তে পারেন:

পিবিআই-এর প্রধান বনজ কুমার মজুমদার জানান, তারা তদন্ত করে জানতে পেরেছেন যে আসলে দ্বিতীয় ওই ব্যক্তি এসএসসি পাস এবং পেশায় একজন পেয়ারা ব্যবসায়ী।

মি. মজুমদার তদন্তে পাওয়া তথ্যের বর্ণনা করেন এভাবে: এক পর্যায়ে দ্বিতীয় ব্যক্তি ব্যবসায়ীকে বলেন যে তার কাছে একজন ক্রেতা আছেন, যিনি নাসা, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ এবং আমেরিকান অ্যাম্বাসির সাথে জড়িত। তিনি বাইরে থাকেন, তবে পুরনো ধাতব মুদ্রা কিনতে চান।

আর এমন একজন বিক্রেতা রয়েছেন, যিনি সীমান্ত এলাকায় থাকেন এবং ভারত থেকে এসব জিনিসে নিয়ে আসেন। পুরো লেনদেনটি যেহেতু মিলিয়ন ডলারের ব্যাপার, তাই আনন্দ গ্রুপের ওই ব্যক্তির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের অনুমতি চাওয়া হয়।

এর বিনিময়ে তাকে কমিশন দেয়ার প্রস্তাব করা হয়।

মি. মজুমদার জানান, যে ব্যক্তিকে ক্রেতা হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছে, তিনি আসলে একজন শাড়ি ব্যবসায়ী। আর যে ব্যক্তি বিক্রেতা, তিনি পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলা ঝিনাইদহে একটি বাড়িতে কেয়ারটেকার হিসেবে কাজ করেন।

এই চক্রের আরেক সদস্য, যাকে মুদ্রার ক্রেতার ব্যক্তিগত সচিব বা পিএস হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়, তিনি আসলে টুকরো কাপড় ঝুটের ব্যবসায়ী বলে জানায় পিবিআই।

পিবিআই বলছে, এই ঘটনার পর প্রতারণার শিকার ব্যক্তির পক্ষ হয়ে কাজ করছেন এমন একজনকে সঙ্গে নিয়ে প্রতারক ব্যক্তিটি ক্রেতা সেজে চুয়াডাঙ্গায় যায় ধাতব মুদ্রাটি দেখতে। সেখানে তাদের একটি ভল্ট এবং একটি টেকনিক্যাল রুম দেখানো হয়।

আর তখন পুরো বিষয়টি বিশ্বাস করতে শুরু করে প্রতারকের টার্গেটরা।

মুদ্রাটির দাম ধরা হয় ১০ কোটি টাকা। যে ব্যক্তি মুদ্রাটি কিনবেন, তিনি তখন সাড়ে আট কোটি টাকার একটি চেক দেন বিক্রেতাকে। তবে বাকি দেড় কোটি টাকা তার কাছে নেই বলে জানালে ঝিনাইদহে বসে সেই টাকা দিয়ে দেন আনন্দ গ্রুপের পক্ষে এক কর্মকর্তা।

পরে কয়েনটি নিয়ে চলে যান আনন্দ গ্রুপের ওই কর্মকর্তা। এর তিন দিন পর যিনি কয়েনটি বিক্রি করেছিলেন, তিনি প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানকে জানান তারা যে কয়েনটি কিনেছেন সেটি আসল নয়, নকল। তবে আসল কয়েনটি তার কাছে রয়েছে এবং সেটি পেতে হলে ১০ কোটি টাকা দিতে হবে।

তখন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান বুঝতে পারেন যে পুরো বিষয়টি ভুয়া, এর সাথে সংশ্লিষ্ট সবাই পূর্ব-পরিচিত এবং এরা কেউ-ই মার্কিন নাগরিক কিংবা নাসার সদস্য নয়।

পরে চলতি মাসের ৬ তারিখ প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক বাদী হয়ে ঝিনাইদহের সদর থানায় মামলা করেন। এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব পিবিআইকে দেয়া হলে তারা এই অভিনব কায়দায় প্রতারণার বিষয়টি জানতে পারে।

এর তদন্তের জের ধরে যশোর, ঝিনাইদহ ও ঢাকা থেকে পাঁচজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়।

এ সময় তাদের কাছ থেকে একটি ভল্ট, দুটি পুরাতন মুদ্রা বা কয়েন, নগদ টাকা ও বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয় বলে পিবিআই জানিয়েছে।

পিবিআই-এর প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, "এরা এত লাভ দেখায় এবং মানুষ এমন সম্মোহনের মধ্যে পড়ে যায় যে সম্পূর্ণরূপে প্রতারিত হওয়ার আগ পর্যন্ত এরা বুঝতে পারে না। এমনকি প্রতারণার শিকার হওয়ার অনেক দিন পরও বুঝতে পারে না। আর যখন বুঝতে পারে তখন লজ্জায় কাউকে বলেও না।"

এই চক্রের অন্য সদস্যদের ধরতে অভিযান চলছে বলেও জানানো হয়।

এদিকে, একই সংবাদ সম্মেলনে আরেকটি চক্রের তিন সদস্যকে আটক করার কথা জানানো হয়, যারা আয়ারল্যান্ডের ভিসা পাইয়ে দেয়ার কথা বলে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগে রয়েছে।

BBC
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+