Get Updates
Get notified of breaking news, exclusive insights, and must-see stories!

মালয়েশিয়া উড়ান: পাইলটের মেয়ে লিখল খোলা চিঠি

মালয়েশিয়া
কুয়ালালামপুর, ২০ মার্চ: বাবা হারিয়ে গিয়েছে মাঝ আকাশে। কিন্তু হাল ছাড়েনি মেয়ে। বাবার কল্যাণ কামনায় লিখল খোলা চিঠি। মর্মস্পর্শী।
আব্দুল রহিম হারুন। মালয়েশিয়ার সেই নিখোঁজ বিমানের পাইলট। মেয়েকে বলে গিয়েছিলেন, ফিরে এসে সঙ্গে নিয়ে বেড়াতে যাবেন। সেই থেকে বাবার পথ চেয়ে চোখ সজল নুর নাদিয়া আব্দুল রহিমের। আব্দুল রহিম হারুনের আর এক সহকর্মী, পাইলট ক্যাপ্টেন জাহরি আহমেদ শাহও একই সঙ্গে নিখোঁজ। 'আঙ্কল'-এর জন্যও মনখারাপ মেয়েটির।

সেই খোলা চিঠি

এই চিঠি লেখাটা বাকি ছিল। অনেক দিন আগে এই চিঠি লেখা উচিত ছিল আমার। বাবাকে জানাতে চেয়েছিলাম, আমি ওঁর কারণে কতটা গর্বিত। আমি বাবার জন্য গর্বিত। যদিও জীবনের অর্ধেক সময় ওঁকে আমি কাছে পাইনি।

বাবা, আমি লজ্জিত। তুমি একজন পাইলট, এটা ছোটোবেলায় বন্ধুদের বলতে আমি লজ্জা পেতাম। নতুন বন্ধুদের বলেছি, তুমি ড্রাইভার। আমি দুঃখিত বাবা।

আমি বলছি, আমি বৃহৎ মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স পরিবারের একজন। যখন ছোট্ট ছিলাম, তখন থেকে ওদের সঙ্গে উড়ে বেড়িয়েছি। আমার প্রিয় পাইলট, আমার বাবার সঙ্গে আমি প্রথম বেড়াতে গিয়েছিলাম কোটা কিনাবালু। আমাকে লোকে বলত, আমি নাকি অখুশি ছিলাম, আমাকে বোঝা দায় ছিল। তবে আমি এয়ারপোর্ট ভালোবাসতাম, ভালো লাগত উড়ে বেড়াতে।

বিমানের হারিয়ে যাওয়া ক্যাপ্টেনের মতোই বাবাও মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সে ঢুকেছিল স্কুল শেষ করে। কত সময় আমরা বাবাকে বলেছি, অন্যান্য এয়ারলাইন্সে চাকরি নিতে। কিন্তু বাবা বলত, আমাদের কাছাকাছি যত বেশি সম্ভব থাকতে চায়। তাই অন্য কোথাও চাকরি নেয়নি। বাবার অন্য এয়ারলাইন্সে চাকরি নিলে আমরা একগাদা সুবিধা ভোগ করতে পারতাম। ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে বিনা খরচে পড়াশুনো, দৈনন্দিন জীবনের খরচ পেয়ে যাওয়া, আমাদের ঘোরানোর জন্য একজন ড্রাইভার।

আপনি যদি পাইলটের মেয়ে হন, দেখবেন আপনার মাকে সব কাজ করতে হচ্ছে। আপনাকে প্রথম দিন স্কুলে নিয়ে যাওয়া, পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আপনার সঙ্গে থাকা, খেলাধুলোয় নিয়ে যাওয়া, আপনার জন্মদিন পালন সবই।

বাবা যখন বাড়ি ছিল না, তখন একটা খুব খারাপ ঘটনা ঘটেছিল। তিনজন মুখোশপরা ডাকাত আমাদের বাড়িতে ডাকাতি করেছিল। সবচেয়ে বড় কথা হল, মা তখন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বাবা কাছে নেই। মাকে একা সব কিছু করতে হয়েছিল। বাবাকে মা কিছু বলতে চায়নি, কারণ উনি চিন্তা করবেন বলে। আর পরের দিনই বাবার কুয়ালালামপুর ফিরে আসার কথা। মা বুঝত বাবার কাঁধে দায়িত্ব রয়েছে। বাবা যখন আকাশে থাকত, তখন বাবাকে মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে হবে, কারণ বাবার ওপর শয়ে শয়ে যাত্রীর প্রাণের দায়িত্ব রয়েছে। শুধু নিজের বাড়ি কথা ভাবলেই চলবে না।

আমার মনে পড়ছে একবার কান্নায় গলা বুজে এসেছিল। কলেজের ইংরেজি শিক্ষক প্রশ্ন করেছিলেন, "তোমার বাবা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো স্মৃতি কী?"আমি উঠে দাঁড়িয়েছিলাম আর বলেছিলাম, "আমার বাবা অর্ধেক সময়ই আমার পাশে থাকে না।"

বাবাকে আমি দোষ দেব না। পরিবারকে দেখভাল করতে অত পরিশ্রম করতে হত। আমরা এই জীবন মেনে নিয়েছিলাম। লোকে জিজ্ঞাসা করত "আয়া মানা" (বাবা কোথায়)? আমি বলতাম, "জানি না, এই দুনিয়ার কোথাও আছে নিশ্চয়। বাবার ডিউটি রোস্টার দেখে বলতে হবে।"

বাবা অর্ধেক সময়ই আমার পাশে থাকে না

বাবার থাকা না থাকা নির্ভর করত এক টুকরো কাগজের ওপর। সারা জীবনে এটাই হয়েছে। মাসের প্রথমে ওটা দেখে বাবা বলতে পারত, কবে কোথায় থাকবে। কখনও কখনও বাবা বিরক্ত হত। কারণ আমি জিজ্ঞাসা করতাম, অমুক দিন বাবা কোথায় থাকবে। পরে মনে হত, বাবার ডিউটি রোস্টারে চোখ বুলিয়ে প্রশ্ন করা উচিত ছিল।

বাবা যখন বেরিয়ে যেত, তখন আমরা সবাই মনে করে বিদায় জানাতাম। এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি এসে বাবাকে নিয়ে যেত। কখনও কাকভোরে, কখনও মাঝ রাতে বাবা বেরিয়ে যেত। শুতে যাওয়ার আগে বাবাকে বলতাম "সালাম"। আর বাবা যখন ফিরে আসত কাজ থেকে, আমরা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা করতাম। যতদিন এমএইচ-৩৭০ ঘটেনি, আমি বুঝিনি এগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

প্রতিবার কাজে যাওয়ার সময় বাবাকে দায়িত্ব নিতে হত শয়ে শয়ে জীবনের। পরিবারের সঙ্গে পরিবারের মিলন ঘটিয়ে দেওয়ার কাজ করতে হত বাবাকে। ব্যবসায়ী সওদা পাকা করতে যাবে বাবার দৌলতে। কেউ দু'চোখে দুনিয়া দেখার স্বপ্ন নিয়ে বেড়াতে বেরিয়েছে, সেটাও সফল হত বাবার দৌলতে।

আমার মনে পড়ছে একটা ঘটনা। হুইলচেয়ার বসে একজন বৃদ্ধ অপেক্ষা করছিল বাবার জন্য। লন্ডন থেকে কুয়ালালামপুর উড়ান ছিল। বাবাকে দেখে বলেছিল, "আপনি কি ক্যাপ্টেন? খুব ভালো ল্যান্ডিং করিয়েছেন। ধন্যবাদ।"

মনে মনে একটা গর্ব হয়েছিল।

কিন্তু পরিবারের সবাই জানত, ভিতরে কতটা উদ্বেগ থাকত। এই হয়তো একটা খারাপ ফোন এল, এই হয়তো শুনতে হবে বাবা আর ফিরবে না। আমরা একে জীবনের অঙ্গ বলে ধরে নিতাম, প্রতিদিন।

আজকের জায়গায় পৌঁছতে বাবাকে প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হয়েছে। প্রতি বছর বাবার স্বাস্থ্যপরীক্ষা হত, বিমান নিয়ে ওড়ার মতো অবস্থায় আছে কি না, জানতে। ছাত্রদের মতো বাবারও পরীক্ষা থাকত। বাবার যে 'ফ্লাইট ম্যানুয়াল' ছিল, সেটা ডাক্তারি বইয়ের মতোই মোটা ছিল।

বাবা ঘড়ি ধরে চলত। এক মিনিটও দেরি নয়, এক মিনিটও তাড়াতাড়ি নয়। ঠিক সময়ে পৌঁছত। বলতে শুনতাম, "সাত মিনিটে ওখানে পৌঁছে যাচ্ছি, দাঁড়াও।"

একজন বিমানকর্মীর পরিবারিক জীবনের এটা একটা সংক্ষিপ্তসার।

দুনিয়ার একপ্রান্তের সঙ্গে আর এক প্রান্তকে জুড়তে একজন বিমানকর্মী অনেক ত্যাগ স্বীকার করে। যারা এমএইচ-৩৭০ উড়ানে ছিল, তাদের পরিবারকে আসুন সমর্থন দিই, প্রার্থনা করি। তাদের একটু একা থাকতে দিই।

আপনি যখন মতামত দিচ্ছেন, আঙুল তুলছেন, নান তত্ত্ব, জল্পনা ছড়াচ্ছেন, তখন মনে রাখবেন যে, এটা শুধু বিমানকর্মীদের পরিবারকে আঘাত দিচ্ছে না, মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্সের বৃহৎ পরিবারকেও দুঃখ দিচ্ছে।

এমএইচ-৩৭০ যেখানেই থাকুক, আসুন প্রার্থনা করি।

More From
Prev
Next
Notifications
Settings
Clear Notifications
Notifications
Use the toggle to switch on notifications
  • Block for 8 hours
  • Block for 12 hours
  • Block for 24 hours
  • Don't block
Gender
Select your Gender
  • Male
  • Female
  • Others
Age
Select your Age Range
  • Under 18
  • 18 to 25
  • 26 to 35
  • 36 to 45
  • 45 to 55
  • 55+