ম্যাজিক মাশরুম: অপ্রচলিত এই মাদক কী, এটি দেহে কী প্রভাব সৃষ্টি করে, কী ক্ষতি করে?
হঠাৎ করেই বাংলাদেশে আলোচনায় ম্যাজিক মাশরুম নামের একটি নতুন ধরনের মাদক। র্যাব আরও বলছে, এই মাদকটি অপ্রচলিত হলেও সম্প্রতি এটি মাদকসেবীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার হাতির ঝিল এলাকা থেকে 'ম্যাজিক মাশরুম' নামে এক ধরণের মাদকসহ দুই জনকে গ্রেফতার করার কথা জানিয়েছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব।
র্যাবের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৭ই জুলাই গভীর রাতে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে ওই দুই জনকে আটক করা হয় এবং সেসময় তাদের কাছ থেকে ম্যাজিক মাশরুমের পাঁচটি উদ্ধার করা হয়, যার প্রতিটিতে ১২০টি করে স্লাইস রয়েছে।
এই প্রতিটি বারে ম্যাজিক মাশরুম বা সাইলোসাইবিন মাশরুমের পরিমাণ ছিল ২৫০০ মিলিগ্রাম।
র্যাব জানাচ্ছে, ম্যাজিক মাশরুম একটি 'সাইকেডেলিক ড্রাগ'। এটি বিভিন্ন খাবার যেমন কেক ও চকলেট মিশ্রিত অবস্থায় সেবন করা হয়ে থাকে। এছাড়াও পাউডার ক্যাপসুল হিসেবে এটি পাওয়া যায় বলে বাহিনীটির পক্ষ থেকে জানানো হয়।
র্যাব আরও বলছে, এই মাদকটি অপ্রচলিত হলেও সম্প্রতি এটি মাদকসেবীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
- আপনার সন্তান এলএসডিতে আসক্ত কি না, কীভাবে বুঝবেন ?
- মাদক এলএসডি কেন আপনার জন্য ভয়ঙ্কর ক্ষতির কারণ হতে পারে?
- 'ক্রিস্টাল মেথ বা আইস' শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর?
- মাদকের বিরুদ্ধে কি যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি হয়েছে
ম্যাজিক মাশরুম কী?
অপ্রচলিত ধরনের এই মাদকটি সম্পর্কে জানতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঔষধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ.ব.ম ফারুকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন যে এটি এক ধরণের ব্যাঙের ছাতা। সাইলোসাইবিন মাশরুম প্রকৃতিতেই জন্মায় এবং এটি খুবই বিষাক্ত।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. আবিদা সুলতানা বলেন, ম্যাজিক মাশরুম আসলে এক ধরণের ফাঙ্গি। এটি প্রকৃতিতে মুক্ত অবস্থাতেই জন্মায়।
তবে এগুলোকে ড্রাগ বা মাদক হিসেবে ব্যবহারের জন্য অনেক সময় শুকিয়ে ফেলা হয় বলে তিনি জানান।
রসায়ন বিভাগের আরেক শিক্ষক ড. কাওসারী আখতার বিবিসি বাংলাকে বলেন, প্রকৃতিতে জন্ম নেয়া প্রায় দুই শতাধিক মাশরুমের মধ্যে সাইলোসাইবিন নামের উপাদান পাওয়া যায়। এগুলোর কোনটিতে এই উপাদান কম থাকে, আবার কোনটিতে বেশি পরিমানে থাকে।
তিনি বলেন, সাইলোসাইবিন একটি প্রো-ড্রাগ উপাদান। অর্থাৎ এটি শরীরে প্রবেশের পর এর মধ্যে যে উপাদানগুলো সক্রিয়, সেগুলো কাজ করা শুরু করে। এক্ষেত্রে শরীরে প্রবেশের পর সাইলোসাইবিন ভেঙ্গে সাইলোসিনে রূপান্তরিত হয়।
তিনি আরও বলেন, বেশি পরিমাণে এই উপাদান শরীরে প্রবেশ করলে নেশার উদ্রেক হতে পারে।
অধ্যাপক ফারুক বলেন, মূলত দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলে বহু আগে থেকেই ম্যাজিক মাশরুমের ব্যবহার হতো।
শুরুর দিকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা রীতিনীতি, যার সঙ্গে কোনও ধরণের ত্যাগ (স্যাক্রিফাইস) কিংবা ধ্যান জড়িত থাকে, সে ধরনের অনুষ্ঠানে মনঃসংযোগ বাড়ানোর জন্য ম্যাজিক মাশরুমের ব্যবহার ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই মাদক সেবনের পর ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর এর কার্যকারিতা শুরু হয়, যা প্রায় পরবর্তী ৬-৮ ঘণ্টা পর্যন্ত চলে।
"এটি সেবনের পর ব্যবহারকারীরা এক ধরনের ইউফোরিয়া বা অলীক কল্পনার জগতে চলে যায়। এটি আসলে মাইন্ড অল্টারিং এবং দৃষ্টি বিভ্রম ঘটায়," বলেন অধ্যাপক ফারুক।
শরীরে কী প্রভাব পরে?
র্যাবের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, এই মাদক সেবনকারীর নিজের উপর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকে না। এমন কি কেউ কেউ ছাদ থেকেও ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে।
বাহিনীটি সবাইকে সতর্ক করে বলেছে যে এই মাদক দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারের কারণে শারীরিক ক্ষতি ছাড়াও মানসিক রোগ যেমন সাইকোসিস হতে পারে। এছাড়া, অবিরাম হ্যালুসিনেশনেরও কারণ হতে পারে এটি।
শরীরে ম্যাজিক মাশরুম বা সাইলোসাইবিনের প্রভাব নিয়ে একটি গবেষণা করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন। ১৯৯৩ জন ব্যক্তি, যাদের বয়স গড়ে ৩০ বছর, তাদের উপর এই গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছিল। তাদের সবার কাছে সাইলোসাইবিন মাশরুম গ্রহণের পর কী ধরণের অভিজ্ঞতা হয় তা জানতে চাওয়া হয়।
এদের মধ্যে ৩৯ শতাংশ ব্যক্তি এই মাদক গ্রহণের পর খুব খারাপ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। ১১শতাংশ ব্যক্তি নিজেদের কোন না কোন শারীরিক ক্ষতি করেছেন। ২.৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী সহিংস আচরণ করেছেন। আর ২.৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর চিকিৎসা সেবা নেয়ার দরকার হয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঔষধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ.ব.ম ফারুক বলেন, এ ধরণের মাদক ব্যবহারের কারণে একজন ব্যক্তি শারীরিক ও মানসিক-দুই ধরণের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
এই মাদকের প্রভাবের সাথে অন্য আরেকটি মাদক, যা এলএসডি নামে পরিচিত সেটির মিল রয়েছে, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি। "এলএসডির মতোই এই মাদক গ্রহণেও সেবনকারীর হ্যালুসিনেশন হয়। অর্থাৎ তার সামনে এমন সব অলীক বিষয় জাগে বা তিনি দেখতে পান, যা আসলে বাস্তবে সম্ভব নয়।"
তাঁর মতে, এই মাদক দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে সেটি দেহের স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। স্নায়ুতন্ত্র সঠিকভাবে কাজ না করার কারণে ব্যবহারকারীর ঘুমের সমস্যা দেখা দেবে।
এছাড়া ক্ষুধামন্দা, স্মৃতিভ্রম, পায়খানা-প্রস্রাব ঠিক মতো না হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে বলে তিনি জানান।
অধ্যাপক ফারুক আরও বলেন, অনেক সময় প্রস্রাবের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে কমে যেতে পারে, যা কিডনি এবং এর সাথে জড়িত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের উপর প্রভাব ফেলে।
তিনি জানান, এ ম্যাজিক মাশরুমে ধরণের মাদক দেহের এনডোক্রাইন সিস্টেম বা শরীরের বিভিন্ন গ্রন্থির উপর প্রভাব ফেলবে। এর কারণে দেহে হরমোন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যাওয়া কিংবা হরমোন নিঃসরণের প্যাটার্ন বা ধরণ বদলে যেতে পারে, যা দেহের উপর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।
আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক ড. আবিদা সুলতানা বলেন, ২০১৮ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল যে ক্যান্সারের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন রোগ, হতাশা, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা, ডিপ্রেশনের মতো রোগে যুক্তরাষ্ট্রে এটি ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে এর মারাত্মক পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়ার কারণে এটিকে পরে নিষিদ্ধ করা হয়।
বিশ্বের অনেক দেশে এটি এখন নিষিদ্ধ বলে জানান তিনি।
ড. সুলতানার মতে, এটি দীর্ঘসময় ধরে ব্যবহারের কারণে প্যানিক রিঅ্যাকশন তৈরি হয়, ব্যবহারকারীর মধ্যে সময়, জায়গা বা অবস্থান সম্পর্কে ধারণা লোপ পায়।
এছাড়া পেশীব্যথা, শরীরের উপর নিয়ন্ত্রণ না থাকা, পেশী দুর্বল হয়ে থাকা, বমি বমি ভাব, রক্তচাপ ও হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা যায় বলে জানান রসায়ন বিভাগের এই শিক্ষক।
















Click it and Unblock the Notifications